এখানকার গোলমাল শুনল দলনেতা। সে প্রায় ছুটে এলো। বলতে লাগল কী ব্যাপার? এত গোলমাল কীসের?
ফ্রান্সিস বলল-রাজা পারকোন জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। এক্ষুনি বৈদ্যকে ডেকে নিয়ে আসুন।
দলনেতা বলল–চাবুকেরমার খেয়েছে তো। সহ্য করতে পারেনি। যাক গে–রাজাকে বলছি। উনি অনুমতি দিলে বৈদ্যকে ডাকা হবে।
হ্যারি বলল–একজন মানুষ এত সাংঘাতিক অসুস্থ তার চিকিৎসার জন্য রাজার অনুমতি লাগবে? অবাক কাণ্ড।
–এই জামিনায় রাজার অনুমতি ছাড়া কিছু হবার উপায় নেই। যাক গে–আমি দেখছি। দলপতি চলে গেল।
শাঙ্কো নিজের পোশাক ছিঁড়ে জলে ভিজিয়ে রাজার মাথায় জলপট্টি দিতে লাগল। রাজা তখনও জ্ঞান ফিরে পান নি।
কিছুক্ষণ পরে দলনেতা বৈদ্যকে নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হল–যাক রাজা কাদর্জা তাহলে চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছে।
বৈদ্যের মাথা ঢাকা সাদা কাপড়ের টুপি মত। দাড়ি গোঁফ ইয়া মোটা গলায় নানা রঙের পাথরের মালা। গায়ে টকটকে লাল রঙের জামা। কাঁধে ঝোলা।
দরজা খোলা হল। প্রহরীরা দরজার দুপাশে খোলা তরোয়াল নিয়ে দাঁড়াল। বৈদ্য আর দলনেতা ঘরে ঢুকল। বৈদ্য রাজার কাছে গেল। বসল। কাঁধের ঝোলা নামাল। রাজার চোখের পাতা খুলে দেখল। কপালে গলায় হাত বোলাল। রাজার ঠোঁট ফাঁক করে দেখল দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।
বৈদ্য এবার ঝোলা থেকে মাটির মুখ ঢাকা ভড় বের করল। সেটা থেকে দুটো বড়ি বের করল। তারপর রাজার দুই নাকের ফুটোতে চেপে ধরল। বড়ি দুটোয় নিশ্চয়ই কোন গন্ধ আছে। গন্ধ নাক দিয়ে মাথায় গেল।
কিছুপরে রাজার শরীরটা নড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা চোখ মেলে তাকালেন। শূন্য দৃষ্টি। কিছু নির্দিষ্টভাবে দেখছেন বলে ফ্রান্সিসদের মনে হল না। বৈদ্য নাক থেকে বড়ি দুটো সরিয়ে নিল।
আবার ঝোলা থেকে একটা কাপড়ের পুটুলি বের করল। পুটুলি থেকে দুটো কালো বড়ি বের করল। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল-খাইয়ে দাও।
হ্যারি কাঠের গ্লাসে জল এনে দিল। শাঙ্কো ওর ঊরুর ওপর রাজার মাথাটা শুইয়ে দিল। এতে মাথাটা উঁচু হল। শাঙ্কো এবার গলা চড়িয়ে বলল–মাননীয় রাজা, মুখ খুলুন। বড়ি দুটো খেয়ে নিন। রাজার ততক্ষণে শরীরের সাড় ফিরেছে। আস্তে আস্তে মুখ খুললেন। শাঙ্কো বড়ি দুটো খাইয়ে দিল।
এবার ফ্রান্সিস রাজাকে তুলে বসাল। বৈদ্যকে রাজার পিঠ দেখাল। কালসিটে দাগ আর জায়গায় জায়গায় কালচে রক্ত জমে আছে। বৈদ্য দলনেতার দিকে তাকাল। দলনেতা বলল–চাবুক মারা হয়েছিল। ওষুধ দিন।
বৈদ্য ঝোলা থেকে একটা চিনেমাটির বোয়াম বের করল। মুখ খুলে বৈদ্য সবজে রঙের আঠালো কিছু বের করল। ওষুধটা রাজার পিঠে ঠেকাতেই রাজার সারা শরীর কেঁপে উঠল। বৈদ্য আস্তে আস্তে ওষুধটা কালসিটের ওপর লাগিয়ে দিল। রাজার বোধহয় একটু স্বস্তি পেলেন। চুপ করে বসে রইলেন।
বৈদ্য পোটলা ভড় ঝোলায় ভরল। শুধু ঝোলা থেকে ওষুধটা একটা ছোট্ট ভড়ে ভরে দিয়ে শাঙ্কোকে দিল। বলল–রাতে কালকে লাগিয়ে দিও। চিন্তার কিছু নেই। সেরে যাবে।
বৈদ্য চলে গেল। দলপতি গলা চড়িয়ে বলল,
–চিকিৎসার ব্যবস্থা তোতা হল। এবার চ্যাঁচামেচি বন্ধ কর।
ফ্রান্সিসরা কেউ কিছু বলল না। ফ্রান্সিসদের চিন্তা এইসব ওষুধে রাজা পারকোন সুস্থ হবেন তো? তারপরেই ভাবল কয়েকদিনের মধ্যেই তো ফাঁসি মৃত্যু। সুস্থ হওয়া না হওয়া সমান।
ফ্রান্সিসদের মন খারাপ হয়ে গেল। কয়েদঘর থেকে নিরস্ত্র অবস্থায় পালাতে গেলে। আরো কিছু বন্ধু মারা যাবে। ফাঁসির হাত থেকে বাঁচার উপায় ভাবতে হবে। দুহাত বাঁধা থাকবে। দৌড়ে পালানো যাবে না। গভীরভাবে উপায় ভাবতে হবে। ফ্রান্সিস ঘাসপাতার বিছানায় শুয়ে পড়ল।
শাঙ্কো তখনই এল। বলল–রাজা পারকোন কি বাঁচবে?
–দেখা যাক। ওষুধ তো পড়েছে। এর বেশি এখানে আমরা আর কী করতে পারি। এখন তো আমাদের ভেন নেই। ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে রাজা কাদর্জা খুব উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ফ্রান্সিসদের ফাঁসির ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে। রাজবাড়ির সামনে একটা ছোট্ট প্রান্তর। তারপরেই বড় বড় গাছগাছালির বন। তারই কাছে ফাঁসিকাঠের মঞ্চ তৈরি হতে লাগল।
প্রহরীরা নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে কথাবার্তা বলে। তাই থেকে ফ্রান্সিসরা ফাঁসির মঞ্চের কথা জানতে পারল।
ফ্রান্সিসদের মন প্রায় ভেঙে গেল। কেউ কোন কথা বলছে না। সবাই চুপ। একটাই চিন্তা ওদের আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই নেই। নীরবতা ভেঙে এক বন্ধু বলে উঠল– আমরা রাজা পারকোনের হয়ে লড়তে গিয়ে ভুল করেছি। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল।
–কোন ভুল করি নি। এক সৎ প্রজাবৎসল রাজার হয়ে লড়াই করেছি। দুর্ভাগ্য হেরে গেছি। কিন্তু এরকম একজন নৃশংস রাজার পাল্লায় পড়বো স্বপ্নেও ভাবিনি। রাজা কাদর্জা আমাদের ফাঁসি দেবে এতটা ভাবতে পারিনি। কথাগুলো বলে ফ্রান্সিস হাঁপাতে লাগল। হ্যারি বলে উঠল–ফ্রান্সিস একটা প্রশংসনীয় মানবিক কাজ করেছে। তার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না।
ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে। আমি রাজা কাদর্জার কাছে যাচ্ছি। ওরকম একটা রাজার কাছে প্রার্থনা করা অপমানজনক। কিন্তু আমি প্রার্থনা করব। বলবো-আমাকে ফাঁসি দিন। কারণ আমার নির্দেশেই আমার বন্ধুরা লড়তে এসেছিল। এজন্য আমিই দায়ী। আমাকে ফাঁসি দেওয়া হোক। বন্ধুদের মুক্তি দিন।
