ফ্রান্সিস রেগে গেল, চোর আপনি। কোনো চোরকে আমরা আমাদের জাহাজে আশ্রয় দিইনা।
তাহলে আমার মূর্তিগুলো রেখে আমাকে তাড়িয়ে দেবেন?
আমি চোরের ওপর বাটপাড়ি করি না। এই মূর্তির সঠিক মালিক আলকবার রাজা। মূর্তিগুলো তাকেই দিয়ে দেব। আরআপনি মূর্তিগুলো চুরি করেছেন এটাও বলব। তারপর রাজা যা করার করবেন।
বিস্কো একটা বোঁচকা কাঁধে করে ফিলে এল।
তখন ভোর হয়েছে। সূর্যের আলো পড়েছে জাহাজে, সমুদ্রের জলে, আকাশে। চারদিক ঝলমল করছে।
ফ্রান্সিস বোঁচকা থেকে একটা মূর্তি বের করল। কী সুন্দর মূর্তি। ফ্রান্সিসরা অবাক হয়ে দেখল মূর্তির মাথায় মুকুট, গায়ে নানারকম কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি আলখাল্লা। বাকি। মূর্তিগুলো আর খোলা হল না।
ফ্রান্সিস রাজপুরোহিতকে জিগ্যেস করল, বলুন, এখন আপনি কী করতে চান?
এই সাতটি মূর্তি নিয়ে আপনাদের জাহাজে চড়ে পালাব।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল, হ্যারি কী করবে বল।
হ্যারি বলল, দেখুন রাজপুরোহিত, আমরা আগেই বলেছি কোনো চোরকে আমরা আশ্রয় দিই না। আপনাকেও আশ্রয় দেওয়া হবে না। আপনি একটু ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় কথা বলছেন। আপনি এ দেশের অধিবাসী নন। তাহলে আপনি কি করে এখানে এলেন? আর কিভাবেই বা রাজপুরোহিত হলেন?
আপনার অনুমান ঠিক। আমি পর্তুগীজ। দাস-ব্যবসায়ীদের হাতে ধরা পড়েছিলাম। এক দুঃসহ পরিবেশে জাহাজের নীচের খোলে বন্দী হয়ে ছিলাম। আমাদের দলনেতার নির্দেশে এক রাতে আমরা বিদ্রোহ করলাম। লোহার গরাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম একসঙ্গে। একটা লোহার গরাদ আমাদের চাপে নড়ে গেল। ঐ গরাদের ওপরেই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলাম। গরাদটা খুলে গেল। আমরা নিরস্ত্র। দাস-ব্যবসায়ীর রক্ষীরা আমাদের আটকাতে চেষ্টা করল। আমরা ওদের হাত থেকে তরোয়াল ছিনিয়ে নিলাম। ওদের সঙ্গে লড়াই করলাম। অনেক রক্ষী মারা গেল। আমাদের মধ্যেও অনেকের মৃত্যু হল। আমি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। রাতের অন্ধকারে সাঁতরাতে-সাঁতরাতে তীরে এলাম। একটু থেমে আমার বলতে লাগলেন, তীরভূমির চারদিকে তাকিয়ে অন্য বন্দীদের কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি বালিয়াড়ির ওপর শুয়ে রইলাম। ক্রমে ভোর হল। চারদিকে আলো ছড়াল। বারবার চারপাশে দেখলাম। সঙ্গীরা বোধহয় দূরে কোথাও তীরে উঠেছে। যাই হোক, এভাবেই আমি আলকাবায় এলাম।
পিরেল্লো থামলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের শুরু করলেন, বেলা বাড়ল। জন বসতিতে এলাম। খিদেয় পেট জ্বলছে। একপাত্র জলও খেতে পারিনি। একটা ঘর দেখলাম। অন্যরকম। নারকেলপাতার ছাউনি। দেয়াল কাঠ কেটে তৈরি। মেঝে মাটির।
ঘরটার দরজায় টোকা দিলাম। পর্তুগীজ ভাষায় বললাম, আমি খুব ক্ষুধার্ত। কিছু খেতে দিন। একবার দু’বার বললাম। ভিতর থেকে গম্ভীর গলায় কে পর্তুগীজ ভাষায় বললেন, চলে এসো। দরজা খোলা।
আমি ঘরটায় ঢুকলাম। অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে দেখি একজন বয়স্ক লোক গাছের। ডাল কেটে তৈরি বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর মাথার চুল, দাড়ি, গোঁফ সব সাদা। লোকটি বলল, ডানদিকে দেখ একটা টেবিল। তাতে খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। যতটা খেতে পারো খাও।
কথামতো আমি টেবিলটার কাছে গেলাম। সেটাও বিছানার মতো গাছের ডাল কেটে করা। তার ওপর ঢাকা দেওয়া কয়েকটি মাটির পাত্র। ঢাকনা খুলে দেখলাম কিছু রুটি। অন্যটায় মাছের ঝোল। অন্য দুটো পাত্রে ভাজা-টাজা।
আমি খেতে বসে গেলাম। খাচ্ছি, তখন বৃদ্ধ বললেন, তুমি পর্তুগীজ?
হ্যাঁ।
এখানে কি করে এলে?
আমি তাকে সব বললাম। ক্রীতদাস বেচাকেনার হাটে আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমরা কি করে পালিয়ে এসেছি শুনে উনি বললেন, এখানে থাকবে স্থির করেছো?
হা। উপায় কী?
কিন্তু তুমি তো পর্তুগীজ। এখানকার ভাষা জানো না। কী করবে তুমি?
আসার সময় দুপাশে দেখেছি তুলার খেত। সেসব খেতেই কোনো কাজ নেব। আমি বললাম।
দরকার নেই। একটা কথা, তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি?
নিশ্চয়ই পারেন। আমি বললাম।
তাহলে শোন, আমি রাজপুরোহিত হোমক। তুমি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করবে? রাজি?
হ্যাঁ, রাজি। আমি সাগ্রহে উত্তর দিলাম।
হোমক আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠলেন। বললেন, তুমি এখানকার পূজিত সাতটি দেবতার কথা জানো না?
না। আমি বললাম।
ঠিক আছে। আমি সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নেব। আমি মন্দিরেতাদের পুজো করতে যাচ্ছি। তুমি এখানেই থাকবে। খিদে পেলে আরো খাবে। আমি কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসছি।
হোমক বেরিয়ে গেলেন।
তারপর? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
তারপর হোমকের শিষ্য হয়ে আমি তাকে পুজোর সময় সাহায্য করতে লাগলাম। আমার থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধেই আর হল না। আমার পুরোহিতের কাজ শেখা হয়ে গেল। হঠাৎ হোমক অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আমিই পুজোর কাজ চালাতে লাগলাম। রাজবৈদ্য হোমকের চিকিৎসা করতে লাগলেন। কিন্তু তাকে সুস্থ করতে পারলেন না। রাজ পুরোহিত হোমক মারা গেলেন।
এবার এখানকার রাজা কানবহনা আমাকে রাজপুরোহিত করলেন। প্রতিদিন রাজপুরোহিতের কাজ করে আমার বেশ ভালোই দিন কাটছিল।
ফ্রান্সিস বলল, এই সাতটি দেবতারই পুজো করতেন আপনি?
হা। রাজপুরোহিতের সব দায়িত্বই আমি পালন করতাম। একটা কথা বলা হয়নি। যে রাতে হোমকমারা যান সেই রাতে হঠাই আমাকে হাতের ইশারায় বিছানার কাছে যেতে বললেন। আমি গেলাম। উনি আমাকে কান পাততে বললেন। আমি মাথা নিচু করলাম। থেমে থেমে উনি বললেন, আমার লতাপাতায় তৈরি বাটায় একটা চামড়ার টুকরো পাবে। তাতে অতীতের এক রাজা-রাজা হানম, যিনি এই মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন তিনি প্রাচীন স্প্যানিশ ভাষায় লিখে গেছেন একটা ছড়া।
