-বেশ। চলুন। পিরেল্লো অগত্যা রাজী হলেন।
পিরেল্লো বোঁচকাটা মাথায় তুলে নিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা দরজা বন্ধ করে বাইরে এলো। তিনজন চলল।
মন্দিরটা রাজবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই। মন্দিরে ঢুকতেই চারজন প্রহরী ফ্রান্সিসদের আক্রমণ করল।
অন্য প্রহরীটি ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বর্শা তুলতে গেল কিন্তু ফ্রান্সিস ওকে হাত তুলতেই দিল না। এক লাফে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরীটি কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রহরীর বর্শাটা ধরে ফেলল। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে বর্শাটা প্রহরীর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। বিস্কো তখন অন্য প্রহরীর হাত থেকে ছোরাটা বের করে নিয়ে তার পিঠে বসিয়ে দিল। প্রহরীটি মুখে শব্দ তুলল–অ্যাঁ। তারপর পাথরের সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়ল।
হাতে ধরা বর্শাটা ফ্রান্সিস পিরেল্লোর বুকে তাক করল। চাপা স্বরে বলল, এখন আপনি আমার নিশানার সামনে। শুধু বর্শাটা ছোঁড়ার অপেক্ষা।
পিরেল্লো কেঁদে ফেললেন। বলে উঠলেন, দোহাই আমায় হত্যা করবেন না।
আপনি আমাদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন। বলুন, তাই কিনা? ফ্রান্সিস গম্ভীর স্বরে জানতে চাইল।
না। হত্যা নয়, আপনাদের আহত করতে চেয়েছিলাম। পিরেল্লো বললেন।
কিন্তু কেন?
সোনার লোভে। আমি বুঝেছিলাম আপনারা রাজা হানমের গুপ্ত ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পারবেন। তখন আহত নিরস্ত্র আপনারা আমাকে বাধা দিতে পারবেন না। দুজন প্রহরী আর আমি মিলে আপনাদের উদ্ধার করা ধনসম্পদ নিয়ে পালিয়ে যেতে পারব।
হু। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল, কাল সকালে আমি রাজসভায় যাবো। রাজা কানবহনাকে সব বলব। উনি আপনাদের যা করবার করবেন।
না না। দোহাই, আপনি রাজাকে কিছু বলবেন না। রাজা আমাদেরফাঁ সিতে লটকাবেন। পিরেগ্লো বললেন।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল। তারপর বলল, আপনারা আমাদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন। আমরা কোনরকমে জীবন রক্ষা করলাম। তার আগে কি একবারও ভেবেছিলেন যে আমরা বিদেশী, নিরস্ত্র, অসহায়!
–আপনাদের হত্যা করতে গিয়েছিলাম এই অপরাধের জন্যে যা শাস্তি দিতে চান দিন। শুধু একটা অনুরোধ, রাজাকে কিছু জানাবেন না।
ফ্রান্সিস, একে ছেড়ে দাও। কী হবে এই ছুঁচোটাকে মেরে? বিস্কো বলল।
আহত প্রহরীরা তখন সিঁড়ির ওপর শুয়ে কাতরাচ্ছে। তাদের পাশ দিয়ে ফ্রান্সিসরা সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাইরে চলে এল। বাইরে তখন সন্ধ্যে। চলল রাজবাড়ির দিকে।
ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল। বিস্কো ফ্রান্সিসের পাশে বসল। বলল, এবার কি করবে?
রাজা হানমের গুপ্তধন আছে ঐ সাজঘরে। ফ্রান্সিস বলল।
ছড়াটায় সাজঘরের উল্লেখ আছে। বিস্কো বলল।
হা। সেইজন্যই সাজঘরটা ভালো করে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি কি নিশ্চিত যে গুপ্তধন সাজঘরেই আছে? বিস্কো বলল।
সম্পূর্ন নিশ্চিত নই। তবে পুজোর ঘরে অথবা সাজঘরে রাজা হানমের গুপ্তধন আছে। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
এখন কি করবে? বিস্কো জানতে চাইল।
কাল সকালে রাজসভায় যাব। রাজা কানবাহনার অনুমতি নেব, তারপর খোঁজাখুঁজি শুরু করবো। রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে ওরা ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। বিস্কো ঘুমিয়ে পড়লেও ফ্রান্সিস এর চোখে কিন্তু ঘুম নেই। রাজা কানবহনার অনুমতি পাওয়া যাবে। কারণ ফ্রান্সিস আগেই বলে দেবে যে গুপ্তধন উদ্ধার করাই তার উদ্দেশ্য। গুপ্তধন থেকে ওরা কিছুই নেবেনা। এটা শুনলে রাজামশাই লাফিয়ে উঠবেন। গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রকারে সাহায্য করবেন। গুপ্তধন পাওয়ার লোভ কেউ দমন করতে পারেনা। রাজাও পারবেন না। মনে হয় অনুমতি সহজেই পাওয়া যাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
পরের দিন সকালের জলখাবার খেয়ে ফ্রান্সিসরা রাজসভার দিকে চলল। রাজসভায় ঢোকার মুখে দেখল রাজপুরোহিত পিরেল্লো ওদের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছেন। কাছাকাছি আসতেই রাজপুরোহিত বলেলন আমি আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছি। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন, গতকালের কথা ভুলে যান। আপনাদের আমরা আহত করতে চেয়েছিলাম তার জন্য মাপ চাইছি।
বেশ আমি এ ব্যাপারে রাজাকে কিছু বলব না। আপনি আমাদের তার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিন।
দেখছি। পিরেল্লো চলে গেলেন। একটু পরে ফ্রান্সিসরা দেখল, মন্ত্রীর সামনে মাথা নীচু করে পিরেল্লোকী বলছেন। মন্ত্রী মাথা ঝাঁকালেন। পিরেল্লো ফ্রান্সিসদের কাছে এলেন। বললেন, কিছু পরে আপনাদের ডাক পড়বে। ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। দুজনে অপেক্ষা করতে লাগল।
সেনাপতি ফ্রান্সিসদের নাম ডাকলেন। ফ্রান্সিস, বিস্কো এগিয়ে এল মাথা ঝুঁকিয়ে রাজাকে সন্মান জানিয়ে বলল, আপনি আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তাতে আমরা খুশি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, এবার কাজের কথা বলি। রাজপুরোহিত পিরেল্লো আমাদের মন্দিরে নিয়ে গেছেন, গর্ভকক্ষে নিয়ে গেছেন। পাশের সাজকক্ষও দেখিয়েছেন। শুধু একবার দেখেছি সেসব। কাজেই মাত্র একবার দেখে কিছু সিদ্ধান্তে আসা যাবে না আমরা আবার ভালোভাবে দেখব। তারপর বলতে পারব–রাজা হানমের ধনসম্পদ কোথায় রাখা হয়েছে।
হুঁ। দেখ চেষ্টা করে। কোনকিছুর প্রয়োজন পড়লে সেনাপতিকে বলবে। সব পাবে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিসরা একটু মাথা ঝুঁকিয়ে চলে এল। পিরেল্লোও ওদের কাছে এলেন। পিরেল্লো নিশ্চিন্তের হাসি হেসে বললেন, আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ রইলাম। আমার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ উঠলে আজ রাতেই আমার জীবন শেষ হয়ে যেত। এই রাজা কি খুব বদরাগী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
