একবার লা ব্রুশ কাঠের পায়ে ঠক্ঠক্ শব্দ তুলে আসতে লাগল। ঝোঁপ-জঙ্গল ঠেলে আসতে লাগল। গাছের পাতা থেকে বেশ কয়েকটা জোঁক পড়ল। গায়ে-পায়ে লেগেও রইল কয়েকটা। সমুদ্রের তীরে এসেনুন ছিটিয়ে জোঁকগুলো ফেলে দিল। তারপর কাঠের পায়ে ভর দিয়ে নৌকোয় উঠে বসল। নৌকা ছেড়ে দিয়ে দাঁড় বাইতে লাগল।
***
এদিকে ফ্রান্সিসরা প্রথম দুটো গুলির শব্দ অস্পষ্ট শুনেছিল। কিন্তু পরের গুলির শব্দগুলো স্পষ্টই শুনলো। ওদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। দু’একজন ফ্রান্সিসকে ডেকে বলল,
ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই বিস্কোরা কোন বিপদে পড়েছে। তুমি কিছু একটা করো।
ফ্রান্সিস মুখ নীচু করে গভীর বিষাদে মাথা নাড়ল–কিছুই করার নেই। এই অন্ধকূপ থেকে বেরোতে না পালে আমরা অসহায়। এখন সবরকম অন্যায়-অবিচার মুখ বুজে সহ্য করে যেতে হবে। কোন উপায় নেই।
কথা বলতে-বলতে ফ্রান্সিসের মুখ ক্রোধে আরক্ত হয়ে উঠল। দুচোখ জ্বালা করে জলে ভরে উঠল। ভাইকিং বন্ধুরা কিন্তু অধৈর্য হয়ে উঠল। পরস্পর এই নিয়ে বলতে বলতে সবাই উঠে দাঁড়াতেই হাতের কড়ায় শেকলে শব্দ উঠল। ওরা একসঙ্গে প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে উঠল–হো–হো–ও–ও।
বেঞ্জামিন ছুটে এসে দরজার গরাদের ওপাশে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে দু-একজন চীৎকার করে বলল–আমাদের বন্ধুরা কোথায়?
–আমি কিছু জানি না। বেঞ্জামিন নির্বিকার মনে জবাব দিল।
–তুমি ওদের নিয়ে গেলে কেন? একজন জিজ্ঞেস করল।
–ক্যাপ্টেনের হুকুমে।
–ক্যাপ্টেন ওদের কোথায় নিয়ে গেছে?
–বলা বারণ। বেনজামিনের মুখ পাথরের মত শক্ত-ভাবলেশহীন।
–তোকে খুন করবো–একজন চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সকলে চিৎকার করে উঠল হো-ও-ও। সবাই শেকল ধরে টানতে লাগল। কিন্তু অত্যন্ত শক্ত ভাবে কাঠের কাঠামোতে গাঁথা শেকলের ঝন্ঝন্ শব্দই শুধু হলো। ঐ শেকল ভেঁড়া অসম্ভব। ওরা আবার একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল–হো-ও-ও ঠিক তখনই ঐ গন্ডগোলের মধ্যে ফ্রান্সিস অস্পস্ট ঠক্ ঠক্ শব্দ শুনল। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। কড়ায় বাধা দুহাত তুলে বলল–ভাইসব–শান্ত হও, খুব সম্ভব লা ব্রুশ আসছে।
একটু পরেই পাহারাদার দু’জন সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়াল। বেঞ্জামিন এগিয়ে এসে দরজা খুলতে লাগল। দরজা খোলা হল। লা ব্রুশ ঠক্ঠক্ শব্দ তুলে এগিয়ে এসে ভাইকিংদের জটলার দিকে তাকিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল–এত চেঁচামেচি কিসের?
ফ্রান্সিস এতক্ষণ মাথা নীচু করে চুপচাপ বসেছিল। এইবার উঠে দাঁড়াল। তখন গোলমাল থেমে গেল। ফ্রান্সিস বলল–আমাদের বন্ধুরা কোথায়?
লা ব্রুশ ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে খুব সহজ ভঙ্গীতে বলল–জন আমার গুপ্ত ভান্ডারে পাহারা দিচ্ছে। একজন পালাতে গিয়ে মারা গেছে।
–অতগুলো গুলীর শব্দ পেলাম কেন?
লা ব্রুশের ক্রুদ্ধ চোখ-মুখ নরম হয়ে এল। খুকখুক করে হেসে উঠল। বলল–ও এই ব্যাপার? আরো দুটো তোতা পাখি মেরেছি–রাত্তিরে রোস্ট খাবো। তোফা মাংস।
–আপনার গুপ্তভান্ডার কোথায়?
–বলবো না–লা ব্রুশ ক্রুদ্ধভঙ্গীতে চীৎকার করে উঠল।
–আমাকে বলতেই হবে। ফ্রান্সিস দাঁত চাপাস্বরে বলে উঠল–বলতে হবে আপনাকে ওদের দুজনকে কোথায় রেখে এসেছেন?
একটু থেমে লা ব্রুশ বলল–ডাইনির দ্বীপে যাও, খুঁজে বের কর গে।
–আপনার গুপ্ত ভান্ডারের ওপর আমাদের বিন্দুমাত্র লোভ নেই, কিন্তু ঐ দু’জনকে এক্ষুনি ফিরিয়ে আনতে হবে–ফ্রান্সিস বলল।
ক্রুদ্ধস্বরে লা ব্রুশ বলে উঠল–অনেক সহ্য করেছি, আর একটা কথা বলবে তো– বলে লা ব্রুশ কোমরের বেল্টে গোঁজা পিস্তলটা বার করে ফ্রান্সিসের বুকের দিকে নিশানা করে স্থির দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস তিক্ত হাসি হাসল। বলল, লা ব্রুশ তুমি একটা জঘন্য নরঘাতক খুনে। কিন্তু তোমার কুবুদ্ধি কিছু কম না। তুমি কিছুতেই এখন আমাদের মারবে না। বাঁচিয়ে রাখবে। য়ুরোপের ক্রীতদাসের বাজারে আমাদের জন্যে ভালো দাম পাবে এই আশায়। লা ব্রুশ এক মুহূর্ত কি ভাবল। পিস্তলটা কোমরে গুঁজে রাখতে রাখতে সহজভঙ্গীতে বলল–নাম কি তোমার?
–ফ্রান্সিস আমার নাম–একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল লা ব্রুশ–সোনার ঘন্টার গল্প শুনেছো?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ–ওটা একটা ছেলে ভুলানো আজগুবি গপপো।
–না ওটা গল্প নয়। সেই সোনার ঘন্টা এখন আমাদের দেশে।
–বলো কি। লা ব্রুশ বেশ অবাক হয়ে বলল।
–হ্যাঁ। বহু দুঃখকষ্ট স্বীকার করে আমি আর আমার বীর বন্ধুরা সেই সোনার ঘন্টা পর এনেছি। অতবড় হীরে এনেছি, যার জন্যেও কম কষ্ট করিনি। ফ্রান্সিস একটু থেমে বলল, তাই বলছিলাম গুলির ভয় দেখিও না–ফ্রান্সিস মৃত্যুকে ভয় পায় না। কিন্তু এই বলে রাখছি যদি আমাদের বন্ধুদের কাউকে তুমি হত্যা করে থাকো তো তোমার মুক্তি নেই, আমি প্রতিশোধ নেবই।
লা ব্রুশ খুকখুক করে হেসে উঠে বলল হাতে হাতকড়া, তাও শেকলে বাধা। প্রতিশোধের কথা ভাবতে-ভাবতেই জীবন শেষ হয়ে যাবে।
–বেশ থাক না আমার জীবন। আমার বীর বন্ধুরা রয়েছে, তারা প্রতিশোধ নেবে–আমার ভাই রয়েছে, সে তোমাকে খুঁজে বের করে প্রতিশোধ নেবে। আমরা ভাইকিং।
ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে না হতেই সবাই একসঙ্গে চীৎকার করে উঠল ও-ও–হো-হো-ও। চীৎকার থামলে ফ্রান্সিস বলতে লাগল, লা-ব্রুশ আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে দেখ, তোমার চাইতে অনেক সুখে, অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে আমি জীবন কাটাতে পারতাম। কিন্তু আমি সেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চিন্ত জীবন ঘৃণা করি। আমি ভালোবাসি ঝড়-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রবিপদ, দুঃখ-কষ্টের জীবন। মানুষের জীবনের এখানেই সার্থকতা। এই শেষকথা জেনে যাও লা ব্রুশ, মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। তোমার মত একটা জলদস্যুকে তো নয়ই। আবার একটু থেমে বলল, তোমরা তো কাপুরুষ। নিরস্ত্র অবস্থায় আমাদের বন্দী করেছ। আমাদের হাত খুলে দাও, আর একটা করে তরোয়াল দাও–ধূলোর মত উড়ে যাবে তোমরা।
