যাই হোক–গুপ্তধন আপনি উদ্ধার করতে পারবেন না। অত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি আপনার নেই। তবু দেখুন চেষ্টা করে। শাঙ্কো বলল।
–চেষ্টা তো করি। দেখি। এবার তোমাদের কয়েদঘরে ঢোকানো হবে। পিরেল্লো বললেন। পিরেল্লো বুনোদের ভাষায় কী বললেন গলা তুলে। কয়েকজন যোদ্ধা এগিয়ে এল। দাঁড়াল ফ্রান্সিসদের সামনে। ওরা ইঙ্গিত করল কয়েদঘরে ঢোকার জন্যে। শাঙ্কো বলল–কী করবে ফ্রান্সিস?
–যা করতে বলছ কর। সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা এগিয়ে চলল যোদ্ধাদের নির্দেশমতো। কয়েদুঘরের কাছাকাছি এসেছে তখন বোঁচকা কাঁধে পিরেল্লো ওদের কাছে এল। হেসে বলল–এবার রাজা হানমের গুপ্তধনের স্বপ্ন দেখোগে। ঐ স্বপ্ন দেখতে দেখতেই একদিন মরে যাবে। গুপ্তধন আর পাওয়া যাবে না।
ফ্রান্সিসরা কিছু বলল না। শাঙ্কো এক কাণ্ড করল। ও পিরেল্লোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিরোল্লোর বোঁচকা এক হ্যাঁচকা টানে নিয়ে নিল। বোঁচকা ছুঁড়ে ফেলল কয়েদঘরের মধ্যে। পিরেল্লো পর্তুগীজ ভাষায় চিৎকার করে–চোর, চোর–আমার বোঁচকা চুরি করেছে। যোদ্ধারা কয়েদঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। পিরেল্লোর কথা ওরা কিছুই বুঝল না।
এবার পিরেল্লো নিজেই কয়েদঘরের সামনে এল। বারবার বলতে লাগল–আমার বোঁচকা ফিরিয়ে দাও।
তার আগে আমি দলপতির সঙ্গে কথা বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। সে ব্যবস্থা আমি করে দেব। দলপতি এই উঠোনেই গাছের বাকলের বিছানায় দিনরাত শুয়ে থাকে। অবশ্য কখনও কখনও উঠে বসে। সে অল্পক্ষণ। তারপরেই শুয়ে পড়ে।
–দলপতি কোথাও যায় না? হ্যারি জানতে চাইল।
দলপতি যখন বসে থাকে তখনই আমাকে কথা বলিয়ে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তার আগে আমার বোঁচকাটা দাও। পিরেল্লো বলল।
না। আগে দলপতির সঙ্গে কথাবার্তা, তারপর। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি তারপর–পিরেল্লো বললেন।
–হ্যাঁ, তারপর যা কিছু ঘটুক। ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরে খাবার দিল অন্য লোকেরা এনে। একটা বড় শুকনো পাতায় রুটির মতো কিছু সঙ্গে তারকারি আর পুঁটি মাছের মতো মাছ। বরাবরের মতো ফ্রান্সিস বলল–পেটপুরে খাও। খেতে ভালো না লাগলেও খাও। শরীরের শক্তি ঠিক রাখো।
খাওয়া শেষ। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল কখন দলপতি উঠে বসে। একসময় দেখল উঠানের বিছানা ছেড়ে দলপতি উঠে বসেছে। পিরেল্লো কাছেই ছিল। ছুটে কয়েদঘরের সামনে এল। বলল, দলপতি উঠে বসেছে। চলো। একজন পাহারাদারকে বলল-দরজা খুলে দাও। পাহারাদার দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিস আস্তে বলল–হ্যারি থাকো। শাঙ্কো বোঁচকা নিয়ে আমার সঙ্গে এসো।
দুজনে কয়েদঘরের বাইরে এল। শাঙ্কোর মাথায় বোঁচকা। পিরেল্লো ছুটে এল। বলল বোঁচকাটা আমাকে দাও। শাঙ্কো এক ধাক্কায় ওকেসরিয়ে দিল। পিরেল্লো তবুপিছু ছাড়লনা।
তিনজনেই দলপতির কাছে এল। পিরেল্লোমুখ নিচু করে দলপতিকে কী বলল। দলপতি মুখ তুলে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। কিছু বলল। কিন্তু ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝতে পারল না। পিরেল্লোকে বলল–আপনি দলপতিকে কী বললেন। উনিই বা আমাকে কী বললেন?
–আমি বললাম–তোমরা চোর। আমার বোঁচকা নিয়ে পালাবার জন্যে চেষ্টা করছ।
এইসময় একজন দাড়ি গোঁফ কাটা লোক এল। উঠোনে এসেদাঁড়াল। তারপরদলপতির পাশে এসে বসল। দলপতিকে কী বলল। দলপতি মাথা ঝাঁকাল। দলপতি আর আগত লোকটি কথাবার্তা বলতে লাগল। পিরেল্লোকে দেখে বলল–ভাঙা ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায়। লোকটি বলল–কী ব্যাপার পুরুতমশাই। আপনি এখানে কেন?
–আমি সমস্যায় পড়েছি। পিরেল্লো প্রায় কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল।
কী সমস্যা? লোকটি বলল।
ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বলল–এরা আমার বোঁচকা চুরি করেছে।
ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে লোকটি বলল–আপনারা–চুরি–পুরুতমশাই বলছেন।
–আমরা চুরি করিনি। কেড়ে নিয়েছি। শাঙ্কো বলল।
–কিন্তু কেন? লোকটি বলল।
–আমরা চুরি করা জিনিস কেড়ে নিয়েছি। শাঙ্কো বলল।
–তাহলে–পুরুতমশাই–চুরি।
বাজে কথা–মিত্তাল। আমি চুরি করিনি।
রাজামশাই আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে দিয়েছেন। পিরেল্লো বললেন।
ফ্রান্সিস বলল–অসম্ভব। শায়িত দেবতাদের মূর্তি কখনো রাজা বিকিয়ে দেবেন না। পিরেল্লো চুরি করেছেন।
–সেই মূর্তিগুলো কোথায়? মিত্তাল জানতে চাইল।
–শাঙ্কো–মূর্তি বের কর। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো বোঁচকা খুলে একটা মূর্তি বের করল। ফ্রান্সিস সেটা নিয়ে মিত্তালকে দিল। দলপতিও মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইল। মিত্তাল মূর্তিটা কপালে ঠেকাল। দলপতির হাতে দিল। দলপতিও মূর্তিটা কপালে ঠেকাল। তারপর মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইল। সোনার জিনিস সম্পর্কে দলপতির কোন ধারণাই নেই। দলপতি মিত্তালকে কী বলল। মিত্তালও দলপতিকে কিছু বলল। ফ্রান্সিসরা বুঝল না।
এটা আপনাদের উচিৎ হয়নি। মিত্তাল বলল।
পিরেল্লো বলল–আমি তো বললাম, রাজা আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে এই মূর্তিগুলো আমাকে দিয়েছেন।
-এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যেখানে হাজার হাজার দেশবাসীরা পুতপবিত্র দেবমূর্তিগুলো পুজো করে নৈবেদ্য দেয়। সেই দেবমূর্তিগুলো রাজা কামবহনা আপনাকে কে পুরস্কারস্বরূপ দেবেন–এটা অসম্ভব। তাছাড়া আমাদের জাহাজে যখন আশ্রয় নিতে এসেছিলেন তখন মূর্তি চুরি করেছেন একথাই বলেছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
