বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শোভাযাত্রা জামিনাতে ঢুকল। সদর রাস্তার ধারে ধারে লোকজন জড় হল ঠিকই। কিন্তু কোথাও কোন আনন্দ উচ্ছ্বাস নেই। কাদর্জা বেশ ক্রুদ্ধ হল। দেশজয় করে ফেরার পরেও প্রজাদের মধ্যে আনন্দ উল্লাস নেই। কিন্তু উপায়ও তো নেই। কিছু করারও নেই। শোভাযাত্রা রাজবাড়ির সামনে এসে শেষ হল।
লোকজন ফ্রান্সিসদের দেখে বেশ অবাকই হল। এরা কারা? এদের বন্দী করে আনা হয়েছে কেন? রাজা ঘোড়া থেকে নেমে রাজবাড়িতে ঢুকে পড়ল। সৈন্যরা সৈন্যাবাসের দিকে চলল। প্রহরীদের দলপতি ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এল। সৈন্যদের থেকে ফ্রান্সিসদের আলাদা করল। ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল রাজবাড়ির পূর্ব কোণারদিকে। বোধহয় ওদিকেই কয়েদ ঘর।
ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরের সামনে নিয়ে আসা হল। ঠং-ঠং শব্দে লোহার দরজা খোলা হল। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস আবার কয়েদ ঘরের জীবন। জীবনের বেশ কিছুটা সময় কয়েদ ঘরেই কেটে গেল।
–ঠিকই বলেছে। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।
কয়েদ ঘরে ঢুকল ফ্রান্সিসরা। বেশ বড় ঘর। বন্দীদের সংখ্যাও অনেক। হতেই হবে। রাজা কাদর্জার রাজত্বে এটা অস্বাভাবিক কিছুনয়। কারো মুখে রাজার নিন্দা শুনলে সৈন্যরা ধরে এনে কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দেয়। কাজেই বন্দীর সংখ্যা বেশি হবে এটা স্বাভাবিক।
ফ্রান্সিস দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসল। হ্যারি পাশে বসল।
শাঙ্কো দরজার কাছে গেল। প্রহরীদের ডেকে বলল–ভাই ঘরেই তো আটকে আছি। তবে আর হাত বাঁধা থাকে কেন? হাত খুলে দাও।
দলপতি যদি চায় তবেই তোমাদের হাত ভোলা হবে। প্রহরী বলল।
–দলপতির সঙ্গে কথা বলবো। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। বলছি। প্রহরী বলল।
একটু পরেই দলপতি এল। দলপতির মুখে দাড়ি গোঁফ। বেশদীর্ঘদেহী। বলিষ্ঠ। বলল– কী ব্যাপার?
বলছিলাম পুরোনো বন্দীদের তো হাত খোলা। তবে আমাদেরও হাত খোলা থোক। ঘরেই তো আটকা আছি তবে আর হাত বাঁধা থেকে কী হবে। শাঙ্কো বলল।
দলপতি কিছুক্ষশ শাঙ্কোরমুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল–বেশ। তোমাদের বাঁধা হাত খুলে দেওয়া হচ্ছে। খোলা হাতপা নিয়ে যে ক’টা দিন বাঁচার বাঁচো।
–ঠিক বুঝলাম না। শাঙ্কো বলল।
–তোমাদের বাঁচার কোন আশা নেই। রাজা কাদর্জা বেশ কিছুদিন ফাঁসিটাসি দেখেন না। তোমাদের ফাঁসিতে লটকিয়ে সেই দৃশ্য দেখবেন। লোকের কষ্ট যন্ত্রণা মৃত্যু দেখলে রাজা কাদর্জা খুব খুশি হল। ওসব উপভোগ করেন। দলপতি বলল।
শাঙ্কো বুঝল ওদের রেহাই নেই। রাজা কাদর্জা নিশ্চয়ই ওদের ফাঁসি দেবে। বলল– আমরা তো বিদেশী আমাদের বাঁচামরা নিয়ে রাজা অত ভাবছে কেন?
–তোমরা রাজা পারকোনের হয়ে লড়াই করেছে। কাজেই তোমাদের শাস্তি পেতে হবে। দলপতি বলল।
–তাই বলে ফাঁসি? শাঙ্কো বলল।
–এতে তো কষ্ট কম। রাজা অপরাধীকে কষ্ট দিয়ে মারেন। তোমরা কষ্টকর মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলে। দলপতি বলল।
–হুঁ। শাঙ্কো মুখে শব্দ করল।
একজন প্রহরী একটা ছোরা হাতে ঘরে ঢুকল। একে একে ফ্রান্সিসদের হাতবাঁধা দড়ি কেটে দিল। ফ্রান্সিসদের কষ্টটা কমল। বাঁধা হাতের অস্বস্তি থেকে বাঁচা গেল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। ডাকল–ফ্রান্সিস?
–বলল। ফ্রান্সিস বলল।
–একটা কথা বলছিলাম। শাঙ্কো বলল।
কী কথা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–রাজা পারকোনের হয়ে লড়াই করাটা বোধহয় আমাদের উচিত হয়নি। শাঙ্কো বলল।
–এ কথা বলছো কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–দলপতি বলছিল আমাদের ফাঁসি দেওয়া হবে। কারণ রাজা পারকোনের হয়ে আমরা লড়াই করেছি। শাঙ্কো বলল।
আমাদের ফাঁসি হবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। দলপতি তাই বলল। শাঙ্কো বলল।
–রাজা পারকোনের হয়ে লড়াই করে আমরা কোনো ভুল করি নি। রাজা পারকোন একজন প্রজাবৎসল সৎ রাজা। আমরা তার জয় চেয়েছি। হেরে গেছি সেটা আলাদা। কথা। ফ্রান্সিস বলল,
–ফাঁসির হাত থেকে তো বাঁচার কোনো উপায় নেই। শাঙ্কো বলল।
–সেটা দেখতে হবে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল–রাজা পারকোনকে দেখে এলাম। খুবই কাহিল হয়ে পড়েছেন গায়ে বেশ জ্বর। অজ্ঞান-টজ্ঞান না হয়ে যায়।
ঠিক তাই ঘটল। রাজা পারকোন জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। হ্যারি ফ্রান্সিসকে। বলল–তার চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। নইলে মারা যাবেন। শাঙ্কো ছুটে গেল রাজার কাছে। কাঠের গ্লাশে জল নিয়ে রাজার মাথায় ঢালল। কপালে জল বুলিয়ে দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস উঠে লোহার দরজার কাছে গেল। একজন প্রহরীকে বলল–তোমাদের দলনেতাকে ডাকো।
–পারবো না। প্রহরী বলল।
–ভাই রাজা পারকোন জ্বরে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। তার এক্ষুনি চিকিৎসার প্রয়োজন। ফ্রান্সিস নরম সুরে বলল–নইলে মানুষটা মারা যাবে।
দলনেতা আসবে না। প্রহরী বলল।
–তোমাকে আমি ভাই বলে বলছি। দলনেতাকে আসতে খবর দাও। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি পারবো না। প্রহরী বলল।
–ঠিক আছে। কাছে এসে দেখো। ফ্রান্সিস বলল।
প্রহরী দরজার কাছে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস এটাই চাইছিল। হাতের নাগালের কাছে আসতেই ফ্রান্সিস দ্রুত হাত বাড়িয়ে ওর গলা চেপে ধরল। প্রহরী তরোয়াল তুলতে গেল। ফ্রান্সিস তার আগেই লোহার দরজায় ওর মাথা ঠুকে দিল। প্রহরী ওমাগো বলে চিৎকার করে উঠল। প্রহরীরা সব ছুটে এল।
শাঙ্কোরাও উঠে এসে দরজার কাছে ভিড় করল। প্রহরীরা তরোয়াল চালাবার আগেই ফ্রান্সিস প্রহরীকে ছেড়ে দিল। বলল–এবার যাও। দলনেতাকে ডেকে আনন। প্রহরীটির কপাল থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। ও কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। শাঙ্কো চেঁচিয়ে– বলল–শিগগির দলনেতাকে ডেকে আনো। ভাইকিংরা একসঙ্গে ধ্বনি তুলল-ও হো-হো। প্রহরীরা ঘাবড়ে গেল।
