চারজনে দাঁড় বাইতে লাগল। এতক্ষণে ওদের চোখে আলো সহ্য হয়ে গেছে। ওরা বেশ জোরে-জোরেই দাঁড় বাইতে লাগল। এখানে সমুদ্র শান্ত। ঢেউয়ের খুব ধাক্কা নেই। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বীপে পৌঁছল। দ্বীপের বালিয়াড়িতে প্রথম নামল লা ব্রুশ। পেছন ফিরে বলল–ঐ সিন্দুকটা নিয়ে আমার পেছনে-পেছনে তোরা আয়।
–কোথায়? একজন ভাইকিং জিজ্ঞাসা করল।
–চল না সব দেখবি–লা ব্রুশ খুকখুক করে হেসে বললো।
ওরা ধরাধরি করে সিন্দুকটা নামাল। তারপর ধরে ধরে বয়ে নিয়ে চলল লাশের পেছনে।
একটু পরেই শুরু হলো পাহাড় এলাকা, রাস্তা বলে কিছুই নেই, এবড়ো-খেবড়ো পাথর-নুড়ি, বুনো ঝোঁপ-জঙ্গল ঠেলে এগোতে হচ্ছে। লা ব্রুশ আগে-আগে চলেছে। তরোয়াল চালিয়ে ঝোঁপ-জঙ্গল কেটে এগোচ্ছে। পেছনে ওরা চারজন! অসম্ভব ভারী বাক্স। তারপর ওরকম উঁচুনীচু রাস্তা। ওরা ঘেমে উঠল। লা ব্রুশ এক একবার থামছে, আর পেছন ফিরে দেখে নিচ্ছে। এতক্ষণে ওরা লক্ষ্য করলো যে মাথার ৬পর গাছের–ডালাপালা থেকে কী যেন ওদের গায়ে পড়ছে। মাটিতে খালি পা কিসে লেগে খুড়-খুড় করছে। একজন ভালো করে দেখল–জোঁক পা কামড়ে ধরছে। গাছের ডাল থেকে গায়ে পড়ছে জোঁক লা ব্রুশের পরনে লম্বা কোট, এক পায়ে বুটজুতো আর এক পা তো কাঠের। ওর কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ভাইকিংরা ভীত হয়ে পড়ল। এত জোঁক?
ওরা তাড়াতাড়ি বাক্স নামিয়ে জোঁক ছাড়াতে লাগল। লা ব্রুশ ঘুরে দাঁড়িয়ে তরোয়াল ওঁচাল–জলদি চল।
ওরা আর কি করে! তবু একজন ভাইকিং বলে উঠল, জোঁকে খেয়ে ফেলছে–হাঁটবো কি করে! লা ব্রুশ খুক খুক করে হাসল–অনেকদিন মানুষের রক্ত খায় নি তো। চল্। গুহায় পৌঁছে নুন দিয়ে দেবো। চ জলদি।
আবার চলা শুরু হলো তখন ওদের গায়ে হাতে-পায়ে জোঁক আছে। একটা খাড়াইয়ের ওপর এসে পৌঁছল ওরা। ওপর থেকে ঝর্ণার জল পড়ছে। জায়গাটা ভেজা-ভেজা। অনেক ফার্ণ গাছ। পাথরে সবজে শ্যাওলার আস্তরণ।
লা ব্রুশ হাত তুলে থামতে ইঙ্গিত করল। ওরা বাক্সটা নামিয়ে হাঁপাতে লাগল। গায়ে লেগে থাকা জোঁক টেনে তুলতে লাগল। একজন লা ব্রুশকে বলল–কই নুন দিন?
লা ব্রুশ কোমরে বেল্টের মধ্যে থেকে একটা পুটুলি বের করল। পুটুলি থেকে ওদের হাতে নুন ঢেলে দিল। নুন লাগাতেই জোঁকগুলো টুপটুপ করে খসে পড়ল। লা ব্রুশ ও নিজের গায়ের দু’এক জায়গায় নুন লাগাল। জোঁকগুলো খসে পড়ল। লা ব্রুশ এবার শ্যাওলার আস্তরণে ঢাকা একটা মস্তবড় পাথরের চাঁই ধরে টানল। পাথরটা বেশ কিছুটা সরে গেল। ফাটল দেখা গেল। লা ব্রুশ ওদের দিকে ফিরে তাকিয়ে সরে এসে বলল–এই চাইটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দে।
ওরা চারজন মিলে পাথরটা টান দিয়ে সরাতে ফাঁকটা আরো বড় হল।
আরে খুলতে হবে–লা ব্রুশ বলল।
আবার ওরা ধাক্কাধাক্কি শুরু করল। একজন মানুষ ঢোকাবার মত ফাঁক হল। আবার কয়েকটা ধাক্কায় বাক্স গলে যাবার মতো ফাঁক হলে লা ব্রুশ বলল–এবার শুধু দু’জনকে বাক্সটা ভেতরে নিয়ে গিয়ে রাখতে হবে। ভাইকিংদের মধ্যে দু’জন এগিয়ে এল। বেশ কষ্ট করে দু’জন ফাটলদার মধ্যে দিয়ে বাক্সটা নিয়ে ভেতরে ঢুকল। দেখল, ভেতরটা একটা গুহা, অন্ধকার। শুধু পাথরের চাইয়ের ফাটলটার মধ্যে দিয়ে কয়েকটা একইরকম লোহার বাক্স। পেতল দিয়ে নক্সা করা। ওরা বুঝল, এটাই হচ্ছে লা ব্রুশের গুপ্ত ধনভান্ডার হঠাৎ ওরা পায়ে হোঁচট খেল। ভালো করে তাকিয়ে দেখল কয়েকটা নরকঙ্কাল। হয়তো আরো নরকঙ্কাল আছে, কিন্তু এই আলোতে দেখা যাচ্ছে না। এইবার ওরা ভীত হলো, পরস্পরের হাত ধরল। লা ব্রুশের এই গুপ্ত ধনভান্ডারের খোঁজ জানার পর লা ব্রুশ কি ওদের বেঁচে থাকতে দেবে? একজন চেঁচিয়ে উঠল–শীগগির পালাও। দু’জনে পাথরের ফাটলের দিকে ছুটল। ঠিক তখনই সেই ফাটলের মুখে এসে দাঁড়াল লা ব্রুশ। হাতে উদ্যত রিভলবার, ওরা কিছু বোঝবার আগেই লা ব্রুশ গুলি চালাল। নিখুঁত নিশানা। দুটো গুলিই ওদের হৃৎপিন্ড ভেদ করল। একজন তবু মাটিতে পড়ে আঁ-আঁ করে দু’একবার কাতরাল। অন্যজন মাটিতে পড়ে আর নড়ল না।
বাইরে যে দু’জন ভাইকিং’ দাঁড়িয়েছিল, তাদের একজনের নাম বিস্কো। লা ব্রুশ পিস্তল হাতে ওদের দুজনের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই বিস্কো চেঁচিয়ে উঠল পালাও। বিস্কো চিৎকার করে উঠেই খাড়াই থেকে একটা গাছ লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। গাছটার মগডাল ধরে ঝুলে পড়ল। ডালটা ভেঙে গেল কিন্তু খুলে এলোনা। ও প্রথম ধাক্কাটা সামলালো। তারপর ডাল বেয়ে নেমে আসতে লাগল। এত দ্রুত বিস্কো ঝাঁপ দিয়েছিল, যে লা ব্রুশ পিস্তল নিশানা করবার অবকাশ পেল না, অন্যজনও সঙ্গে সঙ্গে নীচের দিকে ছুটল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। লা ব্রুশের নিখুঁত নিশানার গুলি ওর পিঠ ভেদ করে ঢুকে পড়ল। ও খাড়াই পাহাড়ের গায়ে কয়েকটা পাক খেয়ে নীচে গাছ-গাছুলির আর ঝোঁপের মধ্যে গড়িয়ে পড়ল। যে গাছটায় বিস্কো লাফিয়ে পড়েছিল–সেই গাছটা লক্ষ্য করে লা ব্রুশ পিস্তল থেকে দুটো গুলি ছুঁড়লো। কিন্তু কোনটাই বিস্কোর গায়ে লাগল না। কারণ, বিস্কো ততক্ষণে অন্য একটা ঝোপে আত্মগোপন করেছে।
লা ব্রুশ পিস্তলটা কোমরে গুঁজতে খুঁজতে আপনমনেই খুকখুক করে হেসে উঠল। তারপর ঠক্ঠক্ করে এগিয়ে গিয়ে দু’হাত ফাটলের পাথরটায় ধাক্কা দিল। প্রাণপণে বার কয়েক ধাক্কা দিতেই পাথরটা আগের মত লেগে গেল। সবুজ শ্যাওলায় ঢাকা পাথরের গায়ে ফাটলটা কোথায়, সেটা আর বোঝবার উপায় রইল না।
