–আমি জানি না। রাজা পারকোন মৃদুস্বরে বললেন।
–জোরে বলুন। কাদর্জা চেঁচিয়ে বলল।
–আমি জানি না। পারকোন জোরে বললেন।
বাজে কথা আপনি জানেন। আমি লড়াই করতে আসছি শুনে সেই ধনভাণ্ডার বাইরে বের করেন নি। এবার বলুন কোথায় সেই ধনভাণ্ডার? কাদর্জা বলল।
-আমি কিছু জানি না। পারকোন বললেন।
–এ্যাই–চাবুকওয়ালাকে ডাক। কাদর্জা চিৎকার করে বলল।
একপাশ থেকে কালো পোশাক পরা একজন লোক চাবুক হাতে এগিয়ে এল।
–মার চাবুক। চাবুকের মারনা খেলে মুখ খুলবেনা। কাদর্জা বলল।
লোকটি পারকোনের পিঠ লক্ষ্য করে চাবুক চালাল। বাতাসে শশ শব্দ উঠল। পারকোনের শরীর কেঁপে উঠল।
মার চাবুক। কাদর্জা চেঁচিয়ে বলল। আবার চাবুকের মার নেমে এল। রাজা পারকোনের পিঠের দিকে জামা ছিঁড়ে গেল। কালশিটে দাগ ফুটে উঠল।
এবার বলুন। কোথায় সেই গুপ্তধনভাণ্ডার? কাদর্জা বলল।
–আমি জানি না। রাজা পারকোন একই স্বরে বললেন।
–আপনি জানেন। পাছে আমি জেনে ফেলি তাই কোন কথাই বলছেন না। ঠিক আছে। আজকে থাক। সারারাত ভাবুন। কালকে আবার চাবুক মারা হবে। কাদর্জা বলল।
রাজা পারকোনের মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। হাত তুলে বললেন–মাননীয় রাজা কাদর্জা– রাজা পারকোনকে এভাবে চাবুক মেরে কোন লাভ নেই। কারণ উনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। যদি জানতেন তাহলে কি এতদিনে উদ্ধার করতেন না?
-ঠিক আছে। আমার সেনাপতিকে আমি এ দেশের রাজা করে দিয়ে যাবো। সে গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খোঁজ করবে। উদ্ধার হলে সমস্ত ধনভাণ্ডার আমার হবে। আর কোন দাবিদার থাকবেনা। কাদর্জা বলল।
–ঠিক আছে। এটা আপনি করতে পারেন। মন্ত্রী বললেন।
–আপনি কে? মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রাজা কাদর্জা বলল।
–আমি রাজা পারকোনের মন্ত্রী। মন্ত্রী বললেন।
-দেখছি আপনাকে বন্দী করা হয় নি। কাদর্জা বলল।
আমার মত বৃদ্ধকে বন্দী করে কী লাভ? আমি ছুটোছুটিও করতে পারবো না, তরোয়াল হাতে লড়তেও পারবোনা! আমি বড়জোর বুদ্ধি দিতে পারি। প্রয়োজনে পরামর্শ দিতে পারি। মন্ত্রী বললেন।
যাক গে–আপনাকেআর বন্দী করা হবেনা। আমার সেনাপতি এখানে নতুন রাজা হবে। আপনি তার পরামর্শদাতা হয়ে থাকবেন। বদলে ভালো মাইনে পাবেন। কাদর্জা বলল।
আপনাকে ধন্যবাদ। মন্ত্রী বললেন।
ফ্রান্সিস যে ঘরে বন্দী হয়ে ছিল রাজা পারকোনকে সেই ঘরেই ঢোকানো হল। পারকোন ঘাসপাতা ছড়ানো মেঝেয় শুয়ে পড়লেন। রাজার শরীরের দশা দেখে ফ্রান্সিসরা চমকে উঠল। কী নির্মমভাবে চাবুক মারা হয়েছে। রাজা কিন্তু গোঙাচ্ছেন না।
ফ্রান্সিস রাজার কাছে গেল। আস্তে আসতে বলল,
মাননীয় রাজা–খুব কষ্ট হচ্ছে?
রাজা শুকনো ঠোঁটে হাসলেন। নিম্নস্বরে বললেন–চাবুক খেয়ে কষ্ট হবে না?
–আপনাকে চাবুক মারা হল কেন? হ্যারি জানতে চাইল।
–রাজা কাদর্জার ধারণা আমি আমার পূর্বপুরুষদের ধনসম্পত্তির হদিশ জানি। যাতে আমি হদিশ বলে দিই তাই নির্মমভাবে চাবুক মারা। রাজা পারকোন বললেন।
ফ্রান্সিসদের দলে ভেন ছিল না। ভেন থাকলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেত।
শাঙ্কো জালায় রাখা জল থেকে কাঠের গ্লাশে এক গ্লাশ জল নিয়ে এল। রাজার পিঠে কালশিটে দাগের ওপরআস্তে আস্তে জল বুলিয়ে দিতে লাগল। রাজা একটু নড়ে উঠেস্থির হলেন। চুপ করে শুয়ে রইলেন।
শুধু যুদ্ধে জয়লাভ করেই রাজা কাদর্জা সন্তুষ্ট রইল না। সে লুঠ করা শুরু করল। সে চারপাঁচজন অনুচর নিয়ে গর্ভগৃহগুলো অধিবাসীদের সোনা, হীরে, মুক্তো, দামি পাথর লুঠ করতে শুরু করল। কেউ বাধা দিতে সাহস পেল না। অবাধ লুঠ চলল। রাজা কাদর্জা খুব # খুশি। অনেক মণিমুক্তো দামি গয়না পেল।
কাদর্জা দেশে ফিরে যাবার জন্যে তৈরী হল। রাজা পারকোনের সভাঘর সেনাপতিকে রাজা করার জন্যে আয়োজন চলল। রাজার দুত এদেশীয়দের মধ্যে প্রচার করল রাজা। পারকোনের রাজার সভাগৃহে আসার জন্যে।
রাজসভাগৃহে ভালোই লোক হল। এদেশীয়রা তো ছিলই কাদর্জার সৈন্যরাও সারি দিয়ে দাঁড়াল।
রাজসিংহাসনের কাছে রাজা কাদর্জা দাঁড়াল। সেনাপতি নিচে থেকে উঠে এল। রাজা কাদর্জা তরোয়াল খুলে সেনাপতির দুই কাঁধ ছোঁয়াল। হাত বাড়িয়ে সিংহাসন দেখাল। সেনাপতি আস্তে আস্তে গিয়ে সিংহাসনে বসল। সেনাপতি ঐ দেশের রাজা হয়ে গেল। উপস্থিত সৈন্যরা হৈ হৈ করে আনন্দ প্রকাশ করল। এদেশীয়রা মুখে কোন শব্দ করল না। আস্তে আস্তে রাজসভা ছেড়ে চলে গেল।
এবার ফেরার পালা। রাজা কাদর্জার হুকুমে রাজা পারকোন আর ফ্রান্সিসদের পেছনে রাখা হল। তাদের আগে পিছে সৈন্যরা একেবার সামনে কালো ঘোড়ার ওপরে কাদর্জা।
তখন সকাল। রোদ্দুরের তেমন তেজ নেই। আকাশ মেঘলা। শোভাযাত্রা চলল জামিনার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে হ্যারি ডাকল–ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল।
কী ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদের বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন? হ্যারি বলল।
–হয়তো আমাদের বিচারটিচার হবে। তারপর শাস্তি। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের অপরাধ? শাঙ্কো বলল।
–রাজা পারকোনের হয়ে লড়েছি। কাজেই আমাদের সহজে ছেড়ে দেবে না। আমাদের জীবন সংশয়। ফ্রান্সিস বলল।
শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল। কী উৎসাহ, কী উদ্দীপনা। যুদ্ধ জয় করে ফিরছে। রাজা কাদর্জা মাঝে মাঝেই তরোয়াল উঁচিয়ে হা হা করে হাসছে।
হঠাৎ আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামল। অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে দিয়েই শোভাযাত্রা চলল। সবাই ভিজে একশা। কাদর্জাও বাদ গেল না। কাদর্জা নড়লও না। ঠায় বসে রইল।
