–প্রয়োজন আছে। এই লড়াই থামাতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি পারবে না।
–দেখা যাক, তুমি শুধু বলল রাজা তুরীন কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–চলো৷ নিয়ে যাচ্ছি। সৈন্যটি বলল।
অন্ধকারের মধ্যে প্রায় হাতাহাতি লড়াই চলছে। তার মধ্যে দিয়ে সৈন্যটি ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা একটা ঝাকড়া-মাথা গাছের কাছে এল। সৈন্যটি ইঙ্গি তে গাছের নিচে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকা একজন মধ্যবয়সীকে দেখাল। রাজা তুরীন বেশ অসহায়ভাবে বসে আছেন। মাথার কঁচাপাকা চুল নাকমুখ পর্যন্ত ছুড়য়ে আছে। পোশাক সব ভিজে, বাঁ হাতে বৃষ্টিভেজা রক্তের দাগ।
তখন লড়াই থেমে গেছে। চিৎকার আর তরোয়ালে-তরোয়ালে ঠোকাঠুকি ধাতব শব্দ বন্ধ।
রাজা তুরীনের চারপাশে রাজা পারকোনের চার-পাঁচজন সৈন্য খোলা তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্রান্সিস রাজা তুরীনের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, মাননীয় রাজা, আপনারও রাজা পারকেনের মধ্যে লড়াই চলছে শুধু একটা বিষয় নিয়ে–কে পাবে অতীতের এক রাজার গুপ্তধন।
রাজা তুরীন একটু অবাক হয়ে বিদেশি যুবকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফ্রান্সিস বলতে।
লাগল, কিন্তু গুপ্তধন গুপ্তই থেকে গেছে, অন্তত এখন পর্যন্ত। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল, মাননীয় রাজা তুরীন, আমার বিনীত অনুরোধ যুদ্ধের কথা ভুলে যান। পরাজিত হলেও আপনার কথার মূল্য আমার কাছে কম নয়। আজকে আপনি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত। তাড়াতাড়ি খেয়ে আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। কাল রাজা পারকোনের রাজসভায় আপনাকে যেতে হবে। আমরাই নিয়ে যাবো।
-কী আর বলবো সেখানে গিয়ে! রাজা তুরীন অসহায়ভাবে বললেন।
–আপনাকে কিছুই বলতে হবেনা। শুধু আমার কাজটায় সম্মতি দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি। কথাটা বলে রাজা তুরীন হতাশভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ফ্রান্সিস শান্তভাবে বলল, মান্যবর রাজা, দুঃখ করবেন না। আমি আপনাকে আপনার রাজ্য ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করবো। আপনি শান্ত হোন।
রাতে একটু তাড়াতাড়িই খাওয়া-দাওয়া সারল সবাই। রাজাতুরীনকে শুকনো পোশাক দেওয়া হলো। শোবার জায়গাও করে দেওয়া হলো।
পরদিন বেশ ভভরে ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। ও আর শুয়ে রইল না। উঠে মন্ত্রীর কাছে এল। মন্ত্রী উঠে বসেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল, মন্ত্রীমশাই, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।
–কী কাজ?
রাজসভায় রাজা তুরীনকে বসাবার ব্যবস্থা করবেন।
রাজা তুরীন হয়তো রাজসভায় যেতেই চাইবেনা।
–সেটা আমি দেখবো। আপনি শুধু সম্মান জানিয়ে তাকে বসতে দেবেন।
–এখন রাজা পারকোনকে বলা। অবশ্য আমিও বলবো।
ফ্রান্সিস রাজা তুরীনের কাছে এল। রাজা তুরীন অল্প জায়গার মধ্যেই পায়চারি করছিলেন। মাথা নিচু, দু’হাত পেছনে জড়িয়ে পায়চারি করছিলেন। চোখের নিচে কালি। মাথার চুল অবিন্যস্ত। ফ্রান্সিস সামনে এসে দাঁড়াল। রাজা তুরীনও দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভারী গলায় বললেন, কী ব্যাপার? কারাগারে নিয়ে যাবে?
-না না, সেসব কিছুনা। একটু থেমে বলল, মান্যবর রাজা, আমি বিদেশি ভাইকিং। কখন আসি কখন যাই। আপনাকে একটা বিনীত অনুরোধ।
–হুঁ। রাজা মুখে শব্দ করলেন।
দু’তিন পুরুষ আগে একজন রাজা, আপনাদের পূর্বপুরুষদের একজন, পারিবারিক হীরেমুক্তো সোনার ভাণ্ডার গোপনে রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে আপনার আর রাজা পারকোনের শত্রুতা কমেনি। এই ভাবে দুটো পরিবারের মধ্যে মাঝে মাঝেই লড়াই দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসছে। ঐ গুপ্ত ধনভাণ্ডার কে পাবে? ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি এত কিছু জানলে কী করে? তুরীন বললেন।
—রাজা পারকোনের মন্ত্রীর কাছ থেকে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, এবার আমার অনুরোধ, আপনি আজ রাজা পারকোনের রাজসভায় আসুন। আপনাদের বিবাদ-বিসম্বাদ আমি মিটিয়ে দিতে চাই।
–পারবে? মৃদু হেসে রাজা তুরীন বলেন।
–আপনারা দুজনে আমার প্রস্তাব সম্মত হলেই পারবো। তাহলে সকালের খাওয়া সেরেই আমরা যাবো?
রাজা তুরীন কিছু বললেন না।
ফ্রান্সিস আর মন্ত্রীর চেষ্টায় রাজা তুরীন রাজসভায় এলেন। মন্ত্রী তাকে এক অমাত্যের আসনে বসালেন। এসময় ফ্রান্সিস রাজা পারকোনের কাছে বলল–মাননীয় রাজা, এবার আমি কিছু কথা বলতে চাই।
–বেশ বলো। রাজা পারকোন বললেন। ফ্রান্সিস রাজা তুরীনকে একই কথা বলতে রাজা তুরীন সম্মতি জানান।
ফ্রান্সিস রাজসভায় দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, মান্যবর রাজা, অতীতের ইতিহাঁসআপনারা জানেন। আমি সেসব কথায় যাবোনা। দুই রাজাকেঅনুরোধ করছি আপনারা ধনসম্পদের লোভেদীর্ঘকাল ধরে লড়াই চালিয়ে যাবেন না। আমার বিনীত অনুরোধ আপনারা শত্রুতা ভুলে যান। যে ধনসম্পদ নিয়ে এই লড়াই সেই গুপ্তধন এখনও কেউ উদ্ধার করতে। পারেনি। কিন্তু আমি পারবো।
দুই রাজা ভীষণভাবে চমকে উঠলেন, এই যুবকটি বলে কি!
–কত বছর ধরে খোঁজ চলছে। কেউ পারেনি, তুমি পারবে? তুরীন বললেন।
–আমাকে দিন সাতেক সময় দিন, আমি তার মধ্যেই পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলতে লাগল, আপনারা আর পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবেন না। মাননীয় রাজা পারকোন, রাজা তুরীনকে তার সৈন্যসহ মুক্তি দিন।
–বেশ। পারকোন বললেন।
ফ্রান্সিস বলল, এইবার প্রশ্ন ঐ ধনসম্পত্তি কার? কে পাবে ঐ ধনসম্পদ?
–আমার। রাজা তুরীন বেশ চড়া গলাতেই বললেন।
