–তোমরা বিদেশী। মূর্তি চুরির কথা তোমরা জানলেও কোন ক্ষতি নেই–এই ভেবে তোমাদের বলেছি। মিত্তাল বলল –যা হোক পুরুতমশাই। মূর্তিগুলো স্বস্থানে রেখে আসুন। চুরি ধরা পড়লে রাজা নিশ্চয়ই খোঁজাখুঁজি শুরু করবেন। প্রথমেই সন্দেহ করবেন আপনাকে। আপনার খোঁজ শুরু হবে। চুরির দায় আপনার ঘাড়ে চাপবে। তখন ধরা পড়লে আপনার নির্ঘাৎসি হবে।
–ঠিক আছে। তাহলে মিত্তাল এখন আমি কী করব? পিরেল্লো জানতে চাইল।
–চুরির ব্যাপারে কোন কথা কাউকে বলবেন না। দেবমূর্তিগুলো স্বস্থানে রেখে দেবেন। মিত্তাল বলল।
–ঠিক আছে। পিরেল্লো বলল।
স্থির হল পরদিন সকালে পিরেল্লোকে নিয়ে ফ্রান্সিসরা রওনা হবে রাজধানীর উদ্দেশ্যে।
সন্ধ্যে হল। ফ্রান্সিসরা বিকেলের খাবার খেল। দলপতি একজন যোদ্ধাকে বলল ফ্রান্সিসদের একটা ঘরে রাখতে। কথাটা ফ্রান্সিসদের বুঝিয়ে বলল পিরেল্লো। ভালো একটা ঘরে ফ্রান্সিসদের নিয়ে এল দুই যোদ্ধা। পিরেল্লোও ওদের সঙ্গে থাকতে এল।
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই অল্প অন্ধকারে শাঙ্কো দেখল কোনার দিকে কয়েকটিকলাগাছে পাকা কলার কাঁদি ঝুলছে। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে ওর ছোরা দিয়ে একটা কাঁদির অর্ধেক কাটল। সেই কাঁদি ওরা বোঁচকার ওপরে রাখল। যারা দেখবে তারা ভাববে বোঁচকায় কলা আছে। কারুর মনে কোন সন্দেহ হবে না। নিশ্চিন্তে চলাফেরা করা যাবে।
রাতের খাওয়ার সময় ফ্রান্সিসদের যোদ্ধারা ডেকে নিয়ে গেল। ঘরটায় ঢুকেফ্রান্সিসরা বুঝল এটা রান্না করার ও খাওয়ার ঘর।
ফ্রান্সিসদের শোয়ার ব্যবস্থা হল একটা ঘরে। ফ্রান্সিসরা খেয়েদেয়ে এসে ঐ ঘরে শুয়ে পড়ল। তখনও বর্শা হাতে যোদ্ধারা বাড়িঘর পাহারা দিতে লাগল। ফ্রান্সিস ওদের এত সতর্কভাবে পাহারা দেবার কী অর্থ বুঝল না। এত সাবধানতার কী কারণ বুঝল না।
তখন রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধুএকদল যোদ্ধা ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে।
হঠাৎ যোদ্ধাদের একটা ধ্বনি–আ-আ-আ। শোনা গেল তারপরেই অন্য একদলের চিৎকার। ফ্রান্সিসদের ঘুম ভেঙে গেল। ওরা উঠে বসল। ফ্রান্সিস বলল—পিরেল্লো–বাইরে চিৎকার চেঁচামেচির কারণ কী? পিরেল্লো উঠে বসল। বলল–পেছনেই ইরা নদী। নদীর ওপারে থাকে আর এক বুনো মানুষেরা। ওদের সঙ্গে এপারের বুনোদের ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে। শুধুঝগড়াঝাটিনয়। লড়াইও চলে। নদীর ওপারের বুনোরা আক্রমণ করেছে। লড়াই চলছে। মানুষের চিৎকার গোঙানি শোনা যাচ্ছে। ফ্রান্সিসকেহ্যারি বলল কী করবে?
–এখন ঘর থেকে বেরুলে বিপজ্জনক। আমরা বিদেশী। কোন দলের সঙ্গে আমাদের মিতালি নেই–একথা বলতে হবে। এখন দেখা যাক কারা জেতে। ফ্রান্সিস বলল।
–নদীর ওপারের বুনোরা দুর্ধর্ষ। ওদের হারানো মুস্কিল। পিরেল্লো বললেন।
লড়াই চলল। সেই সঙ্গে চিৎকার গোঙানি জোরে শ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ লড়াই চলল। তারপর আস্তে আস্তে পরিবেশ শান্ত হল। শুধু আহতদের আর্তস্ফর শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ ফ্রান্সিসদের ঘরের বন্ধ দরজাটায় দমাদম লাথি শোনা গেল। আবার এক দফা লাথি মারা শুরু হতেই অর্ধেকটা দরজা ভেঙে পড়ল। মশাল হাতে দুজন যোদ্ধা ছুটে এসে ঘরে ঢুকল। মশালের আলোয় ফ্রান্সিসদের দেখল। ফ্রান্সিসদের দেখে থমকে গেল। এই বিদেশী ভূতগুলি এখানে এল কী করে! আরও দুতিনজন যোদ্ধা ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস পিরেল্লোর দিকে তাকাল। দেখল, পিরেল্লোর মুখ শুকিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল পিরেল্লো কী ব্যাপার?
–ওরা নদীর এপারের বুনোদের দলপতিকে খুঁজছে। নদীর ওপারের বুনোদের জয় হয়েছে।
একজন যোদ্ধা এগিয়ে এসে মুখ বেঁকিয়ে কী বলল।
–পিরেল্লো? ফ্রান্সিস বলল।
পিরেল্লো বলল–জানতে চাইছে তোমরা এখানে কী করে এলে?
-বলো যে জাহাজ চালিয়ে এসেছি। পিরেল্লো বলল সেটা। এবার পিরেল্লো মারফৎ কথা চলল।
–তোমরা এখানে কেন এসেছো? লোকটি বলল।
–বেড়াতে, দেশ দেখতে। ফ্রান্সিস বলল।
–হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় তোমরা রাজা হানমের গুপ্ত ধনভাণ্ডার চুরি করতে এসেছে। লোকটি বলল।
–যাক গে–তোমরা ইরানদীর ওপারে আমাদের রাজ্যে বন্দী থাকবে। লোকটা বলল। পির্নেল্লোর দিকে তাকিয়ে বলল–আপনাকে চিনি। আপনি অলিকাস দেশের রাজ পুরোহিত। আপনাকে বন্দী করা হবে না।
–না না। আমাকেও বন্দী কর। পিরেল্লো বলল। আরো বলল–আমি এই বিদেশীদের সঙ্গেই থাকবো।
বেশ থাকবেন। লোকটি বলল। তবে বন্দীর মতো নয়। দুজন যোদ্ধা ঘরে ঢুকল। লোকটি মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানিয়ে কী বলল। লোকটিও কী বলল। পিরেল্লো মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস, এই লোকটা নতুন দলপতি। আগের দলপতিকে আমি চিনতাম। এরা লড়াইয়ে জিতেছে। এ পারের দলপতি কিছু যোদ্ধাসহ পালিয়েছে। তাদের ধরবার জন্যে ওপারের যোদ্ধারা ছুটোছুটি করছে। লক্ষ্য করে দেখ ইরা নদীর এপারে যারা থাকে তারা গোঁফ দাড়ি কামায় না। নদীর ওপারে যারা থাকে তারা গোঁফ দাড়ি কামায়।
দলপতি গলা চড়িয়ে হুকুম করল–এদের সবাইকে বন্দী করে নিয়ে চল। যোদ্ধারা কয়েকজন এগিয়ে এল ছোট দড়ি হাতে। দলপতি পিরেল্লোকে বন্দী করতে মানা করল।
ফ্রান্সিসদের ঘরের বাইরে আনা হল। ফ্রান্সিস মৃত ও আহত এপারের যোদ্ধাদের দেখল। ওদের মধ্যে জীবিত আহতদের বন্দী করা হল। পিরেল্লো ছাড়া ফ্রান্সিসদের হাতও বাঁধা হল। ফ্রান্সিস মনে মনে ভাবল–আবার কষ্টের দিন দুঃখের দিন শুরু হল। কবে মুক্তি পাওয়া যাবে কে জানে। এরা মুক্তি দেবে সে আশা নেই। নিজেদের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেদেরই করে নিতে হবে।
