জ্ঞানবৃদ্ধ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপরে বললেন–এটার অর্থ গুণ। মাপকাঠিটা দিয়ে কিছু একটা মাপতে হবে তারপর গুণ করতে হবে। মহন্ত বললেন।
–তাহলে তো তিন পাঁচে পনেরো দাঁড়ায়। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। মহন্ত বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
–ঠিক আছে। এইটাই আমার জানার দরকার ছিল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হ্যারিও উঠল।
–কিন্তু তোমরা এই মাপামাপি করছো কেন? জ্ঞানবৃদ্ধ বলল।
–আপনি তো জানেন রাজা সুমালা একটা সেনার ঘর তৈরি করিয়েছিলেন। আমার সেই সোনার ঘরটা খুঁজছি। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ কঠিন কাজ। দেখ পাও কিনা। জ্ঞানবৃদ্ধ বললেন।
দুজনে আশ্রম থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি। সোনারঘর বেরকরতে পারবে।
–মাপকাঠির মাপটাপ সমাধান করেছো? হ্যারি বলল।
হ্যারি, এবার রাজা মামুনকে খেলাঘরগুলির জায়গায় নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে রাজপ্রাসাদে এল। একটু পরে রাজা মামুন মন্ত্রী দুজনেই এলেন খেলাঘরের এলাকাটায় রাজা সুমালা দেয়াল তুলে ঘিরে দিয়েছিল। তার যে ঢাকার দরজাটা ছিল ফ্রান্সিস সেই দরজার ঠিক মাঝখান থেকে মাপকাঠি দিয়ে মেপে চলল। একটা ঘরের সামনে এসে পনেরো হাত শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–কুড়ুল চাই। ঘরটা ভাঙতে হবে।
ততক্ষণে সেখানে অনেক লোকজড়ো হয়েছে। সোনারঘর দেখা যাবে–সোজা কথায়। রাজা মামুন এলেন। তিনিও উত্তেজিত। সোনার ঘর আবিষ্কৃত হবে। তাঁরআনন্দের শেষ নেই।
হ্যারি একজন সৈন্যকে একটা কুড়ুল আনতে বলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই কুড়ুল আনা হল।
ফ্রান্সিস ঘরটায় কুড়ুল চালাতে লাগল। ইটের টুকরো ধুলোবালি ছিটকে বেরুতে লাগল। প্রায় অর্ধেক ভাঙা হয়ে গেল। সোনার ঘরের দেখা নেই।
আরো ভাঙা হল। কিছুই পাওয়া গেলনা। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে রইল। রগচটা রাজা মামুন বিরক্তির সঙ্গে বলল কী সব কাণ্ড। সোনারঘর বেরকরা অত সহজ কাজ নয়। আমি যাচ্ছি। রাজা মামুন চলে গেলেন। মন্ত্রী বললেন–আরো ভালোভাবে খোঁজ কর। পাওয়া যাবে ঠিকই।
বেশ লোকজন জড়ো হয়েছিল। তারাও চলে যেতে লাগল। তখনই শাঙ্কো বিস্কোরা এল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–কী ব্যাপার ফ্রান্সিস।
–ঠিক বুঝতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
–আর একবার মাপজোক কর। হ্যরি বলল।
–দেখি। ফ্রান্সিস পেতলের মাপকাঠিটা নিল। হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎই দেখল একটা হাতার কোনায় একটা ছোট কড়া। ফ্রান্সিস চমকে উঠল তাহলে তো এখানেও একটা এক হাতের সমান পিতলের কাঠি ছিল যার মাপ অন্যগুলির মতই এক হাত।
তুমি কি এ বিষয়ে নিশ্চিত? হ্যারি।
–নিশ্চিত। এখন কাজ। বিস্কোকে ডাকল।
–বলো৷ বিস্কো বলল।
–জাহাজে যাও তোমার কাঠের কাজে হাত ভালো। মাপকাঠিটা নিয়ে যাও। এই কাঠির সমান একটা টুকরো কর তারপর সেটাকে একটা কড়া দিয়ে পেতলের কড়ার সঙ্গে আটকে দাও। মাপকাঠিটা ছয় হাতই ছিল। পরে একটা হাত ভেঙে হারিয়ে যায়। বিস্কো পেতলের মাপকাঠিটা নিয়ে চলে গেল। ভাইকিং বন্ধুরাও সেখানে এল।
ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু পরে বিস্কো ফিরে এল। সঙ্গে মাপকাঠিটা। কাঠের হাতা লাগানোয় দৃঢ় হাত হল।
এবার ফ্রান্সিস দৃঢ় হাত মাপের মাপকাঠিটা নিয়ে মাপতে লাগল। একেবারে সদর দরজা থেকে মাপতে লাগল। মেপে মেপে আঠারো হাত পরে থামল। এ এর সঙ্গে ছিল তিন। তাই তিন দিয়ে গুণ করল ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস কুড়ল চালিয়ে আঠারো নম্বর ঘরটা ভাঙতে লাগল। কিন্তু কোথায় সোনা? পাথর ধূলো বালি ছিটকোচ্ছে।
ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল। ওর গণনায় কোন ভুল নেই। সোনার ঘর এখানেই আছে। এই আঠারো নম্বর ঘরের নিচে আছে।
উৎসাহে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–শাঙ্কো বিস্কো কুড়ুল জোগাড় করে আনন। এই ভিতের নিচে খুঁড়তে হবে।
শাঙ্কো বিস্কো কুড়ুল জোগাড় করে নিয়ে এল। তিনজনে ঘরের ভিত ভাঙতে লাগল। কুড়ুলের ঘায়ে গর্ত হতে লাগল। হঠাৎ একটা সোনার টুকরো ছিটকে পড়ল। ফ্রান্সিস সোনার টুকরোটা হাতে নিয়ে তুলে ধরল। লোকের ভিড়ে চাঞ্চল্য জাগল। সবাই অবাক। তাহলে এখানেই আছে সোনার ঘর?
ফ্রান্সিসরা তিনজনে বসে পড়ল। হাঁপাতে লাগল। সেনাপতি এগিয়ে এল। বলল– তোমরা নিঃস্বার্থ ভাবে আমাদের দেশের সম্পদ উদ্ধার করছো। তোমরা বিশ্রাম কর। বাকি খোঁড়ার কাজ আমরা করবো। সেনাপতি কয়েকজন সৈন্যকে বলল–খুঁড়ে ফেল ভিতটা।
সৈন্যরা কুড়ুল চালাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোনার স্তর দেখা গেল। আস্তে আস্তে সবটা খোঁড়া হল। সোনার ঘর দেখা গেল। নিরেট সোনার ঘরের মত। জমাট সোনা। রোদের আভা পড়ে চক্ করছে। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস একটা কাজ করতে হবে যে।
–কী কাজ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
শাঙ্কোর কাছে সোনার চাকতি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। রাজা মামুনকে বল আমাকে হাজার পাঁচেক স্বর্ণমুদ্রা দিতে।
বেশ বলছি। ফ্রান্সিস রাজা মামুনের কাছে গেল। বলল–মাননীয় রাজা দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াই। অর্থের খুবই প্রয়োজন। এখন সেই অর্থ আমাদের কমে এসেছে। আপনি যদি আমাদের পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেন তাহলে বড়ই উপকার হয়।
নিশ্চয়ই দেব। আমার সঙ্গে কেউ আসুন। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে যেতে বলল। হ্যারি রাজার সঙ্গে গেল।
কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করল। হরি কোমরের মধ্যেও সোনার চাকতি ভরে নিয়ে এল। জাহাজঘাট নয় জাহাজের কাছে আসতেই জাহাজ থেকে বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–হো– হো-রে। ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখে বলল–মারিয়া এবার কিছু স্বর্ণমুদ্রা এনেছি। কাল সকালে আমরা কাপড়ের দোকানে যাব। সবাই পোশাক তৈরি করাবো। বিছানাপত্রের কাপড় চোপড়ও কিনবো। আমরা দরিদ্র নই। জলদস্যু আমাদের ভিখিরি বলেছিল।
শায়িত দেবতাদের মন্দির
মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রো অনেক আগেই জানিয়েছিল ফ্রান্সিসদের জাহাজ একটা বন্দরের কাছে এসেছে।
