নক্সাটা দেখতে ছিল এই রকম—
ফ্রান্সিস হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। দ্বীপটা দেখতে ঠিকই আধখানা চাঁদের মত। নক্সাটা সোজা করলে একরকম কালোকালি দিয়ে আঁকা নক্সা। দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। কিছু লেখাও নেই।
ফ্রেদারিকো আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে-দেখিয়ে সব বোঝাল। ফ্রান্সিস মনে মনে সেগুলোর নাম ভেবে নিয়ে তারপর ম্যাপটাকে উল্টে করে ধরতেই একটা স্পষ্ট নক্সা ফ্রান্সিসের চিন্তায় ধরা দিল। সেটা দাঁড়াল ঠিক এই রকম–
ফ্রেদারিকো বলতে লাগল–একদিন রাজবাড়ি দেখতে গেলাম। নামেই রাজবাড়ি। দেখতে ট্রাভেলার্সট্রীর পাতা দিয়ে ছাওয়া বাড়ি। ঐ গাছের মূল শিরা থেকে দরজা তৈরি করা হয়েছে। এই ট্রাভেলার্সট্রী যে এদের কত কাজে লাগে, তা বলবার নয়। এই গাছের পাতার গোড়ায় জল জমা থাকে। নাড়ালেই প্রচুর মিষ্টি জল পড়ে। পাতার গোড়া ফুটো করলেও জমা জল পড়ে। ফ্রেদারিকো একটু ভেবে বলতে লাগলো–রাজবাড়ির প্রবেশপথের মাথায় মরা মানুষের মাথার খুলি সারি-সারি সাজানো। ভেতরে ঢুকে রাজসভা দেখলাম, বৃদ্ধ রাজা কাঠের তৈরি সিংহাসনে বসে আছে। আশ্চর্য! রাজার মাথা ন্যাড়া। একটিও চুল নেই। পরে শুনলাম, কাঁচ পাহাড়ের পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে চুল তুলে ফেলা হয়। রাজার গলায় হাঁসের ডিমের মত আকারের মুক্তোর মালা। রাজার সিংহাসনেও মুক্তো বসানো। পরনে সর্বাঙ্গে ঢাকা সার্টিনের কাপড়। রাজপুরোহিত, সেনাপতি মন্ত্রী সকলের গলাতেই মুক্তোর মালা। রাজসভার জাঁকজমক নেই। কিন্তু রাজাকে সবাই মান্য করে চলে। চারদিকে বর্শা হাতে ভাজি সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে।
একটু থেমে ফ্রেদারিকো বলতে লাগল–রাজসভার কাজ চলছে। তখনই রাজপুরোহিত উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে রাজাকে কি বলল। রাজা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে রাজপুরোহিতের দিকে তাকিয়ে কী বলে উঠল। তখনই লক্ষ্য করলাম রাজপুরোহিতের গলায় একটা ভাঙা আয়না লকেটের মত ঝুলছে। পরে ঐ ভাঙা আয়না আমি পেয়েছি। আসলে ওটা ছিল জোড়া দেওয়া দুটো আয়না। তারই একটা আমার গলায় ঝুলছে।
–অন্য ভাঙা আয়নাটা?
–সেই কথাটাই এবার বলবো৷ ফ্রেদারিকো কিছুক্ষণ তামাক-পাতা চিবুলো। তারপর বলতে লাগল–পরের দিন আমাদের জাহাজ সোফালা বন্দর ছেড়ে ইউরোপের দিকে পাড়ি দেবে। আগের দিন রাত্রিবেলা। অসহ্য গরম। সমুদ্রেও বাতাস পড়ে গেছে, আমাদের কয়েকজন ডেক-এ বসে গল্পগুজব করছি, হঠাৎ দেখি ডেকের ওপর দিয়ে একটা লোক টলতে টলতে আসছে। একটু লক্ষ্য করে বুঝলাম লোকটা ভাজিম্বা, তবে সাধারণ। ভাজিম্বারা যা পরে, ওর পরনে তা নয়। ওর পরনে সার্টিনের কাপড়। কোমরে সিল্কের কাপড়ের ফেট্টি। একটু চাঁদের মেটে আলোতে এসব লক্ষ্য করলাম। আমি ছুটে গিয়ে ওকে ধরলাম। দেখি কাঁধের দিকে কাপড় রক্তে ভিজে উঠেছে। কাপড়টা সরাতেই লক্ষ্য করলাম কাঁধে বর্শার আঘাতের গভীর ক্ষত। দরুদ করে রক্ত পড়ছে। আমি দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে আমার কেবিনও ঘরে নিয়ে এলাম। ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। উবু হয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ল। আমি ছেঁড়া কম্বলের টুকরো দিয়ে ক্ষত জায়গাটা চাপা দিলাম। রক্তপড়া যখন কমলো, তখন আমার ছেঁড়া জামার টুকরো দিয়ে একটা পট্টি বেঁধে দিলাম। এতক্ষণ ভাজিম্বাটি গোঙচ্ছিল, কথা বলতে পারছিল না। এবার ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় জল খেতে চাইল। আমি ওকে জল খেতে দিয়ে বিশ্রাম করতে ব’লে ছুটলাম জাহাজের বৈদ্যির কাছে। বৈদ্যিকে নিয়ে যখন এলাম, দেখলাম রক্তপড়া অনেক কমেছে। বৈদ্যি ওর চোঙের পাত্র থেকে মাখনের মত একরকম ওষুধ বের করলে। পট্টি খুলে ছেঁড়া কম্বলের টুকরো খুলে ফেলে আস্তে আস্তে মাখনের মত ঐ ওষুধটা দিয়ে পট্টি বেঁধে দিল। একটু পরেই রক্তপড়া বন্ধ হল। ওর ব্যথারও বোধহয় উপশম হ’ল। ও ঘুমিয়ে পড়ল। দেখলাম, আহত লোকটি ঘুমিয়ে আছে। আমি আর কি করি? কাঠের মেঝেতে একটা কম্বল পেতে শুয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙলো একটু বেলাতে। উঠেই আহত লোকটির দিকে তাকালাম। দেখি সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম–কেমন আছো? এবার লক্ষ্য করলাম লোকটির বয়স খুবই কম। ছেলেমানুষই বলা যায়। ও মৃদু হেসে মাথা ঝকাল। বুঝলাম এখন একটু ভালো বোধ করছে. ওকে রেখে রসুই ঘরে গেলাম। সকালের খাবার খেতে। খেয়েদেয়ে ওর জন্যেও কিছু খাবার লুকিয়ে নিয়ে এলাম। ও খাচ্ছে যখন, তখনই জাহাজের ডেক থেকে জোর-জোর কথা ভেসে এল। অস্পষ্ট হলেও ক্যাপ্টেনের গলা শুনলাম। বলেছে–এই জাহাজে কেউ আসেনি। বুঝলাম, ছেলেটির খোঁজে নিশ্চয়ই ভাজিম্বারা এসেছে। ধরা পড়লে ছেলেটির মৃত্যু সুনিশ্চিত। যে কারণেই হোক ছেলেটিকে ওরা মেরে ফেলতে চায়। আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম। ছুটে গিয়ে ছেলেটির ডান হাত ধরে আস্তে টানলাম–শিগগির আসো। ছেলেটি তখনও খাওয়া শেষ করে নি। ও একটুক্ষণ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমি তাড়া দিলাম চলো। ও খাওয়া ফেলে আমার পিছনে-পিছনে চললো। ছুটে গিয়ে ভাড়ার ঘরে ঢুকলাম। চারদিকে তাকিয়ে লুকোবার জায়গা খুঁজলাম। পেলাম। বড়-বড় ময়দার বস্তার পেছনে যে ফাঁক পেলাম, তাই দেখিয়ে বললাম–শীগগির লুকাও এখানে। কোনরকম শব্দ করবে না। ভয় নেই, আমি ডেকে নিয়ে যাবো। ওকে লুকিয়ে রেখে তাড়াতাড়ি কেবিন ঘরগুলোর দিকে এলাম। যে দুই বন্ধু গত রাত্রে আহত ছেলেটিকে দেখেছে, তাদের একজনকে পেলাম। একপাশে ডেকে নিয়ে ফিসফিস্ করে বললাম কাল রাত্তিরে যে আহত ভাজিম্বাকে দেখেছো, তার কথা কাউকে বলো না। সে মাথা নেড়ে সম্মত হলো। ওদের নিয়ে ডেক-এ উঠে এলাম। দেখলাম, কয়েকজন ভাজি সৈন্য বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে ওদের সেনাপতি। তার গা খোলা। গলায় ঝুলছে একটা মুক্তোর লকেট। পরনে সাটিনের কাপড়। কোমরে সিল্কের পট্টি বাঁধা। মুখটা পাথরের মত কঠিন। তার হাতে খোলা তরোয়াল। আমাদের ক্যাপ্টেন তখন বলছে–যদি কেউ আসতো, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের নজরে পড়তো।
