ছড়াটা মনে আছে আপনার? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।
হা। পিরেল্লো বললেন।
শোনান তো ছড়াটা। ফ্রান্সিস বলল।
পিরেল্লো বললেনঃ
ছোট্ট সাজের ঘরে।
রেখেছি বড় আদরে।
ধনসম্পদ কার তরে?
বুদ্ধিমান উদ্ধার করে।
বোকারা হা-হুঁতাশ করে।
ফ্রান্সিস বলল, সহজ ছড়া। ধনসম্পদের কথা বলা হয়েছে। সেই গুপ্ত ধনসম্পদ উদ্ধারের জন্যে এই ছড়াটা খুব কাজে লাগবে বলেই মনে হয়।
আমারও তাই মনে হয়। পিরেল্লো বললেন।
এই ছড়াটা পাওয়ার পর আপনি কি পুজোর ঘরে, সাজঘরে খোঁজাখুঁজি করেছিলেন?
হা। কিন্তু কোনো হদিস করতে পারিনি। পিরেল্লো বললেন।
আপনি দেবতার মূর্তি চুরি করে পালাতে চাইছেন কেন? হ্যারি বলল।
কতদিন এই বিদেশে পড়ে আছি। ভালো লাগছিল না। শুধু পর্তুগাল চলে যেতে মন চাইছিল।
দেবতার মূর্তিগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন কেন? ফ্রান্সিস বলল।
মূর্তিগুলো নিখাদ সোনায় তৈরি। বিক্রি করলে খুব ভালো দাম পাবো এই আশায়। পিরেল্লো বললেন।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল, এঁকে নিয়ে কী করবে?
এখানকার রাজা কানবহনার কাছে ওঁকে নিয়ে চল। দেবতার মূর্তির কথা বলব। মূর্তিগুলো পেলে রাজা যা করতে চাইবেন করবেন। এ দেশের যা বিচার তাই-ই হবে। একটা চোরের সঙ্গে আমরা কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। হ্যারি বলল।
তাহলে সকালের খাবার খেয়ে রাজসভায় চলো। ফ্রান্সিস বলল।
ঠিক আছে, তাই চলো। হ্যারি বলল।
খাওয়া-দাওয়ার পর হ্যারি পিরেল্লোকে বলল, আমাদের রাজসভায় নিয়ে চলুন।
পিরেল্লো হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন, এই দেশের যা আইন তাতে যে অপরাধ আমি করেছি তার জন্য ফাঁসি দেওয়া হবে। আমাকে রাজার কাছে নিয়ে যাবেন না।
এছাড়া উপায় নেই। হ্যারি বলল। পিরেল্লো কাঁদতে লাগলেন।
পিরেল্লো দেবতার মূর্তি-বোঝাই পোঁটলাটা কাঁধে নিলেন। ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো এগিয়ে এল।
দড়ির মই বেয়ে চারজনে জাহাজের সঙ্গে বেঁধে রাখা ছোট্ট নৌকোয় নেমে বসল। ফ্রান্সিস বৈঠা বাইতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই নৌকো তীরে পৌঁছল।
তীরে উঠল সবাই। পিরেল্লো পশ্চিমমুখে হাঁটতে লাগলেন।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ওরা রাজবাড়ির সামনে এল।
রাজবাড়ির সামনে বেশ ভিড়। ফ্রান্সিসরা বিচারসভার ঘরের সামনে এল। ফ্রান্সিস পিরেল্লোকে বলল, আমাদের ভেতরে নিয়ে চলুন।
দরজায় পেতলের বর্শা হাতে দুই প্রহরী দাঁড়িয়ে। ওরা পিরেল্লোকে দেখে মাথা একটু নোয়াল। পিরেল্লো ওদের সঙ্গে কথা বলে ফ্রান্সিসদের বললেন, আসুন।
চারজনে রাজসভায় ঢুকল। পাথর দিয়ে তৈরি ঘরের ভেতরটা বেশ অন্ধকার অন্ধকার। রাজা কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। সিংহাসনের গদিটা পাখির পালক দিয়ে তৈরি। দু’পাশে মন্ত্রী, সেনাপতি ও অমাত্যরা। পিরেল্লো তখন প্রায় কাঁদতে শুরু করেছেন। চাপা গলায় বারবার বলছেন, আমাকে চলে যেতে দিন। নইলে আমাকে রাজা মৃত্যুদণ্ড দেবেন।
উপায় নেই। অভিযুক্ত হলেও রাজা আপনাকে মুক্তি দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
অসম্ভব। আমার নিশ্চিত মৃত্যু। পিরেল্লো বললেন।
দেখা যাক। তবে মূর্তিগুলো ফেরৎ পেলে রাজা খুশিই হবেন। হয়তো আপনাকে # সাধারণ শাস্তি দেবেন।
না-না। আমাকে মরতে হবে। পিরেল্লো কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন।
বললাম তো দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি ডাকল, ফ্রান্সিস।
বলো।
দেখ এই আলকাবা দেশ আমাদের কাছে বিদেশ। এখানে কে কী চুরি করল সেসব ব্যাপারে আমরা জড়াব কেন?
তাই বলে একটা চোরকে জেনে-শুনে পালাতে দেব? ফ্রান্সিস বলল।
এ-ব্যাপারে আমাদের না জড়ানোই ভালো। তুমি পিরেল্লোকে ছেড়ে দাও। উনি যেখানে যেতে চান যান।
ফ্রান্সিস পিরেল্লোকে বলল, আপনিও এটাই চান?
হা। একবার আমার ব্যাপারটা রাজার কানে গেলে আমার রেহাই নেই।
আপনি যে মূর্তিগুলো চুরি করেছেন সেসব ঠিক জায়গায় রেখে দেবেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
নিশ্চয়ই রেখে দেবো। পিরেল্লো বললেন।
আমাদের ধোঁকা দিয়ে মূর্তি নিয়ে পালাবেন না তো? হ্যারি বলল।
না-না। আপনারা যা বলবেন আমি তাই শুনবো।
ঠিক আছে। এবার আমি রাজার সঙ্গে কথা বলবো। আপনি ব্যবস্থা করে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
দেখছি। বলে পিরেল্লো এগিয়ে গেলেন। একজন বৃদ্ধ অমাত্যের কাছে গিয়ে মুখ নিচু করে কী বললেন। বৃদ্ধ অমাত্যটি আসন থেকে উঠে রাজার কাছে গেলেন। রাজাকে কী বললেন। রাজা মাথা নেড়ে সায় দিলেন। যিনি বিচারপ্রার্থীদের নাম ডাকছিলেন বৃদ্ধ অমাত্য তাকে ডেকে কিছু বললেন। তিনি এবার ডাকলেন, রাজপুরোহিত যাঁদের নিয়ে এই সভায় এসেছেন তারা এগিয়ে আসুন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজার কাছে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা মাথা একটু নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজা খুশি হলেন। বললেন, শুনলাম তোমরা বিদেশী।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা জাতিতে ভাইকিং। আপনার রাজপুরোহিতের সঙ্গে আমাদের হঠাই পরিচয় হয়েছে। তিনি জানালেন আপনাদের একমন্দিরে নীচের ঘরে রাজা হানম ধনসম্পদ গোপনে রেখে গেছেন।
আমাদের বংশের অনেকেই সেই ধনভাণ্ডার খুঁজেছিলেন। কিন্তু কেউ উদ্ধার করতে পারেননি।
পিরেল্লোর গুরুদেব রাজপুরোহিত হোমক মৃত্যুর পূর্বে পিরেল্লোকে চামড়ার ওপর লেখা একটা ছড়া দিয়ে গিয়েছিলেন।
পিরেল্লো তো এ-কথা আমাদের বলেননি। রাজা পিরেল্লোর দিকে তাকিয়ে বললেন।
মান্যবর রাজা, আমি ঐ ছড়াটার কোনো গুরুত্ব দিইনি। পিরেল্লো বললেন।
