আরো কিছুক্ষণ পরে সেনাপতি এল। বিস্কোরা উঠে দাঁড়াল। সেনাপতিমশাই বসতে ইঙ্গিত করল। বিস্কোরা বসল। পিরেল্লোর দিকে তাকিয়ে বলল কী ব্যাপার বলুন তো? এত সকালে এসেছেন।
পিরেল্লো বিস্কোকে কিছু বলার জন্যে ইঙ্গিত করলেন। বিস্কো বলতে লাগল আমরা জাতিতে ভাইকিং। দেশে দেশে আমাদের জাহাজটায় চড়ে ঘুরে বেড়াই। কোথাও কোনো গুপ্তধনের কথা জানলে আমরা বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্ধার করি।
তারপর উদ্ধারকরা গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যান। সেনাপতি গোঁফেরাকে হাসলেন।
–অনেক জায়গাতেই এই ধরনের কথা আমরা শুনেছি। কথাটা আমাদের কাছে নতুন নয়। আর একথাটা যে সত্যি নয় সেটার প্রমাণ আপনাকে দিয়ে যাবো। বিস্কো বলল।
–ঠিক আছে। এখন রাজপুরোহিত বলুন আমার কাছে এসেছেন কেন?
এই ভাইকিংরা রাজা হানমের গুপ্তধন উদ্ধার করেছে বলে দাবি করছে। তাই একবার সব বুঝেশুনে নিতে আপনাকে যেতে অনুরোধ করেছে। পিরেল্লো বললেন।
-সত্যিই কি পেরেছে গুপ্তধন উদ্ধার করতে? সেনাপতি বললেন।
মন্দিরে গেলেই সব জানতে পারবেন। বিস্কো বলল।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সেনাপতিবলল–ঠিকআছে। আপনারা যান–আমি আসছি।
বিস্কোরা ফিরে এল। ফ্রান্সিসকে বলল–সব বলা হয়নি। তবে সেনাপতি বললো যে সে আসবে।
–ফ্রান্সিস–বিস্কো ডাকল।
–হুঁ। বলো। ফ্রান্সিস বিস্কোর দিকে তাকাল।
-সত্যিই কি তুমি রাজা হানমের গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছো? বিস্কো বলল। ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টিতে রাখা একটা লম্ফ চাবি বেরকরল। বিস্কোকে চাবিটা দেখিয়ে বলল সমাধান। সেনাপতি মশাইকে আসতে দাও।
কিছুপরে সেনাপতি ঘোড়ায় চড়ে এল। সঙ্গে চারজন প্রহরী।
ঘোড়া থেকে নেমে সেনাপতি বলল–রাজপুরোহিত কী উদ্ধার করেছেন দেখান। পিরেল্লো ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে মাথা একটু নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–আমার সঙ্গে আসুন।
সবাই সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল আহত প্রহরীরা এখান থেকে চলে গেছে। ফ্রান্সিস ভাবল যাক বাঁচা গেল। কিছুক্ষণের লড়াইয়ের খবরটা সেনাপতি পায় নি।
মশালের আলোয় মন্দিরের গর্ভকক্ষে এল সবাই। ফ্রান্সিস পেছনের সাজঘর দেখিয়ে বলল–মাননীয়, গুপ্তধন রয়েছে ঐ সাজঘরে।
-তাই নাকি! সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল।
সেনাপতিকে নিয়ে ফ্রান্সিস আর পিরেল্লো সাজঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস কাঠের বেদীর কাছে এল। ফেটি থেকে চাবিটা বের করল। বেদীটার ওপর জড়ো করা পোশাক সরিয়ে দিল। বেদীর গায়ে চাবির ফুটো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ওর চাবিটা ঢোকাতে লাগল। চাবিটা শেষ পর্যন্ত ঢুকিয়ে আসতে ডানদিকে মোচড় দিল। ডালা খুলল না।
বিস্কো দ্রুত ফ্রান্সিসের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। যদি গুপ্তধন দেখাতে না পারে তবে ফ্রান্সিস বিপদে পড়তে পারে। তখন সাহায্য চাই।
ফ্রান্সিসের মুখ তখন ঘেমে উঠেছে। শুধু হাতে মুখ কপাল মুছে নিয়ে ফ্রান্সিস আবার চাবিটা ঢোকাল। দুএকবার এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে জোরে ডানদিকে মোচড় দিল। কট। একটা মৃদুশব্দ হল। পাটাতন খুলে গেল। ফ্রান্সিস পাটাতনের ঢাকনাটা এবার খুলে ফেলল। একটা কালো চামড়ার ব্যাগমত দেখা গেল। ফ্রান্সিস ব্যাগটা তুলে বেদীর ওপর রাখল। তারপর মুখ বাঁধা সোনালি মোটা সুতোয় বাঁধা দড়িটা খুলে ফেলল। মুখটা খুলে একমুঠো সোনার চাকতি তুলে এনে বেদীতে রাখল। তারপরে বের করল একটা চারপাশে হীরে বসানো আয়না। সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস একটা মুক্তোর মালা তুলে দেখিয়ে সব কালো চামড়ার ব্যাগটায় ভরে রাখল। দড়ি বন্ধ করে ব্যাগটা সেনাপতিকে। দিয়ে বলল–মাননীয় সেনাপতি এটাই রাজা হানমের গুপ্ত ধনভাণ্ডার। আমাদের কাজ শেষ। এবার আমরা জাহাজে ফিরে যাবো।
-সে কি। সেনাপতি বলল–ধনভাণ্ডারের কিছু অংশ তো আপনাদের প্রাপ্য।
–না। আমরা কিছু নেব না। তবে একটা অনুরোধ করছি। মাননীয় রাজাকে বলবেন এই গুপ্ত ধনভাণ্ডারের কিছু অংশ যেন রাজপুরোহিত পিরেল্লোকে দেওয়া হয়। উনিঃ গুপ্তধনের জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিলেন। এবার ফ্রান্সিস পিরেল্লোকে বলল–এবার দেখলেন তো গুপ্তধনের প্রতি আমাদের কোন লোভ নেই।
বিস্কো ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো।
ভাইকিং বন্ধুরাও গলা মেলালোও-হো-হো।
ফ্রান্সিসরা সদর রাস্তায় এল। চলল বন্দরের দিকে। গরম হাওয়া ছুটেছে। তার মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল। বিস্কো বলল–ফ্রান্সিস।
–হ্যাঁ বলো।
বলছিলাম বেশ বেলা হয়েছে। জাহাজে ফিরে আর আমাদের জন্যে রান্না করতে হবেনা।
–ঠিক আছে। একটা সরাইখানা দেখ। ফ্রান্সিস বলল।
পাওয়া গেল একটা বেশ বড়সরাইখানা। ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ঢুকল। সবারবসার জায়গা হল না। ফ্রান্সিস সরাইওয়ালাকে গিয়ে বলল-যত তাড়াতাড়ি পারো খেতে দাও। আমরা খুব ক্ষুধার্ত নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। সরাইওয়ালা পাকা দাড়ি নেড়ে বলল। ছুটল রান্নাঘরের দিকে।
ফ্রান্সিসরা খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
গর্ভগৃহে ধনভাণ্ডার
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো এক বনের মধ্যে দিয়ে চলেছে। সমুদ্রের ধারে ওদের জাহাজ নোঙর করে আছে। ফ্রান্সিসআরশাঙ্কো এসেছে যদি কারো সঙ্গে দেখা হয় তাহলে জেনে নেবে কোথায় এসেছে ওরা। কিন্তু প্রথমেই সব কথা জিজ্ঞেস করতে ভরসা পাচ্ছে না। কোনো কিছু না শুনেই যদি ওদের আক্রমণ করে তাহলে তো লড়াই অনিবার্য। নিজেরা তরোয়াল আনেনি। ফ্রান্সিস এসব ক্ষেত্রে লড়াইয়ের পক্ষপাতী নয়। সে ভাবছে আমাদের শুধু জানতে আসা আমরা কোথায় এলাম। লড়াই-টড়াইয়ের কোনো প্রশ্নই নেই।
