দুদিন আগে এক রাতে প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে পড়েছিল ওরা। বহু কষ্টে স্রেফ মনের জোরে জাহাজডুবিরহাত থেকে বেঁচেছে। ফ্রান্সিসের শরীর এখনও দুর্বল।
বন শেষ। বেরিয়ে এল ওরা। দুটো বাড়ি দেখল। সেই পাথর, কাঠ, ঘাস দিয়ে তৈরি। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তবে চারদিক মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।
–ফ্রান্সিস, এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।
–বাড়ি চাই, খাদ্য চাই, পানীয় জল চাই, ফ্রান্সিস উত্তর দিল।
বাব্বাঃ, এত সব তোমাকে কে দেবে?
–দেয় দেয়, তেমন পবিত্র মানুষ পেলে তার কাছ থেকে সব পাওয়া যায়।
–দেখো, কপালে মেলে কিনা। শাঙ্কো হেসে বলল।
বনের কাছেই ওরা পেল দুটো তক্তা। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় দেকা গেল তক্তা দুটো দিয়ে নিচের বড় গর্তা ঢাকা দেওয়া হয়েছে। দুজনে তক্তা দুটোর কাছে এল। শক্ত করে চেপে ধরে একটা তক্তা সরাল। অস্পষ্ট হলেও চাঁদের আলোয় এবার সিঁড়ি দেখা গেল। পাথরের সিঁড়ি।
ফাঁকের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো নামতে শুরু করল। নামতে নামতে মানুষের কথাবার্তা শুনতে পেল ওরা। এটা তাহলে মানুষের বসবাসের জন্যেই তৈরি হয়েছে। নামতে নামতে ওরা দেখল–বেশ বড় ঘর। পাথর কেটে ঘরটা তৈরি। ঘরের দু’পাশে দেয়ালের খাঁজে মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় সবকিছু মোেটামুটি দেখা যাচ্ছে।
ওরা দেখল এক প্রৌঢ় একটা পাথরের ছোট চাইয়ের ওপর বসে আছেন। এতক্ষণ বিড় বিড় করে কথা বলছিলেন। এবার কয়েকজন সৈন্য ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোকে ধরে প্রৌঢ়ের কাছে নিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা বাধা দেবার চেষ্টাও করেনি।
প্রৌঢ় ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, রাজা তুরীনের সৈন্য তোমরা। কিন্তু আমাদের রাজা পারকোনের সঙ্গে পারবে না। পারকোনকে তার প্রজারা দেবতার মতো শ্রদ্ধা করে। বন্ধুর মতো ভালোবাসে। অ্যাইঅ্যাই-অ্যাই–বলতে বলতে প্রৌঢ় হঠাৎ সটান দাঁড়িয়ে উঠে দাঁড়ে বসে থাকা বাজপাখিটার মাথায় আঙুল চালিয়ে দিলেন। বাজপাখিটা পড়ে যেতে যেতে উঠে বসল। ফ্রান্সিস বাজপাখিটিকে বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখল। পাখনাররংখয়েরিসাদামিশেল। চোখ দুটো গোল গোল, কালো। যে জন্যে বাজপাখিটার কদর সেটা হচ্ছে ওর ঠোঁট। বঁড়শির মতো বাঁকানো। প্রৌঢ় বাজটাকে আদর করে ছেড়ে দিলেন। বাজপাখিটা আবার দাঁড়ে গিয়ে বসল। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে চেয়ে বললেন, আমাদের রাজা পারকোনের সঙ্গে রাজা তুরীনের লড়াই হবে। কবে হবে সেটা কারো জানা নেই। সেই লড়াই কালও হতে পারেবার একশো দিন পরেও হতে পারে।
ফ্রান্সিস একটু জোর দিয়ে বলল, আপনি আমাদের মিধ্যে সন্দেহ করছেন। আপনাদের এই ঘরে সৈন্যরা থাকে জানলে আসতাম না। তবে একটা কথা স্পষ্ট বলছি, আপনাদের এই কাটাকাটি-মারামারির মধ্যে আমরা নেই। তবে কেন আমাদের বন্দী করে রাখবেন।
–তাহলে তোমরা এখানে এসেছো কেন? প্রৌঢ় বললেন।
–এইকথা জানতে যে এই জায়গার নাম কী? য়ুরোপ থেকে কতদূর এই দেশ, শাঙ্কো বলল।
সেটা জেনে কী হবে? প্রৌঢ় বললেন।
তাহলে বুঝতে পারবো য়ুরোপ থেকে কত দূরে আমরা আছি। বুঝতে পারবো কবে নাগাদ দেশে পৌঁছোত পারবো।
–সে সব জেনে আর কী হবে? তোমরা তো এখান থেকে যেতে পারবে না। প্রৌঢ় বললেন।
–কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–কারণ মাটির নিচে এই ঘর-টরের কথা তোমরা জেনে ফেলেছে। এটা একটা দুর্গের মতো। এই দুর্গের কথা তোমরা জেনে ফেলেছ। তোমাদের আর বাইরে যেতে দেওয়া হবেনা।
–অর্থাৎ আমাদের এখানে বন্দী হয়ে থাকতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ, তোমাদের এখন এখানেই বন্দী হয়ে থাকতে হবে। লড়াই শুরু হোক তখন তোমাদের কথা ভাবা যাবে, প্রৌঢ় বললেন।
শাঙ্কো চাপাস্বরে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল, ফ্রান্সিস, আমরা বিপদে পড়লাম।
হু। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল, দেখুন, আমরা ভুল করে এখানে চলে এসেছি। আপনাদের রাজাটাজার কথা আমরা জানি না। ওসব জেনে কী হবে? ভুল করে এসে পড়েছি সেটা বুঝে আমাদের মুক্তি দিন।
না। তোমাদের যুদ্ধে জেতে হবে আমাদের হয়ে, মানে রাজা পারকোনের হয়ে লড়াই করতে হবে। তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবেনা।
–রাজা তুরীন আর রাজা পারকোন কবেযুদ্ধ শুরু করবেন, সেটা কে বলতে পারবে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
-কেউ বলতে পারবে না, প্রৌঢ় উত্তর দিলেন।
–তাহলে আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় কেন বাধা দিচ্ছেন?।
কারণ আছে। তাহলে তোমাদের একটু ইতিহাস বলতে হয়। এই অঞ্চলে আমার বাবা-ঠাকুর্দা মন্ত্রী হয়ে রাজাকে রাজ্যশাসনে সাহায্য করে গেছেন। উত্তরাংশে বর্তমান রাজা তুরীনও তাদের পূর্বপুরুষরা রাজত্ব করে গেছেন। উত্তরাংশের সঙ্গে আমাদের দক্ষিণাংশের লড়াই প্রায়ই লেগে থাকে। আমার পিতা নির্বিবাদে থাকার জন্যে পাথর কেটে এই ঘর তৈরি করিয়েছিলেন। এখানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আমিও বাস করতে লাগলাম। এই পাহাড়ের ওপাশে একটা বড় লম্বাটে ঘর বানালাম–পাথরের। ওখানে সৈন্যাবাস তৈরি করলাম। সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগলাম। আমরা ধীরে ধীরে রাজা তুরীনের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। তাই আমরা সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। তোমাদের মতো অভিজ্ঞ যুবকদের আমাদের সৈন্যদলে রাখতেই হবে। লড়াই শুরু হলে তোমরা আমাদের রাজা। পারকোনের হয়ে লড়াই করবে–এই জন্যেই তোমাদের চাই। কী রাজী? প্রৌঢ় বললেন।
