–রাজা মুজাৰ্তা আর কতক্ষণ বেঁচে থাকবে। কাল সকালেই ফাঁসি দেওয়া হবে বাজারের সামনে ফাঁসিকাঠে।
–ঠিক আছে। তার আগেই আমাকে কথাটা বলতে হবে। পিরেল্লো বললেন।
–এখন কী কথা? একজন সৈন্য বলল।
আছে–আছে–আপনারা বুঝবেন না। পিরেল্লো বলল।
বেশ যান। শুনে রাখুন আমাদের কোন ক্ষতি করার যদি চেষ্টা করেন–তাহলে আপনাকে মরতে হবে। সৈন্যটি বলল।
–ঠিক আছে। পিরেল্লো মাথা ঝাঁকিয়ে এগিয়ে চলল।
পিরেল্লো বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। রাজার কাছে এলেন। রাজা শুয়েছিলেন। পিরেল্লোকে, দেখে উঠে বসলেন। ম্লানমুখে হেসে বললেন–পিরেল্লো শেষ রক্ষা হলো না।
–আপনি একেবারে দুশ্চিন্তা করবেন না। পিরেল্লো বললেন। তারপর গলা নামিয়ে বললেন–ভাইকিংরা দুঃসাহসী, লড়াইয়ে অপরাজিত। দেখবেন আপনি কালকেই মুক্তি লাভ করবেন।
–দেখি। রাজা মৃদুস্বরে বললেন।
মাননীয় রাজা আপনার কাছে যেজন্য এসেছি সেটা বলি। তারপর পিরেল্লো ফিসফিস করে বলল–আপনার সৈন্যরা সব কোথায়?
–সবার কথা তো বলতে পারবো না–রাজা গলা নামিয়ে বললেন–ওরা বেশির ভাগই বনের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে।
–বনে কীভাবে আছে? পিরেল্লো বললেন।
বনের মধ্যে আমার একটা সুতাকল আছে। বাড়িটা আমাদেরই তৈরি। বেশ বড় বাড়ি। সুতাকলের কর্মীরা থাকে। সেখানে আমার সৈন্যরা আশ্রয় নিয়েছে। রাজা বললেন।
–তাহলে ঐ সূতাকলের বাড়িতেই ওদের পাবো। পিরেল্লো বললেন।
–হ্যাঁ, কিন্তু ওদের কেন? রাজা জানতে চাইলেন।
–ওরা তো সৈন্য। লড়াই আরম্ভ হলে ওদের তো লড়তে হবে।
–ওরা কি পারবে লড়াইয়ে জিততে? রাজা বললেন।
–চেষ্টা তো করতে হবে। ভাইকিংরা আপনার কথা শুনেছে। ওরা আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে। ওরা মনেপ্রাণে আপনার মুক্তি চায়। পিরেল্লো বলল।
রাজা মুখে শব্দ করলেন–হু। আর কোন কথা বললেন না।
পিরেল্লো বাড়ির বাইরে এলেন। চললেন বনের দিকে।
ফাঁকা প্রান্তরটায় তবুচাঁদের অস্পষ্ট আলো ছিল। এখানে একেবারে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। প্রায়ই গাছের মোটা শেকড়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে। পিরেল্লো চলল। কিন্তু কোথায় সেই বাড়িটা? আবার কয়েক পাক দিয়ে পিরেল্লো খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ দেখল একটু ফাঁকায় বেশ বড় জন্তুর মত একটা লম্বাটে ঘর। পিরেল্লো দ্রুত পায়ে এসে বাড়িটার দোরগোড়ায় দাঁড়ালেন। কাঠের দরজায় আঙুল ঠুকলো। ভেতরে কোন সাড়া নেই। আবার শব্দ করল। দরজা খুলে গেল। বর্শা তুলে এক সৈন্য দাঁড়িয়ে। পিরেল্লো দুহাত ওপরে তুলে বললেন–আমি বন্ধু, শত্রু নই। যোদ্ধাটি বর্শা নামাল। বলল–আপনাকে আমরা চিনি। আপনি রাজা আনকহনার দেশের রাজপুরোহিত।
হা। এখন আর অন্য কথা নেই। শুধু লড়াইয়ের কথা। আরো কয়েকজন যোদ্ধা। ততক্ষণে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
পিরেল্লো বললেন আপনারা লড়াইয়ে হেরে গেছেন। এখানে লুকিয়ে আছেন। কিন্তু এখন আপনাদের লুকিয়ে থাকা চলবে না। আবার লড়াই করতে হবে। এই লড়াইয়ে যোগ দেবে কিছু ভাইকিং যোদ্ধা। জয় আমাদের হবেই। আপনারা তৈরি হয়ে নিন। তারপর আমাদের সঙ্গে চলুন। একজন যোদ্ধা মৃদুস্বরে বলল–নিশ্চয়ই যাবো।
–আপনি বসুন। একজন যোদ্ধা বলল।
পিরেল্লো একটা বস্তার ওপর বসলেন। বস্তাভর্তি তেলের বীজ। যোদ্ধারা তৈরি হল। তারপর ঘরের দরজার দিকে চলল। একজনকে চারদিক দেখার জন্য পাহারায় রাখল।
সবাই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। যে এখানে পাহারায় রইল সে দরজা বন্ধ করল।
— পিরেল্লোরা আধো আলো আধো অন্ধকারে ভেজা ভেজা বনের মধ্যে দিয়ে চলল সবাই। আবছা আলোর মধ্যে দিয়ে সবাই চলল ফ্রান্সিসদের ডেরার দিকে।
ফ্রান্সিসদের ডেরায় যখন সবাই এল তখন ফ্রান্সিসদের খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। ফ্রান্সিস রাজা মুজার্তার সৈন্যদের কাছে এল। বলল
-আপনাদের খাওয়া হয়েছে?
একজন সৈন্য বলল না। আমাদের তো খেতে দেরি হয়।
–ঠিক আছে। আমরা সব খাবার ভাগ করে খাবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস বিস্কো খেতে বসল না। খাবার পরিবেশন করতে লাগল। রুটি বুনো আলুর ঝোল শাকপাতা দেবার সময় ফ্রান্সিস বলল–কেউ দুবার চাইবেন না। রাজা মুজার্তার সৈন্যরা আমাদের সঙ্গে যাবে লড়াই করতে। তাদের জেন্যে তো রান্না হয়নি। কাজেই খাবার কম পড়ে গেছে। পেটপুরে খাওয়া হবে না। বেশি চাইবেন না। একটা কথা বলি–বেশি খেয়ে লড়াই করতে গেলে দ্রুত চলাফেরা করা যায় না। অল্প খাওয়ার জন্যে তোমাদের চলাফেরা দ্রুত হবে। তরোয়াল চালানো সহজ হবে। একদিক থেকে এই ভালো হল।
ভাইকিংরা খাওয়া শেষ করল। উঠে দাঁড়াল। এবার রাজা মুজার্তার সৈন্যরা খেতে বসল। তাদের সঙ্গে ফ্রান্সিস পিরেল্লোকে বসিয়ে দিল।
খাওয়া চলল। বিস্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। গলা নামিয়ে বললেন–ফ্রান্সিস আমাদের দুজনের মত খাবার অল্প পড়ে আছে। কী করবে?
–এরা চাইলে দিয়ে দাও। ফ্রান্সিস বলল।
তার মানে–বিস্কো বলতে গেল।
–হ্যাঁ। উপবাস। ফ্রাসিস বলল।
সবার খাওয়া হল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল
—বলে লাভ নেই। তবু বলছি কেউ ঘুমিয়ে পড়বে না। রাজা মুজাৰ্তার সৈন্যদেরও বলছি কথাটা। সময় হলেই আমি ডাকবো।
ভাইকিংরা, সৈন্যরা শুয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল।
ফ্রান্সিস আর বিস্কো পাশাপাশি বসেছিল। বিস্কো বলল–ফ্রান্সিস। আমাদের বন্ধুরা রাজা জুদেবার সৈন্যদের কীভাবে চিনবে?
