–বেশি না। দশ বারোজন তৈরি হয়ে আমার সঙ্গে চলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধুরা– তৈরি হল। জাহাজ থেকে নেমে এল। প্রত্যেকেই তরোয়াল নিল। সবাই চলল রাজা পারকোনের রাজত্বের দিকে। সন্ধ্যে নাগাদ সবাই সেখানে পৌঁছল।
বন্ধুরা ফ্রান্সিসদের সঙ্গেই রইল।
রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হল। তখন রাজা পারকোন এলেন। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। পারকোন বললেন–বসো বসো। সবাই বসল। পারকোন বলনেল খবর পেয়েছি কাল সকালেই রাজা কাদর্জা আমাদের রাজ্য আক্রমণ করবে। তোমরা বীরের জাতি। তোমাদের সাহায্য আমাদের অবশ্য প্রয়োজন। অনুরোধ তোমরা আমাদের হয়ে লড়াই করো।
–আমরা লড়াই করবো। ফ্রান্সিস বলল–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
–তোমাদের সাফল্য কামনা করি। রাজা পারকোন বললেন। তারপর চলে গেলেন।
পরদিন সকালেই সারা রাজ্য জুড়ে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। রাজা পারকোনের, সৈন্যরা অস্ত্র হাতে ছুটে এল। রাজার গর্ভগৃহের সম্মুখে বিরাট প্রান্তর। সব সৈন্য সেখানে জড়ো হল। কিছু পরে দূরে দেখা গেল কাদর্জার সৈন্যবাহিনী আসছে। একেবারে সামনে একটা কালো ঘোড়ায় চড়ে রাজা কাদর্জা।
রাজা পারকোনের সৈন্যদের দেখে চিৎকার করতে করতে কাদর্জার সৈন্যরা ছুটে আসতে লাগল। রাজা পারকোনের সৈন্যরাও ছুটে গেল।
লড়াই শুরু হল। চিৎকারে আর্তনাদে তরোয়ালে তরোয়ালে ঠোকাঠুকির শব্দে প্রান্তর ভরে উঠল।
একপাশে ফ্রান্সিসরা লড়াই চালাল। যোদ্ধা হিসেবে ভাইকিংরা যে কম যায় না কিছুক্ষণ লড়ে কাদর্জার সৈন্যরা বুঝতে পারল।
চারজন সৈন্য ফ্রান্সিসকে ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস বিদ্যুৎগতিতে তরোয়াল চালাতে লাগল। বুকে গলায় তরোয়াল চালিয়ে ফ্রান্সিস দুজনকে মেরে ফেলল। বাকি দুজন লড়তে লাগল। ফ্রান্সিস হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে একজনের তরোয়ালে ঘা মারল। সৈন্যটির হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। সৈন্যটি হতভম্ভ হয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ও তরোয়াল খুঁজতে চলে গেল। অন্যটির বুকের কাছে তরোয়াল চালিয়ে জামা কেটে দিল। সৈন্যটি খালি গায়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস হঠাৎ দ্রুত শুয়ে পড়ল। গড়িয়ে গিয়ে সৈন্যটির পায়ে তরোয়ালের ঘা মারল। সৈন্যটির পা কেটে গেল। ও পা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
ভাইকিং বন্ধুরাও জোর লড়াই চালাল। চিৎকার গোঙানি আর্তনাদে প্রান্তর ভরে উঠল।
রাজা কাদর্জা ঘোড়ার পিঠে চেপে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তার সৈন্যদের উৎসাহ দিতে লাগল।
রাজা পারকোন শান্তস্বভাবের মানুষ। যুদ্ধবিগ্রহ মোটেই পছন্দ করেন না। যুদ্ধক্ষেত্রের এক কোণে এক গাছের নিচে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। যুদ্ধ চলল।
বেশ কয়েকঘণ্টা পরে যুদ্ধের জয়পরাজয়ের আভাস পাওয়া গেল। রাজা পারকোনের সৈন্যদের সংখ্যা কমে গেল। আহত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে গেল। কাদর্জার সৈন্যরা উল্লাসে চিৎকার করতে লাগল। সন্ধ্যের সময় পারকোনের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। রাজা পারকোন তাদের ফেরাবার চেষ্টা করলেন না। ফ্রান্সিসরা কয়েকজন তাদের ফেরাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু তারা ফিরলো না।
যুদ্ধের ফলাফল এখন স্পষ্ট। রাজা পারকোনের জয়ের কোন আশাই রইলো না। কাদর্জার সৈন্যরা ভোলা তরোয়াল হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘুরতে লাগল। পারকোনের আহত সৈন্যদের হত্যা করতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। এই নিষ্ঠুরতা দেখে ওর মন বিচলিত হল। এরা কি মানুষ? কিন্তু নিরুপায়। ওরা পরাজিত।
ফ্রান্সিসদের বন্ধুরা একত্রিত হল। একদল কাদর্জার সৈন্য ওদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিসদের চেহারা-পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে বুঝল ওরা বিদেশী। ওদের যত রাগ পড়ল ফ্রান্সিসদের। ওপর। দড়ি দিয়ে ফ্রান্সিসদের হাত বেঁধে ফেলল। দুজন আহত ভাইকিং কোনরকমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাল। তিনজন মারা গেল।
রাজা কাদর্জার সেনাপতিতখনই ওখানেএল। ফ্রান্সিসদের বন্দী দেখে খুশি হল। বলল ভালো করেছিস। এরা আমাদের অনেক সৈন্যকে মেরেছে। সন্দেহ নেই ভালো লড়িয়ে।
ফ্রান্সিস বলল–একটা কথা বলছিলাম।
-বলো। সেনাপতি বলল।
–আমাদের তিন বন্ধু মারা গেছে। আমরা তাদের কবর দিতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
কবরটবর দেওয়া চলবে না। আমরা সব মৃতদেহ পাহাড়ের গহ্বরে ছুঁড়ে ফেলে দেব। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকাল। সকলেরই মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু উপায় কি। এই নির্মমতা মেনে নিতেই হবে।
সেনাপতি একটা ছোট্ট গর্ভগৃহে ফ্রান্সিসদের বন্দী করে রাখল। ফ্রান্সিসরা প্রায় জড়াজড়ি করে শুয়ে রইল। ওদিকে রাজা পারকোনের সভাঘরের পাথরের সিংহাসনে রাজা কাদর্জা বসল। হা হা করে হাসতে হাসতে একজন অমাত্যকে বলল–যান পরাজিত রাজা পারকোনকে নিয়ে আসুন। অমাত্য চলে গেল।
কিছু পরে রাজা পারকোনকে নিয়ে এল। কাদর্জা হেসে বলল–আরে–এখনও আপনার হাত বাঁধা হয়নি। প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল–এ্যাই হাত বেঁধে দে। একজন প্রহরী দড়ি এনে রাজা পারকোনের দুহাত বেঁধে দিল।
–আমার সঙ্গে লড়তে এসেছিলেন। আপনার দুঃসাহস। ফল দেখলেন তো? আমাকে যুদ্ধে হারায় এই অঞ্চলে কেউ নেই। কাদর্জা বলল।
পারকোন কোন কথা বললেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এবার আসল কথায় আসি–রাজা কাদর্জা বলল–আপনার কোন পূর্বপুরুষ আপনাদের ধনসম্পদ এখানকার কোন গর্ভগৃহে গোপনে রেখে গেছে। সেই ধনসম্পদ আমার চাই। এবার বলুন কোথায় আছে সেই ধনভাণ্ডার। কাদর্জা গলা চড়িয়ে বলল।
