ঠিক আছে। তোমরা কী বলতে চাও। রাজা ফ্রান্সিসকে জিগ্যেস করলেন।
আমাদের যদি আপনার রাজত্বের যেখানে খুশি যাওয়ার অনুমতি দেন তবে আমরা সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারবো।
বলো কি! রাজা বেশ আশ্চর্য হলেন। বললেন, তোমরা পারবে?
এখনই খুব জোর দিয়ে বলতে পারছি না। এক সপ্তাহের মধ্যে সব দেখেশুনে বিচার বিবেচনা করে সঠিক বলতে পারব ঐ ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পারব কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ, সেই চেষ্টা কর, আর তোমাদের স্বাধীন গতিবিধির জন্যে সেনাপতিকে বলে দিচ্ছি। রাজা বললেন।
মহামান্য রাজা, আর একটা নিবেদন। ফ্রান্সিস বলল।
বলো কী নিবেদন। রাজা জানতে চাইলেন।
আলকাবা বন্দরে আমাদের জাহাজ নোঙর করে আছে। অতদূর থেকে যাতায়াত করা অসুবিধেজনক। এখানে আপনার প্রাসাদে যদি একটা ঘরে আমাদের থাকতে দেন তাহলে খুবই ভালো হয়। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ। রাজা বললেন। তারপর ইশারায় সেনাপতিকে ডাকলেন। সেনাপতি আসন ছেড়ে দ্রুত রাজার কাছে এলেন। রাজা ফ্রান্সিসদের ব্যাপারে সেনাপতিকে সব বললেন। সেনাপতি রাজার কথা শুনে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বললে আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।
ফ্রান্সিসরা আবার রাজাকে সম্মান জানিয়ে রাজসভা থেকে বেরিয়ে এল। রাজবাড়ির বাইরে বিরাট মাঠ, কয়েকজন অশ্বারোহী সৈন্য সেই মাঠে ঘোড়া চালানো অভ্যেস করছিল। সেনাপতি একজনকে ডাকলেন। সৈনিকটি কাছে এলে সেনাপতি বললেন। এই তিনজন ভাইকিং-এর থাকবার মতো একটা ভালো ঘর দেখ। এদের সেখানে নিয়ে যাও। সেনাপতি রাজপুরোহিত পিরেল্লোকে বললেন, আপনার তো কোনো ঘরের প্রয়োজন নেই।
না-না। আমার থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধে নেই। পিরেল্লো বললেন।
যাও। সেনাপতি বলল।
সৈন্যটি ফ্রান্সিসদের একটা ঘরের সামনে নিয়ে এল। বলল, এই ঘরটা খুবই ভালো। এখানেই আপনারা থাকবেন।
ফ্রান্সিস, শাঙ্কো ও হ্যারি ঘরটায় ঢুকল। সত্যিই বেশ খোলামেলা সুন্দর ঘর। মেঝেয় খড়ের বিছানা। ফ্রান্সিস বসে পড়ল। শাঙ্কো, হ্যারিও বসল। সৈন্যটি বলল, খাওয়ার সময় আপনাদের ডেকে নিয়ে যাবো। মাননীয় সেনাপতি আমাকেই দায়িত্ব দিয়েছেন আপনাদের দেখাশোনার জন্যে। কোনো প্রয়োজন পড়লে আমাকে ডাকবেন।
সৈন্যটি চলে গেল।
এতক্ষণ পিরেল্লো দেবমূর্তি ভরা বোঁচকাটা কাঁধে নিয়ে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। ওঁর ভয় ফ্রান্সিস না সেনাপতিকে বলে দেয় যে তিনি চোর। দেবমূর্তি চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছিলেন। দেখলেন ফ্রান্সিস কাউকে কিছু বলল না।
এবার ফ্রান্সিস পিরেল্লোকে বলল, দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা যাব মন্দিরে। দেবমূর্তিগুলো যেখানে ছিল সেখানেই রাখা হবে।
কী, রাজি তো? শাঙ্কো বলল।
হ্যাঁ-হ্যাঁ তাই চলুন। পিরেল্লো বললেন।
দুপুরের খাবার খেয়ে দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল সবাই।
মন্দিরে চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
চলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি। পিরেল্লো বললেন।
পিরেল্লো পুবমুখো চললেন। সবাই যেতে লাগল। রাজারবাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ওরা হাঁটতে লাগল। সূর্যের আলো চড়া। ওরা ঘেমেনেয়ে উঠল। কিন্তু যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। হ্যারি জিজ্ঞেস করল–ও ঠাকুরমশাই আর কতদূর যেতে হবে?
–আর একটুখানি। যে বলটা দেখা যাচ্ছে–ওটার মধ্যেই মন্দির।
হাঁটতে হাঁটতে বনের কাছে এল ওরা। ঘন ঘন গাছপালা নয়, বেশছাড়া ছাড়া গাছগাছালি। বনের মধ্যে ঢুকল সবই। সূর্যাস্ত হতে বেশী দেরি নেই। বনের নীচে অন্ধকার জমেছে।
মন্দির কোথায়? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–এই সামনেই। পিরেল্লো বললেন।
হঠাৎ সামনেই দেখা গেল গাছ কেটে এক উঠোনমতো জায়গা। চারধারে বাড়িঘর। পাতায় ছাওয়া। গাছের কাটা ডাল দিয়ে তৈরি বাড়ি। উঠোনমতো জায়গায় গাছের ছাল বিছোনো। তার ওপর এক বৃদ্ধ বসে আছে। হঠাৎ পিয়েল্লো গলা চড়িয়ে কী বলে উঠল। বাড়িঘর থেকে বন থেকে বেশ কিছু লোক ছুটে এল। তারা ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি–পিরেল্লো বিশ্বাসঘাতক।
পিরেল্লো গাছের ছালের ওপর বসা লোকটির কাছে গেলেন। কী কথাবার্তা বলল দুজনে। ফ্রান্সিসরা দেখল-লোকগুলোর চেহারা একটু অদ্ভুত। মাথায় টানটান বাঁধা চুল। গালে লালচে রঙের দাড়ি গোঁফ। চোখগুলো বেশ গোল গোল। কারো কারো হাতে বর্শা।
পিরেল্লো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। সেই মাটিতে বসা লোকটিকে দেখিয়ে বলল– উনিই এদের দলপতি। এরা বুনো। ভীষণ হিংস্র। আমার ওপরে খুব ভক্তি।
তাহলে এখানে মন্দির নেই। শাঙ্কো বলল।
পিরেল্লো দাঁত বের করে হাসল। বললনা। আপনাদের চারপাঁচদিন এখানে আটকে রাখার জন্য এনেছি। আমি কথাবার্তা শুনেই বুঝতে পেরেছি শুধু আপনারা আপনাদের রাজা হানমের গুপ্তসম্পদ খুঁজে বের করতে পারবেন। কাজেই আপনাদের কোনভাবে গুপ্তধন উদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হবে না। আমিই দুজন ভক্ত নিয়ে ঐ গুপ্তধন উদ্ধার করবো।
–ভালো কথা। ফ্রান্সিস বলল–আপনারাই যদি উদ্ধার করতে পারেন তাহলে আমাদের ওপর সেই ভার দিতে চাইছিলেন কেন?
–বাজিয়ে দেখছিলাম। পিরেল্লো হেসে বললেন।
–কী দেখলেন। হ্যারি বলল।
–আপনারা গর্দভ।
–তা ঠিক। নইলে জানা নেই। শুনো নেই আপনাকে বিশ্বাস করে বসলাম।
–আমরা মানুষকে বিশ্বাস করে থাকি। আমরা ইচ্ছে করলে আপনাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারতাম। কিন্তু আমরা করিনি। কারণ আপনি চোর হলেও আমাদের আশ্রয়প্রার্থী। কি তাই আপনাকে বাঁচালাম।
