সবাই একসঙ্গে চীৎকার করে উঠল ও—হো—হো–ও।
লা ব্রুশ আর কোন কথা না বলে কাঠের পা ঠক্ঠক্ করতে করতে চলে গেল। তারপর বেঞ্জামিন দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস আস্তে-আস্তে বসে পড়ল। তখন ও রাগে ফুঁসছে। রক্তাক্ত কব্জির দিকে তাকিয়ে ও চুপ করে বসে রইল। ওর পাশে হ্যারিও চুপ করে বসে রইল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হ্যারি ডাকল—ফ্রান্সিস–
–বলো।
–লা ব্রুশের কথা থেকে কিছুই বোঝা গেল না। দু’জনকে পাহারায় রেখে এসেছে মানেটা কি? পালালোই বা কে?
–কিছুই বুঝতে পারছি না।
ফ্রেদারিকো আস্তে-আস্তে এগিয়ে আসছে। দু’জনে ওর দিকে তাকাল। ফ্রেদারিকোর ফ্যাসফেসে গলায় বলল–ফ্রান্সিস, বুঝলে কিছু।
ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। ফ্রেদারিকো মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–বোধহয় ওদের চারজনের কেউ বেঁচে নেই।
–বলো কি?
–জলদস্যুদের রীতিনীতি আমি ভালো করেই জানি। ওরা ওদের গুপ্তধন ভান্ডারের মধ্যে লুটের মাল রাখতে যাদের নিয়ে যায়, তাদেরই হত্যা করে রেখে আসে। এতে কারো পক্ষেগুপ্তধনভান্ডারের খোঁজ পাওয়ার উপায় থাকেনা। তারউপরওদের একটা কুসংস্কারও আছে। যাকে বা যাদের মেরে রাখা হয়, তারা নাকি জিন হয়ে সেই গুপ্তধন পাহারা দেয়।
ফ্রান্সিস অস্পষ্টস্বরে বলল–তাহলে ওরা কেউ বেঁচে নেই।
–একজন পালিয়েছে বলল–হয়তো সেই বেঁচে আছে।
ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল! কিন্তু কদিন বাঁচবে। ডাইনীর দ্বীপ নাম। বুঝতেই তো পারছো কী ভয়াবহ জায়গা। তারপর বললো–আচ্ছা ফ্রেদারিকো, তুমি কখনো ডাইনীর দ্বীপে গেছো?
–একবার-তাও দিনে বেলা। ইয়া বড়-বড় কত যে জোঁক ঐ দ্বীপে। আধ-ঘন্টার মধ্যে আমরা পালিয়ে এসেছিলাম। তোমাদের যে বন্ধু পালিয়েছে, সে যদি জোঁকের হাত থেকে বাঁচবার উপায় বার করতে পারে, তাহলে হয়তো বেঁচে যেতে পারে। কারণ
এখানে প্রচুর পাখী আছে আর মিঠে জলের ঝরনা আর হ্রদ আছে।
–তুমি তাহলে এইদিকে কয়েকবার এসেছো? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ বেশ কয়েকবার। এরই দক্ষিণে কয়েকশো মাইল দূরে চাঁদের দ্বীপ। ফ্রান্সিস আধশোয়া হয়ে এতক্ষণ হারানো বন্ধুদের কথা, কি উপায়ে এখান থেকে পালানো যায়, এসব নানা কথা ভাবছিল। হঠাৎ চাঁদের দ্বীপ কথাটা কানে যেতে ও সজাগ হয়ে উঠে বসে বলল–ফ্রেদারিকো তুমি কিন্তু চাঁদের দ্বীপ মুক্তোর সমুদ্র এসবের কথা আর কিছুই বললে না।
ফ্রেদারিকো কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ফ্রান্সিস, তোমাকে আমি বেশ কয়েকদিন লক্ষ্য করলাম। একটু চুপ করে থেকে বলল–দেখলাম, তুমিই উপযুক্ত। তোমাকেই সব বলছি। কিন্তু যদি মুক্তোর সমুদ্রে গিয়ে প্রাণহানি হয়, তখন কিন্তু আমায় দোষ দিতে পারবে না।
–সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকো। সমস্ত ঘটনাটা আমাকে বলো। তারপর আমি ভেবে দেখবো, আমরা যাবে কি যাবো না।
–শোন তাহলে। ফ্রেদারিকো কোমর থেকে তামাকপাতা বের করে মুখে ফেলে চিবুতে চিবুতে বলতে লাগল–তোমাকে আগে কিছু ঘটনা বলেছি। আবার বলি শোন। একটা মালবাহী জাহাজে কাজ করতাম তখন। জাহাজটা ফিরছিল আফ্রিকার এক বন্দর থেকে। প্রচন্ড ঝড়ের পাল্লায় পড়ে জাহাজটা অনেক দক্ষিণদিকে চলে গিয়েছিল। ফিরে আসছি, তখনই, আমাদের ফেরার পথে পড়ল চাঁদের দ্বীপ। আমার জাহাজ জীবনে অনেকের মুখেই চাঁদের দ্বীপের কথা শুনেছি। এবার চোখে দেখলাম। দূর থেকে দেখা গেল কাঁচের পাহাড়।
–কাঁচের পাহাড় মানে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–দ্বীপের উত্তরদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে এই কাঁচের পাহাড়। যেন কাদায় তাল শুকিয়ে নিরেট পাথর হয়ে গেছে! এমন এবড়ো-খেবড়ো মাটি-পাহাড় গড়া প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল। এই সেই এবড়ো-খেবড়ো পাথরগুলো এমন ছুঁচালো আর ধারালো যেন ভাঙা কাঁচের মত। সেখানে পা রাখার উপায় নেই। পা ফালাফালা হয়ে যাবে। পা পিছলে পড়লে তো সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো হয়ে কেটে যাবে। কথাটা শুনে বিশ্বাস হয় নি। কিন্তু জাহাজটা যখন কাঁচ পাহাড়ের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখলাম সত্যিই তাই। এবড়ো খেবড়ো উঁচু উঁচু পাথরের ছুঁচালো ডগা। সেই পাহাড়ে ওঠা তো দূরের কথা, পা রাখার কি উপায় নেই। একটু থেমে তামাকপাতা চিবোতে চিবোতে ফ্রেদারিকো আবার বলতে লাগল । –ঐ পাহাড়ের পাশ দিয়ে দিয়ে আমরা সোফালা বন্দরে এলাম। চাঁদের দ্বীপের ওটাই, একমাত্র বন্দর, ঐ যে কাঁচপাহাড় বললাম, তার ওপাশেই মুক্তোর সমুদ্র।
–ও পাশেই? ফ্রান্সিস আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ, কিন্তু কাঁচের পাহাড় পেরিয়ে যাওয়া শুধু অসম্ভব নয়, অকল্পনীয়।
–তারপর?
–জাহাজটা সোফালা বন্দরে নোঙর করে রইল। আমরা দ্বীপটা ঘুরে-ঘুরে দেখলাম। কিন্তু সব জায়গায় আমাদের যাওয়ার কম ছিল না। লম্বা লম্বা বর্শা হাতে সব পাহারাদাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বমুখো যেদিকে মুক্তোর সমুদ্র, সেদিকে যাওয়ার উপায় ছিল না।
ফ্রেদারিকো একটু থামল। তারপর গলায় ঝুলানো ভাঙা আয়নার অংশটা গলা থেকে খুলল। আয়নাটা উল্টেপিটে যেখানে পারা লাগানো থাকে, সেইদিকে কি যেন খুঁটতে লাগলো, কালচে চামড়ার মত কি যেন একটা খুঁটে-খুঁটে তুলছে। যখন খুঁটতে-খুঁটতে সবটা তুলে ফেলল, তখন দেখা গেল এক টুকরো সাদাটে চামড়া। ওটা ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে ফ্রেদারিকো বলল–এই দেখ চাঁদের দ্বীপের আর মুক্তোর সমুদ্রের নক্সা।
