ফ্রান্সিস ওকাজার দিকে তাকাল। বলল–ভাই তুমি একটু আমাদের সঙ্গে এসো। আমরা রাজা কাদর্জা ও তার দেশ জামিনা সম্মন্ধে জানতে চাই। এসো।
ফ্রান্সিস রাজা পারকোনকে সম্মান জানিয়ে চলে এল। নিজেদের ঘরে এসে বসল। ফ্রাসিস বলল–ওকাজা এবার বলতো রাজা কাদর্জা ও ঐ দেশ জামিন সম্মন্ধে।
ওকাজা আস্তে আস্তে বলতে লাগল রাজা কাদর্জার মত নৃশংস মানুষের নরকেও ঠাই হবেনা। জামিনার প্রজারা রাজা কাদর্জাকেঘৃণার চোখে দেখে। মুখে তো কিছু বলতে পারে না। জামিনায় চলছে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব। রাজার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার উপায়। নেই। গুপ্তচর ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজ্যময়। রাজার বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বললে গুপ্তচর। টুটি চেপে ধরছে। সৈন্যাবাসের কাছেই কয়েদখানা। সঙ্গে সঙ্গে কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দেবে। কাদর্জারকয়েদখানা সবসময়ই ভর্তি। নরকেআরএকনামকাদর্জারকয়েদখানা। একবার ঐকয়েদখানায় ঢুকলে একমাত্র মরলেই বেরিয়ে আসা যায়। নইলে নয়। ঐ কয়েদখানায় দশ-বারো বছরের ছেলেরাও রয়েছে। রাস্তায় হয়তো খেলাচ্ছলে কাদর্জার নিন্দে করেছে। প্রহরীরা ওদের ধরে নিয়ে গেছে। জামিনাতে এই অবস্থাই চলছে।
একটু থেমে ওকাজা বলল–একটা ঘটনা শুনুন। রাজা কাদর্জাকে হত্যার চেষ্টা চলেছে। বছরকয়েক। একবার রাজা কাদর্জা পাহাড়ি এলাকার জনবসতি দেখেটেখে নেমে আসছে– কোত্থেকে একটা বর্শা উড়ে এল। লাগল রাজার ডানবাহুতে। রাজা বসে পড়ল। প্রহরীদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। ধারে কাছের লোকজন পালিয়ে গেল। দুর্ভাগ্য যে যুবকটি বর্শা ছুঁড়েছিল সে প্রহরীদের হাতে ধরা পড়ল। ওখানেই প্রহরীদের হাতে মারাত্মক মার খেল। কিন্তু যুবকটি কাঁদল না।
রাজাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে আসা হল। রাজার চিকিৎসা শুরু হল।
পরদিন রাজার হুকুমে ঐ পাহাড়ি জনবসতির ওপর রাজার দেড়শ দু’শ সৈন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। নির্বিচারে মানুষ মরতে লাগল। শিশুনারীও বাদ গেল না। তাতেও হল না। বাড়িগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। সব বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
ওকাজা থামল। তারপর বলল কাদর্জার নৃশংসতার কত ঘটনা বলবো।
–সেই যুবকটির কী হল? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
যুবকটিকে কয়েদ ঘরে আটকে রাখা হল। দুদিন না খাইয়ে এমনকি জল পর্যন্ত খেতে না দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হল রাজবাড়ির সামনে। অনেক প্রজা ভিড় করে দেখতে এসেছিল। অনেকেই কেঁদেছে। যুবকটি কিন্তু বিন্দুমাত্র কষ্ট প্রকাশ করেনি। আমি অবাক হয়ে যুবকটির দিকে তাকিয়েছিলাম।
কাদর্জার আর এক শাস্তির নমুনা পাহাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলা। আর একটি নদীর জলে চুবিয়ে মারা। দেশবাসী ক্ষেপে আগুন হয়ে রয়েছে। কিন্তু নিরুপায়।
–ঐ নৃশংস অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে দেশবাসীরুখে দাঁড়াতে পারছেনা? ফ্রান্সিস বলল।
ওকাজা বলল-অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষ দল বাঁধে। জামিনাতেই দল বাঁধা হয়েছে। তবে এখনও বেশিদিন হয়নি। তবে সেই দল প্রজাদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। দল বাড়ছে। একদিন তারা বিদ্রোহ করবেই। ওকাজা বলল।
–এই তো কাজের কথা। ফ্রান্সিস বলল কাপুরুষের মতো পড়ে পড়ে মার খাওয়া কোন কাজের কথা নয়।
ওকাজা উঠেদাঁড়াল। বলল–চলি।
–পরে হয়তো তোমার কাছ থেকে আরো কিছু জানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাকে ডাকলেই আমি আসবো৷ওকাজা বলল।
–তুমি যে বিদ্রোহের কর্তা বললে তার কি প্রস্তুতি চলছে?
–হ্যাঁ। অত্যন্ত গোপনে বিদ্রোহী নেতা পারেলার দল তৈরি হচ্ছে। আমিও সেই দলে আছি। মাঝে মাঝে জামিনায় যাই। বিদ্রোহীদের সাহায্য করি। নানাভাবে। পারেলা আমাকে খুব ভালোবাসে। আমিও পারেলার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। একদিন বিদ্রোহ হবেই। নৃশংস কাদর্জার সন্ত্রাসের রাজত্ব শেষ হবে। জামিনায় নতুন যুগের সূচনা হবে। ওকাজা বলল।
–তাই যেন হয়। ফ্রান্সিস বলল।
ওকাজা বলল জানেন–পারেলার দলের দশজনকে কাদর্জা ফাঁসি দিয়েছে। কিন্তু বিদ্রোহীদের দমাতে পারেনি। ওকাজা চলে গেল।
রাজা পারকোনের আশঙ্কা সত্য হল।
একদিন রাজা পারকোন গুপ্তচর মারফৎ সংবাদ পেল রাজা কাদর্জা তার দেশ আক্রমণ করতে আসছে। দু’একদিন মধ্যেই কাদর্জার সৈন্যবাহিনী পৌঁছে যাবে।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–সামনেই লড়াই। বন্ধুদের নিয়ে আসতে হয়।
–আমিই যাবো। কিন্তু মন্ত্রীকে বলে যেতে হবে। ওঁর অনুমতি দরকার। শাঙ্কো বলল।
–বেশ তো বলে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো মন্ত্রীর কাছে গেল। মন্ত্রী চুপচাপ পাথরের আসনে বসেছিলেন।
মাননীয় মন্ত্রীমশাই–শুনেছেন বোধহয় রাজা কাদর্জা এই দেশ আক্রমণ করতে আসছে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ শুনেছি। সামনে বড় দুর্দিন। মন্ত্রী বললেন।
–একটা কথা বলছিলাম। শাঙ্কো বলল।
–বল–মন্ত্রী বলল।
–এই লড়াইয়ে আমার ভাইকিং বন্ধুরাও অংশ নেবে। রাজা পারকোনের হয়ে তারা লড়বে। ফ্রান্সিস বলল।
-খুব ভালো কথা। মন্ত্রী বললেন।
–সমুদ্রতীরে জাহাজঘাট আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। জাহাজে বন্ধুরা আছে। তাদের মধ্যে থেকে দশ-বারোজনকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি অনুমতি
—-হ্যাঁ। যাও। বন্ধুদের নিয়ে এসো। আমাদের জিততেই হবে। মন্ত্রী বললেন।
দুপুরে খেয়েদেয়ে শাঙ্কো সমুদ্রতীরের দিকে রওনা হল। যখন জাহাজে পৌঁছল তখন বিকেল। শাঙ্কোকে দেখে বন্ধুরা হৈ হৈ করে উঠল। ছুটে শাঙ্কোর কাছে এল। ওদের জিজ্ঞাসা ফ্রান্সিস ভালো আছে তো? মারিয়াও এল শাঙ্কো বলল-রাজকুমারী–কোনরকম দুশ্চিন্তা করবেন না। ফ্রান্সিস সুস্থসবল আছে। তারপরশাঙ্কো পারকোনের রাজত্বে লড়াইয়ের কথা বলল। বলল–ফ্রান্সিসের সিদ্ধান্ত আমরাও লড়াইয়ে অংশ নেব। লড়াইয়ের কথা শুনে ভাইকিংরা খুশি হল। কর্মহীন অবস্থায় জাহাজে থাকা ওদের ভালো লাগছিল না।
