একসময় রাজা বললেন–আপনাদের ক্যাপ্টেন কে? ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে বলল–আমি। আমরা জাহাজে চড়ে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াই। কোথাও কোন গুপ্তধনের সংবাদ পেলে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করি।
যখন আমার পূর্বপুরুষ জারা সুমালার সোনার ঘরও আপনারা খুঁজে দেখতে পারেন। হঠাৎ থেমে বললেন–কী বা বলছি। আমি তো আর হিচককের রাজা নই।
–আপনার দুর্ভাগ্য কাটুক আপনি আবার রাজ্য ফিরে পান। আমি আপ্রান চেষ্টা করবো রাজা সুমার গুপ্ত সোনার ঘর খুঁজে বের করতে আপনাকে আমি ফ্রান্সিস এই কথা দিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা কিছু বললেন না। এই দুঃখের দিনেও একজন বিদেশী তাকে সম্মান জানাচ্ছে দেখে রাজার দুচোখ জলে ভরে উঠল। রানি তার মাথা ঢাকা দামি পাতলা কাপড়ের কানা দিয়ে রাজার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন।
রাজরানির জন্য ফ্রান্সিস শাস্কোকে কাছিমের মাংস দুধের মিষ্টি এসব আনতে পাঠাল। শাস্কো দেখেশুনে ভালো ভালো জিনিস আনলো।
রাজারানির কাছে এসব খুবই সাধারণ খাবার।
রাজা-রানির ছেলেমেয়েরা সেই খাবারই খেল। ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে বোঝা গেল ওদের খুব অসুবিধে হচ্ছে। রাজরানি কিন্তু কোনরকম মুখভঙ্গীনা করেই খেয়ে নিলেন।
পরদিন সকালে শাঙ্কো নৌকোয় চড়ে তীরভূমিতে গেল। ক্রীটের রাজা কী করছে সেটা জানতে।
রাজপ্রাসাদের কাছে এসে দেখল ক্রীটের সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ ঘিরে ফেলেছে। লোকের বাড়ি বাড়ি রাজারানির খোঁজে তল্লাশী চলছে।
তাহলে ক্রীটের সৈন্যরা এখনও জাহাজ তল্লাসী শুরু করে নি।
শাঙ্কো ফিরে এল। ফ্রান্সিসকে বলল সব। হ্যারি বলল-ওরা ছাড়বে না। আমাদের জাহাজেও তল্লাসী চালাবে।
সারা দুপুর ক্রীটের সৈন্যরা জাহাজগুলোও তল্লাশী চালান। রাজরানিকে পেল না।
সন্ধ্যের সময় ফ্রান্সিসদের জাহাজ ওদের নজরে পড়ল। ওরা একটা বড় নৌকোয় চড়ে দশ পনেরজন সৈন্য নিয়ে দলনেতা ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে আসতে লাগল।
ফ্রান্সিস বুঝল বিপদ। কিন্তু কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারিকে বলল–এখন কী করবে?
–চলো রাজার সঙ্গে কথা বলি। হ্যারি বলল।
দুজনে রাজার কেবিনঘরে এল। রাজা পায়চারি করছিলেন। ফ্রান্সিসদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হ্যরি বলল মাননীয় রাজা কয়েকটা কথা বলছিলাম।
-বলো। রাজা বলল।
-ক্রীটের সৈন্যরা সংখ্যায় দশ পনেরজন হবে একটা বড় নৌকায় চড়ে আমাদের জাহাজ তল্লাশী করতে আসছে। হ্যারি বলল।
জানতাম আত্মগোপন করলেও ধরা পড়তেহবে। রাজা বেশ দুঃখের সঙ্গে বললেন দেখুন আমরা ওদের হারিয়ে দিতে পারি। ওরা খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হবে। আমাদের সঙ্গে লড়াই হবে। ওদের কয়েকজন মরবে। আমাদেরও আহত হবে। কিন্তু এদিকে গেলেও আরো নৌকো আরো সৈন্য ক্রীটের রাজা পাঠাবে। তখন পুরোদস্তুর লড়াইয়ে নামতে হবে। আমরা তা চাইছিনা। ফ্রান্সিস বলল।
-না-না। তোমরা এর মধ্যে জড়াবে কেন। আমি ধরা দেব। রাজা বললেন।
–কিন্তু আপনার প্রাণসংশয় হবে। হ্যারি বলল।
–তা জানি। কিন্তু আমি নিরুপায়। রাজা বললেন।
ক্রীটের দলনেতার নৌকো ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। দলনেতা গলা চড়িয়ে বলল–এই জাহাজে রাজা মামুন আছেন?
–এসে দেখ। বিস্কো বলল।
ওরা নৌকার হালের দিকে নিয়ে গেল। ঝুলন্ত দড়ি ধরে ধীরে ধীরে দশজনের মত সৈন্য ডেকে উঠে এল।
রাজা মামুন রানি আর রাজকুমার রাজকুমারীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেকে উঠে এলেন। দলনেতা ছুটে গিয়ে নৌকোটা দড়ি মইয়ের নিচে আনতে বলল। নৌকো আনা হল। রাজা ও রানি ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন অনেক ধন্যবাদ তোমাদের।
রাজারানি ছেলেমেয়েদের নিয়ে দড়িমইয়ের সাহায্যে দলনেতার নৌকায় নামলেন।
ওদিকে রাজা মামুনের সেনাপতি ধরা পড়তে পড়তেও ক্রীট সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েনি। হিচককদ্বীপের মানুষের কাছে সেনাপতি খুবই জনপ্রিয়। সেনাপতি এ বাড়িতে সে বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচল। এবার সেনাপতির চিন্তা হল কী ভাবে ক্রীটের রাজার সৈন্যদের এখান থেকে তাড়ানো যায়। এজন্য অনেক সৈন্য প্রয়োজন। এইজন্য অন্য দ্বীপে যেতে হবে। প্রচুর সৈন্য এনে ক্রীট সৈন্যদের আক্রমণ করতে হবে। বেশি সৈন্যের চাপে ওদের হারিয়ে দেওয়া সহজ হবে।
কিন্তু অত সৈন্যকে ভাড়া করে আনতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এত অর্থ দেবে কে? রাজা এখন ফ্রান্সিসদের জাহাজে।
সেনাপতি দূতের কাছে খোঁজ নিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে এসে উঠল। বলল–রাজা মামুনের সঙ্গে কথা আছে।
–যান।
সেনাপতি রাজার ঘরে ঢুকল। রাজা রানিকে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলল– একটা বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি।
–বলুন সেটা কী। রাজা বললেন।
–এই ক্রীটদ্বীপের সৈন্যদের হারাতে হলে আমাদের আরো অনেক ভাড়াটে সৈন্য চাই। তারজন্যে সোনার চাকতি অর্থ চাই। বেশ কিছু পরিমান ভাড়া করা সৈন্য আনতে হবে। সেনাপতি বলল।
–সোনার চাকতি অত অর্থ পাবেন কোথায়? রাজা বললেন।
এবার রানি বললেন–দেখুন রানিমাতার অনেক অর্থ আছে। সোনার চাকতিও আছে। এসব নিয়ে সেনাপতিমশাই অনেক সৈন্য আনতে পারবেন।
–কিন্তু রানিমাতা আমাকে এত অর্থ স্মর্শ দেবেন কেন? সেনাপতি বলল।
–রানিমাতা আপনাকে চেনেন। রানি বললেন।
–তার একটা চিহ্ন ছিল।
রাজা ভাবলেন। তারপর মধ্যমা আঙ্গুল থেকে একটা আংটি বের করে সেনাপতিকে দিলেন। বললেন–এই আংটিটাই চিহ্ন। আমাকে তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন, এটা দেখলেই রাজমাতা চিনবেন।
