–সন্দেহ না মিটলে আপনার কাছেই বারবার আসতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো কী ব্যাপার? মন্ত্রীমশাই জানতে চাইলেন।
–আচ্ছা, এই গৰ্ভগৃহগুলো কি একই সময়ে একইসঙ্গে তৈরি হয়েছিল? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–এটা তো বলা সম্ভব নয়। তবে রাজা পারকোন এবিষয়ে কিছু বলতে পারবেন।
–কোন গর্ভগৃহটা সবচেয়ে পুরোনো? ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।
–সেটাও বলতে পারবো না। মন্ত্রী বললেন।
–রাজা পারকোন? ফ্রান্সিস বলল।
–হয়তো তার কিছু ধারণা আছে।
–আমি রাজার সঙ্গে দেখা করবো। একটু ব্যবস্থা করুন। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। আমি কিছুক্ষণ পরেই রাজসভায় যাচ্ছি। তুমিও চলো।
ফ্রান্সিসরা মন্ত্রীর সঙ্গে যখন রাজসভায় এল তখন বেশ বেলা হয়েছে। মন্ত্রী নিজের আসনের দিকে চলে গেলেন। ফ্রান্সিসরা সভার কাজ দেখতে লাগল। রাজা বিচার করছেন।
একসময় সভা শেষ হলো। প্রতিহারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল লোকজন সামলাতে। রাজা উঠবেন সিংহাসন থেকে। মন্ত্রী এগিয়ে গিয়ে রাজাকে কিছু বললেন। রাজা আবার বসে পড়লেন। একজন প্রতিহারী এসে ফ্রান্সিসদের ডেকে নিয়ে গেল। ফ্রান্সিসরা একটু মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়াল। রাজা বললেন, কোনো বিষয়ে কিছু জানতে চাও?
–আমরা একটা সমস্যায় পড়েছি।
-কী সমস্যা।
–আপনার পিতামহের নির্দেশে কবেকটা গর্ভগৃহ তৈরি হয়েছিল?
রাজা একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, যে গর্ভগৃহে আমি রবিবার যাই সেই গর্ভগৃহটি আমার প্রপিতামহের আমলে নির্মিত।
অন্য গর্ভগৃহগুলো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
পরে আমার পিতামহঅন্য গর্ভগৃহগুলো তৈরি করেছিলেন।
তবে মান্যবর রাজা, বোঝা যাচ্ছে যে ঐ গর্ভগৃহটাই প্রথম তৈরি হয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
আমরাও তাই মনে হয়। রাজা বললেন।
মান্যবর রাজা, এই থেকে একটা কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আপনার প্রপিতামহই সব ধনসম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর থেকে আপনার পিতামহ, আপনার পিতা সকলেই ঐ গুপ্তধন খুঁজেছেন কিন্তু কেউ সন্ধান পাননি।
রাজা একটু থেমে বললেন, তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করি। তোমার অনুমান মনে হয় ঠিক।
এবার আমাদের কাজটা অনেক সহজ হলো। ফ্রান্সিস বলল।
কী করে? রাজা জানতে চাইলেন।
এবার শুধু আপনার প্রপিতামহের তৈরি গর্ভগৃহটাই ভালো করে দেখতে হবে। অন্য গর্ভগৃহগুলো পরবর্তীকালের।
–কথাটা ঠিক বলেছো। এই সম্ভাবনার কথা মনে রেখেই তুমি এগিয়ে চল।
রাজা কাঠের সিংহাসন ছেড়ে উঠলেন। ফ্রান্সিসরাও সম্মান দেখিয়ে উঠে দাঁড়াল।
প্রায় মাসখানেক সময় ধরে শোনা যাচ্ছিল যে যে কোনোদিন রাজা তুরীন রাজা পারকোনের রাজ্য আক্রমণ করতে পারেন। সবশেষে সেটাই ঘটল।
সেদিন বিকেল থেকেই আকাশ প্রায় অন্ধকার মেঘে ঢাকা। সন্ধ্যের মুখে জোর হাওয়া ছুটল। ফ্রান্সিসরা প্রথম তৈরি গর্ভগৃহে ছিল। বাইরের প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞ্ঝার আভাসও ওরা পায়নি।
হঠাৎ ফ্রান্সিসরা দেখল সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পায়ে চার-পাঁচজন সৈন্য নেমে এল। চিৎকার করে বলল, সবাই তৈরিহও। রাজাতুরীন আমাদের দেশ আক্রমণ করেছে। চলে এসো সব।
সৈন্যদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। ওরা দ্রুতপায়ে ছুটল অস্ত্রাগারের দিকে। পোশাকের দিকে তাকাবার সময় নেই। তরোয়াল হাতে ওরা দলে দলে বেরিয়ে এল। ওরা সবাই উঠে গেলে প্রৌঢ় মন্ত্রী সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। ফ্রান্সিসরা ছুটে তার কাছে গেল। মন্ত্রী বললেন, সবাই যাও। প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়েছে।
ফ্রান্সিসরা বুঝে উঠতে পারল না কী করবে? দুজনে মন্ত্রীমশাইয়ের বিছানার কাছে এল। মন্ত্রী তখনও অল্প অল্প হাঁপাচ্ছেন। তিনি আধশোয়া হয়ে আছেন। ফ্রান্সিস বলল, রাজা তুরীন কি বেশি সংখ্যায় সৈন্য এনেছেন?
–ঠিক বুঝতে পারলাম না। ঐ অন্ধকারের মধ্যে কিছুই ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। বিদ্যুৎ চমকাতে যা দেখেছি। কিন্তু তোমরা লড়াইতে নামলে না কেন?
মন্ত্রীমশাই, কিছু মনে করবেন না। আপনাদের দুই দেশই আমাদের কাছে বিদেশ। আপনাদের লড়াই আপনাদের। সমস্যার সমাধান আপনারাই করবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–কথাটা ঠিক। কিন্তু বিপদের দিনে রাজা পারকোনের হয়ে লড়াইতে নামলে রাজা খুশি হতেন।
ওপরে যাচ্ছি। অবস্থা দেখে সব বুঝে নিই। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস সিঁড়ির দিকে চলল। সিঁড়ির মুখের কাছে দুজন সৈন্য তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে। আছে। ওরা বলে উঠল, উঠবেন না, উঠবেন না, জোর লড়াই চলছে।
–আমরা লড়াই দেখবো। শাঙ্কো বলল।
–খালি হাতে থাকবেন না। তরোয়াল আনুন। সৈন্যরা বলল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে দুটো তরোয়াল নিয়ে এলো। এবার দুজনে ওপরে উঠে এল। তেমন বৃষ্টি আর নেই। তবে মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
বিদ্যুতের সেই হঠাৎ আলোতেই দেখা যাচ্ছে দু’দল সৈন্যের মধ্যে প্রবল লড়াই চলছে। ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো, রাজা পারকোন আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন। গুপ্তধন উদ্ধারের কাজে যাতে আমাদের কোনো অসুবিধে না হয় তা দেখার জন্য মন্ত্রীকে আদেশ দিয়েছেন। মন্ত্রী বললেন, এমন সৎ ও ঈশ্বরভক্ত রাজা দেখা যায় না।
–হ্যাঁ, তাঁকে আমাদের সাহায্য করা খুবই প্রয়োজন। শাঙ্কো উত্তর দিল।
–তাহলে চলো রাজা তুরীনকে বন্দী করি।
–চলো।
ফ্রান্সিসরা রাজা তুরীনকে খুঁজতে লাগল। দু’পক্ষের সৈন্যরা গোবরভেজা। ফ্রান্সিস রাজা তুরীনের একজন সৈন্যকে পেল। সে তাকে বলল, রাজা তুরীন কোথায় আছেন? সৈন্যটি রেগে গেল। বলল, তুমি বিদেশি, তুমি কেন আমাদের রাজাকে খুঁজছো?
