–না-না। আমি একাই থাকতে পারবো। হ্যারি বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল।
সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। রাজা হানমের গুপ্তধন ভাণ্ডার আবিষ্কার করতে দেবতার জন্যে সময় চাই। আবার শায়িত দেবতাদের মন্দিরে যেতে হবে ফিরতে দেরি হলে জাহাজের বন্ধুরা, মারিয়া ভাবতো। এইসব চিন্তা করতে করতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
একটু বেলাতেই ফ্রান্সিসদের ঘুম ভাঙল। হাতমুখ ধুয়ে এল সবাই। সকালের খাবার দিয়ে গেল কর্তা নিজেই। তিনকোণা রুটি আর সজির ঝোল।
সবাই খেল। এবারে রাজবাড়ি যাওয়া। হ্যারি শুয়ে রইল। ওরা জিন চলল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।
রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দুধারে বাড়ি। কাঠ আর পাথরের। লোকজন খুব বেশি নয়। ওরা হঠাৎ বাজনার শব্দ শুনল। একটা মোড়ে পীপের একদিকে চামড়া ঢাকা। অন্য পাশ খোলা। তাই দিয়ে বাজনা বাজাচ্ছে দু’তিনজন পুরুষ। একদঙ্গল ছেলেমেয়ে বাজনার তালে তালে নাচছে। ফ্রান্সিস বলল–এরা নাচছে কেন পিরেল্লো?
–আনন্দে। এই দেশে গান-বাজনা লেগেই আছে। কখনও কখনও সারারাত নাচগান চলে। গৃহকর্তা বললেন।
–তাহলে এরা সুখী। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা মুজাৰ্তর প্রজারা সুখী। কোনঅসুবিধে কোন সমস্যা নেই এদের। পিরেল্লো বললেন।
ডানহাতি দেখা গেল বহুদূর বিস্তৃত তুলোর ক্ষেত।
ফ্রান্সিস বলল–এখানে খুব ভালো তুলা চাষ হয়।
–হ্যাঁ। তুলোই প্রধান আয়ের পথ। পিরেল্লো বলল।
এবার পিরেল্লো আঙুল তুলে রাজবাড়ি দেখাল। কাঠপাথরে তৈরি রাজবাড়ি। তবে সাধারণ বাড়ির চেয়ে বেশ বড়। প্রবেশদ্বারে লোকজনের জটলা। সেখানে ফ্রান্সিসরা এসে দাঁড়াল। ঝকঝকে বর্শা হাতে প্রহরী। ফ্রান্সিসদের দেখে একটু অবাকই হল। বোঝাই যাচ্ছে বিদেশী। প্রহরী সবাইকে ঢুকতে দিচ্ছে না। পিরেল্লো এগিয়ে গিয়ে প্রহরীকে কী বলল। প্রহরী ঘাড় নাড়ল। পিরেল্লো ফ্রান্সিসদের ইশারায় ডাকল।
ফ্রান্সিসরা এবার সহজেই ভেতরে ঢুকল। দেখল বেশ ভিড়। দফায় দফায় দর্শনার্থী প্রজাদের ঢোকানো হচ্ছে। একদফা ভিড় চলে যেতেই ফ্রান্সিসরা ভালোভাবে রাজা মুজার্তাকে দেখল। রোগা লক্ষ্য মুখে দাড়ি গোঁফ। কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। সিংহাসনে ফুলতোলা মোটা কাপড়ে ঢাকা। রাজা মাঝে মাঝে হাত নাড়ছেন। দর্শনার্থীরা আনন্দে চিৎকার করে রাজার জয়ধ্বনি দিচ্ছে। ফ্রান্সিসরা দেখল কোন বিচারপ্রার্থী কেউ নেই। হয়তো এ দেশে কোন অপরাধ হয় না। হয়তো ঝগড়া-বিবাদ হয় না।
একদফা দর্শনার্থীরা বেরিয়ে যেতেই রাজা মুজার্তা ফ্রান্সিসদের দেখল। রাজা সঙ্গে সঙ্গে আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুতপায়ে হাসিমুখে ফ্রান্সিসদের কাছে এলেন। ফ্রান্সিসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপরশাঙ্কোকেতারপরপিরেল্লোকেবললেন–আসুন রাজপুরোহিত।
রাজা বললেন–আপনাদের তিনজন আসার কথা।
–হ্যাঁ। আমরা তিনজনই। একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারেননি। শাঙ্কো বলল।
আসনের কাছে এসে বললেন–আপনারা বসুন। তিনটি আসনই রাখা ছিল। ফ্রান্সিসরা বসল। রাজা বলতে লাগলেন পিরেল্লো স্পেনীয় ভাষায় তা বলতে লাগলেন। রাজা বললেন–বেশ কয়েকবছর আগের কথা। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। একটা পাহাড়। গাছ গাছালি ঘাসে সব সবুজ। পাহাড়ের সবই সবুজ এটা হয় না। কিন্তু স্বপ্নে দেখেছিলাম আমি যেন পাহাড় থেকে নামছিলাম। হঠাৎ মেঘশূন্য আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। একবার দুবার তিনবার। সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম আমার সামনে তিনজন শ্বেতাঙ্গ। একজন শ্বেতাঙ্গ বললেন–প্রজাদের নিজের ছেলের মতো ভালোবাসবেন। দ্বিতীয়জন বললেন–নিজের প্রাণরক্ষার জন্যে যুদ্ধ করবেন। অন্যথায় নয়। তৃতীয়জন বললেন–আপনার রাজত্বে দারিদ্র্য যেন না থাকে। তিন পুরুষ পাহাড়ের চূড়ার দিকে হেঁটে চললেন। কিছুক্ষণ তাদের দেখলাম। তারপর তারা দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন।
সবাই চুপ করে রইলেন। ফ্রান্সিস বলল–সেই নিপুরুষ যে আমরাই সেটা বুঝলেন কী করে?
–স্বপ্নে যতটা দেখেছিলাম তাতে আপনাদের সঙ্গে মিল আছে। রাজা বললেন।
আবার একদফা দর্শনার্থীদের ছাড়া হল। রাজসভার কাছে আবার ভিড় হল। রাজার জয়ধ্বনি চলল। রাজাও হাত নেড়ে দর্শনার্থীদের উৎসাহিত করতে লাগলেন।
আর একদফা দর্শন দিয়ে রাজা মুজার্তা প্রহরীদের আর কাউকে ঢুকতে মানা করে দিলেন। সভাঘর আস্তে আস্তে নিঃশব্দ হল।
এবার রাজা মুজাৰ্তা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন–বেশ শান্তিতেই ছিলাম। প্রজাদের অভাব-অভিযোগ জেনে সে সব দূর করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পাহাড়ের ওপারে একটা রাজ্য আছে। রাজার নাম জুদেবা। অত্যন্ত হিংস্র প্রকৃতির মানুষ। ও দেশে প্রজাদের অনেক কষ্টে দিন কাটে। এই রাজা জুদেবা নরহত্যা ছাড়া কিছু বোঝে না। সারা রাজ্যে চর ঘুরে বেড়ায়। কেউ রাজা জুদেবের বিরুদ্ধে একটি কথা বললে তাকে ধরে রাজার কাছে নিয়ে আসে। তার ওপর শুরু হয় নির্মম অত্যাচার। তাই সবাই মুখ বুজে থাকে। একটু থেমে বলতে লাগলেন–রাজা জুদেবা বার তিনেক আমার রাজ্য আক্রমণ করেছে। আমার প্রজারা প্রাণপণ লড়াই করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার দেশপ্রেমিক কিছু যোদ্ধাও মারা গেছে। আমার লোকজনেরা সংবাদ নিয়ে এসেছেআজ অথবা কালকে রাজা জুদেবা আমার রাজ্য আক্রমণ করবে। তাই বড় চিন্তায় আছি।
