ফ্রান্সিস আর মারিয়া জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। মারিয়া সূর্যাস্ত দেখছিল। প্রতিদিন জাহাজের ডেকে এসে মারিয়া সূর্যাস্ত দেখে। সমুদ্রে বিরাট বিরাট ঢেউ। তারই মাথায় সূর্য নেমে এসেছে। পশ্চিম দিককার আকাশে কত রঙ ফুটে উঠছে। সূর্যকে ঘিরে লাল আলোর বলয় যেন। আস্তে আস্তে সেই আলো মিলিয়ে গেল। নামল অন্ধকার।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। সঙ্গে শাঙ্কো। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস, এখন কী করবে? বন্দরে জাহাজ ভেড়াবে, নাকি বন্দর ছাড়িয়ে চলে যাবে?
ঠিক বুঝতে পারছি না কোথায় এলাম। এটা তো সবার আগে জানা দরকার। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে তো বন্দরে গিয়ে জাহাজ নোঙর করতে হয়।
তাই করব। তারপর বন্দরে নেমে খোঁজখবর নেব। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে ফ্লেজারকে গিয়ে বলি। হ্যারি বলল।
যাও।
কিছু পরে ফ্রেজার এল। বলল, ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?
জাহাজ বন্দরের কাছে নিয়ে চল। নোঙর কর। জাহাজ থেকে নেমে এই বন্দরের নাম জানতে হবে। এটা কোনো দ্বীপ না দেশ জানতে হবে। তাহলেই বুঝব আমরা কোথায় এলাম। এখান থেকে আমাদের দেশই বা কতদূর!
বেশ। জাহাজ নোঙর করছি। ফ্লেজার বলল।
ফ্লেজার জাহাজের গোল হুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জাহাজটা জাহাজঘাটার কাছে নিয়ে এল। নোঙর করল।
সন্ধ্যের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গেনিয়ে জাহাজে পাতা কাঠের পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজঘাটায় উঠল।
বন্দরটা খুব ছোট না। বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। সেই আলোয় দেখলবাজার মতো এলাকা। ফলটল, জামাকাপড়, দড়ি, পালের কাপড় বিক্রি হচ্ছে।
কাছের দোকানের সামনে এল। দোকানিকে ভাঙা ভাঙা তলতেক ভাষায় বলল, এই দেশের নাম কী? দোকানি বুঝল না। বলল, বুঝতে পারছি না। এবার হ্যারি হাত-মুখ, নেড়ে বোঝাল এই জায়গার নাম কী? এবার দোকানি বুঝল। বলল, আলকাবা। কিন্তু শুধু এইটুকু জেনে তো আন্দাজ করা যাবে না ইউরোপ কতদূর।
কিছুক্ষণ বাজার এলাকায় ঘোরাঘুরি করে দুজনে জাহাজে ফিরে এল। বন্ধুরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল, বিশেষ কিছু খবর পেলাম না। শুধুজানলাম এ দেশের নাম আলকাবা। মা মেরিই জানেন ইউরোপ থেকে কতদূরে আছি আমরা।
এখানেই ঘোরাঘুরি করি। নিশ্চয়ই হদিস পাব। তখন দেশের দিকে যাত্রা করবো। হ্যারি বলল।
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। ফ্রান্সিস কেবিনঘরে এল। মারিয়া বলল, তাহলে কী ঠিক করলে।
এই এলাকায় ঘোরাঘুরি করে জানতে হবে ইউরোপ কোনদিকে। এখান থেকে কতদূর? তারপর দিক ঠিক করে নিয়ে জাহাজ চালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো আর ওর দু’তিনজন বন্ধু ডেকে উঠে এল। ওখানেই শুয়ে পড়ল। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ, জোর হাওয়া ছুটেছে। শাঙ্কোরা ঘুমিয়ে পড়ল।
শেষ রাতের দিকে হঠাৎ কিসের শব্দেশাঙ্কোর ঘুম ভেঙে গেল। ও কান খাড়া করল। হালের দিকে অস্পষ্ট শব্দ। শাঙ্কো নিঃশব্দে সিঁড়িঘরের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। একটু পরেই দেখল হাঁটুঝুল চিত্রবিচিত্র আলখাল্লা মতো পরা একজন বয়স্ক লোক নীচে নামার সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে। নিঃশব্দে। লোকটির আলখাল্লা ভেজা নয়। তাহলে বয়স্ক লোকটি নৌকোয় চড়ে এসেছে।
শাঙ্কো দ্রুতপায়ে এসে লোকটির সামনে দাঁড়াল। লোকটি বেশ চমকেই উঠল। শাঙ্কো বলল, আপনি কে?
লোকটি আস্তে আস্তে বলল, আমি রাজপুরোহিত পিরেল্লো।
আমাদের জাহাজে কীভাবে এলেন?
গাছের গুঁড়ি কুঁদে বানানো আমার নৌকোয় চড়ে।
কেন এলেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
তোমরা কারা? পিরেল্লো জিগ্যেস করলেন।
আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।
আমি তোমাদের জাহাজটা দেখলাম। কোনো পতাকা উড়ছেনা। বুঝলাম তোমরা দূর দেশের মানুষ। আমিও সেটাই চেয়েছিলাম। আমি ঠিক করেছি কাছাকাছি নয়, দূরের কোন দেশে চলে যাব। পিরেল্লো বললেন।
আপনি রাজপুরোহিত। কত সম্মান আপনার। দেশের লোক আপনাকে কত ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তবে কেন দেশত্যাগ করতে চাইছেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
সে অনেক কথা। পিরেল্লো বললেন।
ততক্ষণে শাঙ্কো আর রাজপুরোহিতকে ঘিরে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধুও দাঁড়িয়েছে। রাজপুরোহিত বললেন, তোমাদের দলনেতা কে? তার সঙ্গে কথা বলব।
ঠিক আছে। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমাদের দলনেতাকে নিয়ে আসছি।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের সামনে এল। দরজায় টোকা দিল।
কে? ফ্রান্সিসের গলা।
ফ্রান্সিস, একটু এসো। এদেশের রাজপুরোহিত আমাদের জাহাজে এসেছেন তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।
আসছি।
ফ্রান্সিস কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এল। পেছনে মারিয়াও এল।
ডেকে উঠে এল দুজনে। আসবার সময় শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে রাজপুরোহিতের সঙ্গে যা কথা হয়েছে তা বলল।
ফ্রান্সিস রাজপুরোহিত পিরেল্লোর সামনে এসে দাঁড়াল।
আপনার কথা বন্ধুর মুখে শুনলাম। আপনি কী চান স্পষ্ট করে বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
আমি আপনাদের জাহাজে আশ্রয় চাইছি। কেন?
আমি সাতটি দেবতার মূর্তি চুরি করে এনেছি। এই আলকাবা দেশ থেকে পালাতে চাই। মূর্তিগুলো গালালে প্রচুর সোনা পাব। তাই দিয়ে আরামে বাকি জীবনটা নিজের দেশ পর্তুগালে কাটাতে পারব।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল, সেই সাতটি দেবতার মূর্তি কোথায়?
আমার নৌকোয় রেখেছি। পিরেল্লো বললেন।
ঠিক আছে। বিস্কোকে বলল, যাও তো মূর্তিগুলো নিয়ে এসো।
বিস্কো চলে গেল। পিরেল্লো বললেন, তাহলে এই সুযোগে আপনি আমার মূর্তিগুলো নিয়ে নেবেন মানে চুরি করবেন।
