ফ্রান্সিস অস্ফুট স্বরে বলল–এবার পালাও।
চারজন বাইরে এল। ফ্রান্সিস গলা চেপে বলল–পিরেল্লো–কোন দিকে যাবো? উত্তর দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বলল–এই দিকে।
চারজনই উত্তরমুখো ছুটল। চাঁদের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল একটা বনাঞ্চল। তখনও দূরে দেখল গ্রামপতির যোদ্ধারা মশাল হাতে ফ্রান্সিসদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। হৈ হৈ করছে।
ফ্রান্সিসরা বনে ঢুকে পড়ল। আর ধরা পড়ার ভয় নেই। বনের গাছপালা খুব ঘন নয়, ছাড়া ছাড়া। ওর মধ্যে দিয়েই ফ্রান্সিসরা যতটা দ্রুত দৌড়োনো সম্ভব ততটা জোরে ছুটল।
বনটা খুব বেশি বড় নয়। একসময় বন শেষ। সামনেই একটা বেশ বড় ছড়ানো পাথরের আর ঘাসের প্রান্তর।
ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ হ্যারি অস্পষ্টস্বরে ডাকল–ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল। দেখল হ্যারি মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস ছুটে এসে হ্যারিকে ধরল। কিন্তু ধরে রাখতে পারল না। হ্যারিঘাসেরওপর শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হ্যারিকে কাঁধে তুলে নিল। তারপর হাঁটতে লাগল। পিরেল্লো বলল–আমরা এসে গেছি। বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল– ওখানেই আশ্রয় নেব। শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল–ফ্রান্সিস এবার আমি নিচ্ছি। ও দুহাত ছড়িয়ে হ্যারিকে ধরল। তারপর আস্তে আস্তে কাঁধে রাখল। তখন সকাল হয়ে গেছে।
প্রথম বাড়িটার সামনে এসে ওরা দাঁড়াল। কিছু কাচ্চা বাচ্চা ওদের ঘিরে দাঁড়াল। এক মহিলা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। কী বলল। ফ্রান্সিসরা বুঝল না। পিরেল্লোও কীসব বলল। মহিলাটি পাশের ঘরটা দেখিয়ে কী বলল। তারপর ঐ ঘরটার কাছে এল। কোমর থেকে চাবির বড় একটা থোকা বের করল। ওটাতে অনেক চাবি। মহিলাটি দেখে দেখে একটা চাবি বের করল। চাবিটা দিয়ে দরজা খুলল।
ফ্রান্সিসরা ঘরের ভেতরে ঢুকল। মেঝে মাটির। তার ওপর ঘাসপাতা দিয়ে তৈরি একটা বিছানামতো। শাঙ্কো আর ফ্রান্সিস হ্যারিকে ধরাধরি করে ঘাসের বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। হ্যারির গোঙানি বাড়ল। ফ্রান্সিস কী করবে বুঝতে পারছে না। পিরেল্লো বলল–আপনাদের বন্ধুর এরকম হয়?
–হ্যাঁ। হঠাই অজ্ঞানমতো হয়ে যায়। শাঙ্কো বলল।
–অনেক দেরিতে জ্ঞান ফিরে পান? পিরেল্লো বলল।
-হ্যাঁ। তখন আগের ঘটনার কিছুই মনে করতে পারেনা। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনারা যে বন্দরে জাহাজ থামিয়েছেন সেই বন্দর এলাকাতেই থাকেন এক সাধু। তার ওষুধ খেয়ে এক অন্ধ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। কারো ভাঙা পা জোড়া লেগেছে।
–আপনি নিজে দেখেছেন তেমন কিছু? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
না না। লোকমুখে শুনেছি। পিরেল্লো বলল।
–এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। লোক ঠকানো ব্যবসা। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুর কেটে গেলে। খাওয়ার ডাক পড়ল না। অবশ্য ফ্রান্সিসদের খিদেই পাচ্ছিল না।
শেষ দুপুরে হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। গোঙানি বন্ধ হয়েছে তার আগেই। হ্যারি আস্তে আস্তে ওর কোমরের ফেট্টি থেকে একটা কাঠের কৌটো বের করল। কৌটোর মুখ খুলতে খুলতে বলল–শাঙ্কো এক গ্লাশ জল আনো। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে কাঠের গ্লাশে করে জল নিয়ে এল। হ্যারি কৌটো থেকে একটা গুলি বের করল। আস্তে আস্তে খেয়ে নিল।
তখন বিকেল হয়ে এসেছে। গৃহকর্তা এসে বলল–আপনারা কোন দেশ থেকে এসেছেন? ভদ্রলোক খুবই অমায়িক। ফ্রান্সিস বলল–আমরা ভাইকিং। পশ্চিম ইউরোপ থেকে এসেছি। পিরেল্লোকে দেখিয়ে বলল–ইনি কোন দেশ থেকে এসেছেন?
–খেতে আসুন। বড় দেরি হয়ে গেল। মানে নতুন করে রান্না চাপাতে হল। কিছু মনে করবেন না।
সবাই উঠে দাঁড়াল। হ্যারিও উঠতে যাবে। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি–তুমি এই ঘরেই যাও। বেশি নড়াচড়া করো না।
–বেশ। হ্যারি বসে রইল।
হ্যারি পেট ভরে খেও। তারপর একটু পায়চারি করো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা ওপাশের ঘরে ঢুকল। দেখল মাটির মেঝেয় পরপর একটা করে লম্বাটে পাতা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিসরা খেতে বসল। গৃহকত্রী আর তার মেয়ে খাবার পরিবেশন করতে লাগল। গৃহকর্তা এবার বললেন–এত বেলায় বেশি রান্না করা গেল না। আমরা মুরগী পুষি। তাই
–খেতে কোন অসুবিধে হচ্ছেনা তো? শাঙ্কো বলে উঠল–মাংস হয়েছে, আলুভাজা হয়েছে–ব্যস্ আর কী লাগে।
খেয়েদেয়ে ওরা হ্যারির কাছে এল। হ্যারি আরও একটা বড়ি খেল। হ্যারি অনেকটা সুস্থ এখন। হ্যারি ঘরেই খেয়েছে। গৃহকত্রী নিজেই হ্যারির খাবার এনে দিয়েছে।
এবার শোওয়া। চারজনের পক্ষে ঘরটা ছোটই। এরকম ছোট জায়গায় থাকা ফ্রান্সিসদের অভ্যেস আছে। পিরেল্লোর একটু অসুবিধে হল। পিরেল্লো কিছু বলল না। চেপেচুপে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ডাকল-পিরেল্লো?
–বলুন।
–এই রাজ্যের রাজার নাম কী?
মুজার্তা।
–লোক কেমন?
–চিন্তা করতে পারবেন না কী অমায়িক এই রাজা মুজার্তা। অনেক রাজাই তো দেখেছি-মুজার্তার মতো এমন সহৃদয় পরোপকারী প্রজাবৎসল রাজা আমি দেখিনি। প্রজাদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন। প্রজারাও তাকে দেবতার মতো মানে। পিরেল্লো বলল।
–তাহলে তো রাজা মুজার্তাকে একবার দেখতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–চলুন। কাল সকালে রাজসভায়। পিরেল্লো বলল।
–ঠিক আছে। যাবো ফ্রান্সিস বলল। এবার হ্যারিকে বলল হ্যারি, তুমি পারবে যেতে?
–আমি আর যাবো না। এখানেই থাকবো। হ্যারি বলল।
–বেশ। তুমি যদি চাও আমরা একজন তোমার সঙ্গে থাকতে পারি। শাঙ্কো বলল।
