ফ্রান্সিস মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে এসে অপেক্ষা করল। ও পায়চারি করতে লাগল। বনের ওপরের আকাশটা পূবদিকে লাল হল। কিছুক্ষণ পরে সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস সারারাত ঘুমোতে পারল না।
সকালেও বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বনের পাশের রাস্তার ওপর। কিন্তু বন্ধুদের দেখা নেই।
ফ্রান্সিস পেটপুরে দুপুরের খাবার খেল। কিছুক্ষণ শুয়ে রইল। তারপর উঠে বসল। বাড়ির বাইরে এল। তাকিয়ে রইল দূরের রাস্তার দিকে।
হঠাৎ দেখলধুলো উড়িয়ে তিনটেশস্যটানা গাড়ি আসছে। ফ্রান্সিস সেইদিকে ছুটল।
গাড়িগুলোর কাছে এল। বন্ধুরা ধ্বনি তুললও-হো-হো। ফ্রান্সিস দুহাত ওপরে তুলে ও বন্ধুদের ধ্বনি থামাতে বলল। বন্ধুরা এবার চুপ করল। বন্ধুরা গাড়ি থেকে নামল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে চলল বাড়িটার দিকে। বাড়ির কাছে এসে বিস্কোকে বলল–তোমরা খাবে তো?
না না, আমরা এক সরাইখানায় খেয়ে এসেছি। বিস্কো বলল।
বাঁচালে। তোমাদের এতজনের জন্যে রান্না করতে বলবো ভেবেছিলাম। কিন্তু বাড়ির কর্তাকে রাঁধতে বলিনি। এত রান্না হবে। তোমরা না এলে সব নষ্ট হবে। ঘরের কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল–আপাতত এই ঘরেই ঠেসেটুসে বসো। বেশি শব্দ করবে না। তোমাদের কথা কেউ যেন জানতে না পারে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির কর্তা আসবে। তোমাদের আসার জন্য কর্তাকে বলেছি। উনি ভঁড়ার ঘর খালি করে দেবেন। তাতে অনেকেই থাকতে পারবে। ঘরে ঢুকে কয়েকজন শুয়ে পড়ল। বাকিরা কেউ কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। ফ্রান্সিস ঘরটায় ঢুকল। বলল-শাঙ্কোর মুখে সব শুনেছো তোমরা। নৃশংস রাজা জুবেদা এখানকার রাজা মুজার্তাকে হারিয়ে রাজবাড়ি দখল করে বসে আছে।
রাজা মুজার্তার মতো এমন সহৃদয় প্রজাবৎসল রাজা আমি দেখিনি। এখন রাজা জুবেদার সঙ্গে আমাদের লড়াই করতে হবে। আমরা সৈন্যসহ রাজা জুবেদাকে দেশ থেকে তাড়াবো। এবার বলো কখন আক্রমণ শুরু করতে চাও? ভাইকিং বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। কিছু পরে বিস্কো বলল,
–ফ্রান্সিস আমরা রাতের বেলা রাজবাড়ি ঘিরে ফেলবো। তখন রাজার সৈন্যরা লড়াই করতে আসবে। তখন লড়াইও হবে। রাজা জুবেদার সৈন্যরা তখন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকবে।
–আমার এতে আপত্তি নেই। ফ্রান্সিস বলল।
এরমধ্যে গৃহকর্তা এলো। ভাড়ার ঘর থেকে মালপত্র সরিয়ে ফ্রান্সিসদের থাকার ব্যবস্থা করে দিল। দুটো ঘর পাওয়ায় শোয়া বসার জায়গা পাওয়া গেল।
ফ্রান্সিস গৃহকর্তাকে ডাকল। বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর কর্তাকে বলল–রাজা মুজাৰ্তার খবর কী?
–চুপ করে বসে থাকেন। কারো সঙ্গে কথা নেই। মাঝে মাঝে ফুঁপিয়েও ওঠেন। তখন রাণী সান্ত্বনা দেন। এভাবেই রাজার দিন কাটছে। গৃহকর্তা বলল।
আমাকে রাজা মুজার্তার কাছে নিয়ে চলুন। রাজার সঙ্গে কিছু কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনাকে তো বাড়িটা চিনিয়ে দিয়েছি। গৃহকর্তা বলল।
–বাড়ি চিনি। কিন্তু প্রহরীরা আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। আমাকে তো ওরা চেনে না। তার ওপর আমি বিদেশী। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। চলুন যাওয়া যাবে। গৃহকর্তা বলল।
–পরে নয়, আজকেই সন্ধ্যের সময় যেতে হবে। পরে অনেক কাজ আছে আমাদের। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা কি রাজা জুবেদার সৈন্যদের আজকেই আক্রমণ করবেন? গৃহকর্তা জানতে চাইল।
হ্যা। কাজ সেরে আমাদের জাহাজে ফিরে যেতে হবে।
গৃহকর্তা মাথাটা এপাশ ওপাশ করল। বলল–আপনারা কি পারবেন?
–অবশ্যই পারবো। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। তাহলে সন্ধ্যের সময় যাবো। আমাকে ডেকে নিয়ে যাবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। গৃহকর্তা চলে গেল। বিস্কো বলল–ফ্রান্সিস আমিও তোমাদের সঙ্গে যাবো।
–সে যেও। এবার পিরেল্লো এগিয়ে এল। বলল–আমিও যাবো।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধ্যের সময় গৃহকর্তা এলো। ফ্রান্সিসকে বলল–
–আপনি তৈরি তো?
–অবশ্যই। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনাদের জন্যে তিনটি রাঁধুনি এনেছি। গৃহকর্তা বলল।
–সে তো বটেই। এতজনের রান্না একা আপনার স্ত্রীর পক্ষে অসম্ভব।
–বেশ। গৃহকর্তা বলল।
–রাধুনিকে আমরা কিছু পারিশ্রমিক দেবো। ফ্রান্সিস বলল।
এবার চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
চারজন রাস্তায় নেমে চলল উত্তরমুখো। ওদিকেই অমাত্যের বাড়ির দিক।
এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। ধুলো উড়ছে। আকাশে চঁদ আছে। অস্পষ্ট গঁদের আলো ছড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস ভাবলো–মোটামুটি চাঁদের আলো পাওয়া যাবে। এতে লড়াই চালাতে সুবিধেই হবে।
চারজনে অমাত্যের বাড়িতে পৌঁছল। পিরেল্লো দরজার টোকা দিল। দরজা খুলে দিল।
ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। গৃহকর্তার পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরা রাজার শোয়ার ঘরে এল। মোমবাতিরআলোয় দেখল রাজা মুজাৰ্তা চুপ করে বিছানায় বসে আছেন ফ্রান্সিসদের মুখ তুলে দেখলেন। কোন কথা বললেন না। ফ্রান্সিস একটু মাথা নুইয়ে দিল। তারপর বলল–আপনাকে একটা শুভসংবাদ দিচ্ছি। আমার বীর যোদ্ধা বন্ধুরা এসেছে। রাজা জুবেদাকে আমরা হারাতে পারবো। আমাদের দু’একজন বন্ধু যুদ্ধে মারা যেতে পারে আহত হতে পারে। তবুও আপনাকে আপনার রাজ্য ফিরিয়ে দিতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
রাজা মুজার্তা কিছু বললেন না।
মাননীয় রাজা আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। ফ্রান্সিস বলল–এবার আপনার কাছে জানতে চাইছি যুদ্ধে রাজা জুদেবার পরাজয় ঘটলে আপনি কী চান?
