সেসব পরে দেখা যাবে। আপনি আমাকে নিয়ে চলুন।
রাজা কোথায় আত্মগোপন করেছেন? ফ্রান্সিস আবার বলল।
–এক অমাত্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। গৃহকর্তা বললেন।
–আপনি তো অমাত্যের বাড়ি চেনেন। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–চিনি বৈকি। রাজার চিঠি ফরমান এসবঅমাত্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার কাজ। গৃহকর্তা বললেন।
–তাহলে আমাকে নিয়ে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। একটু রাত হোক। গৃহকর্তা বলল।
–বেশ। আমাকে ডাকবেন। ফ্রান্সিস বলল।
রাত গভীর হল। ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ও তখন ভাবছে কখন ভাইকিং বন্ধুরা আসবে। জোরদার লড়াই হবে। রাজা জুবেদার সৈন্যরা শুধু বর্শা হাতে লড়াই করবে। একবার বর্শাটা ছুঁড়লেই সৈন্যদের হাতে লড়াই করার অস্ত্র থাকবেনা। তখন অতি সহজে সৈন্যদের ধরে ফেলা যায়। তরোয়ালের কাছে ওরা তখন হার স্বীকার করতে বাধ্য।
বাড়ির কর্তা এল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো ওর ছোরাটা রেখে গেছে। ফ্রান্সিস ছোরাটা কোমরে গুঁজে নিল। পিরেল্লো বলল–আমিও যাবো। ফ্রান্সিস বলল–দোভাষী হিসেবে আপনাকে যেতেই হবে।
আকাশে ভাঙা চাঁদ। চারদিক মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। তিনজনে হেঁটে চলল। একটা ইঁদারার কাছে এল ওরা। বাড়ির কর্তা ডানদিকে ঘুরে একটা বাড়ির সামনে এল। পাথর আর কাঠের বাড়ি। বাড়িটা বেশ বড়। চারদিকে ফুলের গাছ। বিচিত্র সব ফুল ফুটে আছে।
ওরা বড় দরজাটার কাছে এল। সাধারণ বাড়িটাড়ির থেকে অনেক ভালো। বেশ অর্থব্যয়েই বাড়িটা করা হয়েছে। গৃহকর্তা দরজায় কান রেখে দরজায় আঙুল দিয়ে খটখট শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে দরজার একটা পাল্লা খুলে গেল। একজন প্রহরী মুখ বাড়াল। দুচোখ কুঁচকে সেই গৃহকর্তাকে দেখল। আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে গেল। ফ্রান্সিসরা ভেতরে ঢুকল। বেশ বড় ঘর। বাঁকা পাথরের চেয়ার। শ্বেতপাথরের টেবিল। একেবারে অন্ধকার ঘর। ঐ ঘরের পরে এল গৃহকর্তা। ফ্রান্সিসকে বলল–ভেতরের ঘরে আসুন।
ভেতরের ঘরে মোটা মোমবাতি জ্বলছে। সেই আয়নায় ফ্রান্সিস দেখল বাঁ দিকে। একটা খাট। রাজা মুজার্তা তার ওপর শুয়ে আছেন। ফ্রান্সিসরা ঢুকতে উনি পাশ ফিরে শুলেন। পিরেল্লো দুজনের কথা দোভাষীর মতো বুঝিয়ে দিতে লাগল।
-মাননীয় রাজা–আপনি কেমন আছেন। ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
–একজন রাজ্যহারা রাজা যেমন থাকে। রাজা বিষাদের সুরে বললেন।
–আপনি আবার রাজ্য ফিরে পাবেন। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা মুজার্তা একটু অবাক চোখে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল।
–হ্যাঁ–আপনি জয়ী হবেন। আমি ফ্রান্সিস বলছি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা কিছুক্ষণ ওপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ফ্রান্সিস দেখল স্বল্প আলোয়–আর একটা খাটে রাণী শুয়ে আছেন। সঙ্গে শিশুপুত্র। ফ্রান্সিস বলল–মাননীয় রাজা আপনি ভেঙে পড়বেন না। মনে সাহস রাখুন। রাণীর কাছে এল। পিরেল্লোও এল। ফ্রান্সিস বলল–মাননীয়া রাণী–আপনি শক্ত থাকুন। দুশ্চিন্তা করবেন না। মাননীয় রাজা আবার তার রাজ্য ফিরে পাবেন। রাণী কোন কথা বললেন না। চুপ করে শুয়ে রইলেন।
গৃহকর্তার সঙ্গে ফ্রান্সিসরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিসকে গৃহকর্তা বলল– একটা কথা বলি,
-বলুন, কর্তা বলল।
–আমার একত্রিশ জন বন্ধু কাল পরশুর মধ্যে এখানে আসবে। তাদের থাকা খাওয়ার ব্যাপারটা আপনি দেখবেন আমার অনুরোধ। ফ্রান্সিস বলল।
–তারা এখানে আসবে কেন? গৃহকর্তা জানতে চাইলেন।
–রাজা মুজাৰ্তার হয়ে লড়াই করবে। ফ্রান্সিস বলল।
তারা কি জুবেদার সৈন্যদের হারাতে পারবে? গৃহকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করলেন।
–আমরা ভাইকিং। আমার বন্ধুরা যে কী দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সেটা লড়াই দেখলেই বুঝবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে রাজা মুজার্তার মুক্তির আশা আছে। পিরেল্লো বলল।
–নিশ্চয়ই আছে। ফ্রান্সিস কথাটা জোর দিয়ে বলল।
–আপনার কথা শুনে আমি আশ্বস্ত হলাম। এই রাজাকে আমরা শ্রদ্ধা তো করিই বড় ভালোবাসি। গৃহকর্তা বলল।
পরের সারাটা দিন ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে রইল। বাড়ির কর্তা দু-তিনবার এসে জানতে চাইল–আপনার শরীর ভালো তো?
–আমি ভালো আছি। একখানা তরোয়াল হাতে পেলে আমি এক্ষুনি লড়াইয়ে নামতে পারি। ফ্রান্সিস দাঁত চেপে কথাটা বলল।
–তরোয়াল কী? গৃহকর্তা জানতে চাইল।
–একটা যুদ্ধাস্ত্র। এই অস্ত্রটি আমাদের হাতে থাকলে আমাদের পরাস্ত করা অসম্ভব। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা এই তরোয়াল দিয়ে লড়াই করেন? গৃহকর্তা জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। ঐ অস্ত্রটা দিয়েই আমরা শত্রুদের পরাস্ত করি। ফ্রান্সিস বলল।
পরের সারাটা দিনফ্রান্সিসঘর থেকে বেরুলোনা। রাজা জুবেদার সেনাপতিরাজামুজার্তার প্রজাদেরনাচ-গান-বাজনা করতে আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু প্রজারা রাজি হয়নি। কথাটা ফ্রান্সিস গৃহকর্তার মুখে শুনল। ফ্রান্সিস বলল–এটা ঠিক কাজ হল না। আপনি রাজার অনুমতি নিয়ে প্রজাদের গানবাজনা করতে বলুন। এসব করলে রাজা জুবেদার সৈন্যরা অলস হয়ে পড়বে। ওরা নিশ্চিন্তে থাকবে। ওরা বুঝেযাবে যে আরলড়াই করতে হবেনাআমি এটাইচাইছি। ওদের মধ্যে আর শৃঙ্খলা থাকবে না। আমাদের লড়াই করতে সুবিধে হবে।
–দেখি। বলে বাড়িরকর্তা চলে গেল। ফ্রান্সিস এক গ্লাশ জল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যের সময় ফ্রান্সিস শুনল বাইরে বাজনার সঙ্গে নাচগান শুরু হয়েছে। ফ্রান্সিস আপন মনে হাসল। বুঝল বাড়ির কর্তা কাজটা করতে পেরেছে। এবার যুদ্ধের জন্যে প্রতীক্ষা।
