দুজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। আহত বন্দীদেরও নিয়ে যাচ্ছে ওরা। কিছু পাথর কাঠের বাড়ি। লম্বা লম্ফ শুকনো ঘাসের ছাউনি বাড়ি এ রাস্তার দুপাশে। বাড়িগুলোর ধারে কাছে কেউ নেই। বেশ দূরে হেঁটে আসতে হয়েছে। পূব আকাশে লাল আভা। একটু পরেই সূর্য উঠল। ফ্রান্সিসদের বড় ভালো লাগে সূর্যোদয়। কিন্তু আজ ভালো লাগল না। বন্দীদশা বন্ধুদের জন্যে মারিয়ার জন্য দুশ্চিন্তা। ভালো লাগছিল না কিছু।
নদীর ওপারের বুনোরা ফ্রান্সিসদের হাত দড়ি দিয়ে বাঁধল। শুধু পিরেল্লোর হাত বাঁধা হল না। ওরা লড়াইয়ে আহতদের সঙ্গে নিল না। তবে ওদের আহত যোদ্ধাদের মোটা কাপড়ে চাপিয়ে নিয়ে চলল।
সবাই ইরা নদীর ধারে যখন পৌঁছল তখন রোদের তাপ বাড়ছে।
ইরা নদী ছোট নদী। তবে স্রোতের টান আছে। নদীতীরে দুটো লম্বাটে নৌকো। নৌকো দুটোয় দুজন মাঝি বসে আছে। ঢালু তীর দিয়ে সবাই নৌকোর কাছে এল। নৌকোয় উঠতে লাগল। শাঙ্কো উঠতে গিয়ে সমস্যায় পড়ল। কানের কাছে শুনলপিরেল্লোর কথা–দুহাতই বাধা। তুমি ওটা নিয়ে যেতে পারবে না। আমাকে দাও। শাঙ্কোর এবার পিরেল্লোর দিকে তাকাল। তারপর পাশে বসা যোদ্ধাদের ইঙ্গিতে জানাল বোঁচকাটা নিতে ওর অসুবিধে হচ্ছে। যদি সে নেয় তবে ও সহজে যেতে পারবে। যোদ্ধাটি কিছু বলল না। বোঁচকাটা নিল।
নৌকো পরপারে পৌঁছাল। এবার নামবার পালা। আস্তে আস্তে সবাই নেমে এল। হাত বাঁধা অবস্থায় নৌকোয় ওঠা নামা অত্যন্ত কষ্টকর। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি তোমাকে সাহায্য করবো।
-পারবেনা। তোমারও তো হাত বাঁধা। ভেবো না। ঢালুনদীতীর দিয়ে উঠতে পারবে।
–দেখ চেষ্টা করে। তুমি আমার পাশেই থাকবে। দুজনে চলল। বুনোরা অনায়াসে নদীর উঁচু তীরে উঠে গেল অল্পক্ষণের মধ্যে।
হঠাৎ হ্যারির পা ধুলো মাটিতে একটু ঢুকে গেল। হ্যারি আর দাঁড়াতে পারল না। ধুলো মাটিতে পড়ে গেল। ঢালু তীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। নদীর জলের কাছাকাছি এসে বুনো ঘাসের ঝোঁপের মধ্যে পড়ে নেমে গেল। বুনো যোদ্ধারা হেসে উঠল। ফ্রান্সিস নীচে নেমে চলল। হ্যারির কাছে এসে হ্যারির হাত ধরল। হাত টেনে বলল–চল–আমাদের উঠতে হবে। চলো। হ্যারির কোমরে হাত ধরে কিসে বলল–ওঠো। হ্যারি আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসও হ্যারির কোমরে চাপ দিয়ে হ্যারিকেউঠতে সাহায্য করতে লাগল। দুজনে তীরে উঠে এল। সবাই নদীতীরে জড়ো হল। দলপতির আদেশ হল। চলল সবাই।
বুনোদের গ্রামে এল। সেই কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি বাড়িঘর। ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল। ওরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। দরজায় জানালায় ওরা এসে দেখতে লাগল ফ্রান্সিসদের।
ফ্রান্সিসরা হাঁটতে হাঁটতে একটা বড় উঠোনমতো জায়গায় এল। জায়গাটার মধ্যে একটা বিরাট শিশু গাছের নীচে একটা বড় কাঠের আসন। দলপতি গিয়ে আসনটায় বসল। একটু হাঁপাতে লাগল। তারপর গলা চড়িয়ে আদেশ দিল কিছু। চার-পাঁচজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের দিকে এল। ওরা ফ্রান্সিসদের অন্য জায়গায় নিয়ে এল। এসময় পিরেল্লো এগিয়ে এল। দলপতিকে কিছু বলল। আঙ্গুল তুলে শাঙ্কোর হাতের বোঁচকাটা দেখাল। দলপতি আঙুল তুলে ইশারায় শাঙ্কোকে তার কাছে আসতে বলল। শাঙ্কো বুঝল সেটা। শাঙ্কো এগিয়ে দলপতির কাছে গেল। বোঁচকাটা দেখিয়ে পিরেল্লো দলপতিকে বললো। দলপতি হাত তুলে মাথা ওঠানাম করল।
দলপতি কি বলছে? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল পিয়েল্লোকে।
হেসে বলল–আমার জিনিস আমাকে ফেরৎ দেওয়া হবে।
না। সব জিনিস আমার। শাঙ্কো বলল।
–তুমি চোর। পিরেল্লো বলল।
–এইবার জিজ্ঞেস করি দলপতি যদি বোঁচকার ভেতর কী আছে সেটা দেখতে চায় তখন আপনি কী বলবেন? শাঙ্কো বলল।
–আঁ? হা হা মানে–পিরেল্লো–বলতে গিয়ে থেমে গেল।
–সোনার দেবমূর্তিগুলো দেখতে চাইলে আপনি বিপদে পড়বেন। আপনাকে স্ফকার করতে হবে যে পুরোহিত হিসেবে থাকায় আপনি অতি সহজে দেবমূর্তিগুলো চুরি করেছেন। কারণ সেটা আপনার পক্ষেই সম্ভব। পিরেল্লো ঘাবড়ে গেল। সত্যিই তো–দেবমূর্তিগুলো দেখলে দলপতির মনে এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।
–তা ঠিক। পিরেল্লো বলল।
এবার দলপতি শাঙ্কোকে জিজ্ঞেস করল–তুমি কি এই বোঁচকাটা পিরেল্লোর কাছ থেকে চুরি করেছে?
না। এই বোঁচকা আমার। শাঙ্কো বলল।
–রাজ পুরোহিতওতো বলছে এই বোঁচকা ওর। দলপতি বলল।
–তাহলে পিয়েল্লোকে জিজ্ঞেস করল। উনি বলুন বোঁচকায় কি কি জিনিস আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–রাজপুরোহিত বলুন তো আপনার বোঁচকায় কী কী জিনিস আছে। দলপতি বলল।
–আমি রাজপুরোহিত হিসেবে কাজ করে যাঅর্থসঞ্চয় করেছি এই বোঁচকায় রেখেছি। পিরেল্লো বলল।
এবার দলপতি শাঙ্কোকে জিজ্ঞেস করল তুমি বলো তো কী আছে বোঁচকায়?
-দামি কিছুই নয়। পুরনো কাপড়চোপড় আর একহাত পিঠে আর গোটা দশেক আপেল। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। দেখা যাবে। দলপতি একজন যোদ্ধাকে ইঙ্গিত করল। যোদ্ধাটি বর্শাটা মাটিতে রাখল। তারপর বোঁচকাটা শাঙ্কোর হাত থেকে নিয়ে খুলতে লাগল।
কাপড়ে জড়ানো সোনার মূর্তিগুলো দেখা গেল।
–রাজপুরোহিত-দলপতি পিরেল্লোকেজিজ্ঞেস করল–এই মূর্তিগুলো কি সোনার?
–আসল সোনার। পিরেল্লো বলল।
–আঁ? বলেন কী! দলপতি হাঁ করে দেবমূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
–ঠিকই বলেছি। পিরেল্লো বলল।
