একটু পরেই বেঞ্জামিন আর দু’জন প্রহরী সকালের খাবার নিয়ে এল। সকলে। খাচ্ছে, তখনই বেঞ্জামিন বলল–খাওয়ার পরে তোমাদের মধ্যে থেকে চারজন এসো। ক্যাপ্টেন লা ব্রুশ তলব করেছে। সকলেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো কি ব্যাপার। হঠাৎ জরুরী তলব। খাওয়া শেষ করে কয়েকজন ফ্রান্সিসের দিকে সরে এলো। ফ্রান্সিস। বুঝে উঠতে পারল না, কী বলবে? যখন ডেকেছে, যেতেই হবে। না গেলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করবে লা ব্রুশ। বলা যায় না হয়ত চাবুক হাতে ছুটে আসবে। তখন মুখ বুজে মার খাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ফ্রান্সিস বেঞ্জামিনকে জিজ্ঞাসা করলো কেন ডাকছে?
–আমি জানি না। আমি হুকুমের চাকর। বেঞ্জামিন বললো। ওর পাথরের মত মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। ফ্রান্সিস ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে বললো, ঠিক আছে যে কেউ চারজন যাও। ভাইকিংরা উঠে দাঁড়ালো। বেঞ্জামিন ওর কোমরে ঝোলানো চাবির গোছা থেকে চাবি নিয়ে চারজনের হাতকড়া খুলে দিলো। চারজন হাতের কব্জিতে হাত বুলোতে-বুলোতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল। হয়তো কিছুক্ষণের জন্য তবু মুক্তি তো। বাইরের মাটি-আলো-বাতাসে যেতে পারবে। বহুদূর, বিস্তৃত আকাশের নিচে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে। কতদিন পর ছাড়া পেল, তা মা মেরীই জানে।
বেঞ্জামিন চারজনকে নিয়ে চলে গেল। এতক্ষণ ফ্রেদারিকো ঘুমিয়ে ছিল। আজকাল রাত্রে ওর ভালো ঘুম হয় না। ঘুম তাই ওর চোখে লেগেই থাকে। বেশ বেলা অব্দি ঘুমোয়। বেঞ্জামিন ওর জন্যে বেলাতেই খাবার আনে। অন্যদের যে খাবার দেওয়া হয়, সে খাবারও দেয় না। কোনদিন কলা আধখানা, ডিম নয়তো বিস্কুট-পাঁউরুটির টুকরো। সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বেঞ্জামিন এসব খাবার এনে দেয়।
কিছুক্ষণ পরে বেঞ্জামিন লুকিয়ে খাবার নিয়ে এল। ধাক্কা দিতে ফ্রেদারিকোর ঘুম ভাঙল। খাবার এগিয়ে দিল। চারজন ভাইকিংকে লা ব্রুশ ডেকে নিয়ে গেছে, এ খবর ও জানতো না। কথায় কথায় হ্যারি সেকথা ওকে বলল। ফ্রেদারিকো ভীষণভাবে চমকে উঠল। ফ্যাফেসে গলায় যতটা জোর দেওয়া সম্ভব, ততোটা জোর দিয়ে বলল–করেছো কি? ওদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলে?
–তার মানে? হ্যারি তো অবাক। ফ্রান্সিসও এদের কথাবার্তা শুনে এগিয়ে এল। ফ্রেদারিকো বলল–জানো, ওদের কেন নিয়ে গেল লা ব্রুশ?
–তা কি করে বলবো। হ্যারি বলল।
–এই ক্যারাভেল জাহাজ ডাইনীর দ্বীপে এসে লেগেছে। লা ব্রুশ ওর লুট করা ধন সম্পত্তি ডাইনীর দ্বীপে কোথায় কোন গহ্বরে কোন গুহায় লুকিয়ে রাখবে। অত লুটের মাল বয়ে নিয়ে যেতে লোক দরকার, তাই ওদের নিয়ে গেছে।
–তবে আর ভয়ের কি আছে? ফ্রান্সিস বলল।
–হু–ফ্রেদারিকো খানিকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল–লা ব্রুশ ওদের দিয়ে লুটের মাল রেখে আসবে। ওরাও জায়গাটা দেখবে। এর পরেও কি লা ব্রুশ ওদের বাঁচিয়ে রাখবে?
সত্যিই তো! এ কথাটা তো ওরা ভাবে নি। লা ব্রুশ তো ওদের ওখানেই মেরে ফেলবে। গুপ্তধন ভান্ডারের খোঁজ জানে, এমন কাউকেই বেঁচে থাকতে দেবে, এ অসম্ভব। ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। ওদের ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু কি করে ফিরিয়ে আনব? ওরা চলে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। এতক্ষণে বোধহয় ডাইনীর দ্বীপে পৌঁছেও গেছে।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকল বেঞ্জামিন–বেঞ্জামিন।
বেঞ্জামিন দরজার কাছে গারদ ধরে দাঁড়াল।
–লা ব্রুশ কোথায়?
–বলা বারণ।
–আমাদের চারজন লোক?
–বলা বারণ।
–লা ব্রুশকে বলল আমরা তার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
–এখন দেখা হবে না।
এক্ষুনি ক্যাপ্টেনকে ডাকো। ফ্রান্সিস ক্রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ভাইকিংরা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওদের চারজন বন্ধুর বিপদের আশঙ্কা ওদেরও ভীষণভাবে বিচলিত করল! লোহার শেকলে হাতকড়ায় ঝনঝন শব্দ উঠল।
বেঞ্জামিন ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে দেখে তারপর চলে গেল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকল বেঞ্জামিন।
কিন্তু বেঞ্জামিন ফিরল না। অন্য দু’জন পাহারাদার দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। কোমর থেকে তরোয়াল খুলে দরজায় পাহারা দিতে লাগল।
রাগে-দুঃখে নিজেদের অসহায় অবস্থায় কথা ভেবে ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। ও কি যদি বিন্দার আঁচ করতে পারতো, যে ওর বন্ধুদের সাংঘাতিক বিপদ হতে পারে, তাহলে নিশ্চয়ই রুখে দাঁড়াত। কিন্তু এখন আর কিছু বলার নেই। সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। ওই বন্ধু চারজন আর কোনদিন ফিরবে না। ওর ক্রুদ্ধ চোখ-মুখ থেকে আগুন ঝরতে লাগল। পাগলের মত হাতের কড়াটা কাঠের মেঝেয় ঠুকতে লাগল। কব্জীর চামড়া ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। হ্যারি ওকে শান্ত করবার চেষ্টা করতে লাগল। বারবার বলতে লাগল–ফ্রান্সিস শান্ত হও। মাথা ঠিক রাখো।
ফ্রান্সিস তবুও মাথা ঝাঁকিয়ে মেঝেতে হাতের কড়াটা জোরে জোরে ঠুকে চললো। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে রক্তাক্ত হাত দুটো ওপরের দিকে তুলে ফোঁপাতে লাগল।
***
ওদিকে সেই চারজন ভাইকিং কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে যখন ডেক-এ উঠলো–সকালের ঝকঝকে উজ্জ্বল রোদে ভালো করে তাকাতেই পারল না। চোখে হাত চাপা দিয়ে চলল। ক্যারাভেল-এর মাথার কাছে এসে দেখল একটা মোটা কাছি ঝুলছে। নীচে জলের ওপর একটা ছোট নোকা। নৌকার মাঝখানে একটা পেতলের কারুকাজ করা লোহার বড় সিন্দুকের মত বাক্স। একটু দূরেই ডাইনির দ্বীপ, দূরবিস্তৃত বালিয়াড়ি। নারকোল গাছের সারি। তারপর সবুজ গাছ-গাছালি ঢাকা পাহাড়। কতদিন পরে মাটি-গাছপালা আকাশ দেখছে। ওদের আনন্দ ধরে না। বেনজামিনের নির্দেশে ওরা কাছি-বেয়ে নেমে এল। একটু পরেই ডেক-এর ওপর খট খট শব্দ তুলে লা ব্রুশ এল। জলদস্যুরা সবাই সন্ত্রস্ত। জাহাজের মাথার কাছে একটা দড়ির জালমতো ঝুলছিল। লা ব্রুশকে সকলে ধরাধরি করে সেই জালের মধ্যে বসিয়ে দিল। আস্তে-আস্তে জালটা দড়ি দিয়ে নামাতে লাগল, লা ব্রুশ নৌকোর ওপর আসতেই জাল নামানো বন্ধ হলো। লা ব্রুশ কাঠের পা বের করে জাল থেকে ঠক করে নৌকোর ওপর নামল। ভাইকিং চারজন দেখল লা। ব্রুশের কোমরে তরোয়ালের সঙ্গে নক্সা আঁকা মিনে করা একটা লম্বা নল ওলা পিস্তল গোঁজা। লা ব্রুশ নৌকায় বসেই দ্বীপের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে হুকুম দিল–চল।
