নৌকো চলেছে। কোথায় চলেছে ওরা জানে না। ফ্রান্সিস বলল–মোটকথা ক্রীট দ্বীপ থেকে পালাতে হবে। তারপর সেখানে গিয়ে পৌঁছেই।
বিকেলের দিকে দূরে একটা দ্বীপমত মনে হল। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল–ফ্রান্সিস একটা দ্বীপ! ঐ দিকেই নৌকো চালাচ্ছি তখন শাঙ্কো নৌকো বাইছিল।
সূর্য অস্ত গেল। অন্ধকার নেমে এল। সেই আলো অন্ধকারে ফ্রান্সিসদের নৌকো দ্বীপটার তীরে ভিড়ল।
দুজনে নামল। সামনেই কিছু বাড়িঘরদোর। বাড়িগুলোয় মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস বলল শাঙ্কো কী করবে।
–চলো। এসেছি যখন। দেখা যাক কেমন মানুষ এরা। শাঙ্কো বলল।
দরজায় জানালায় উৎসুক মুখের ভিড়। ফ্রান্সিস সামনের বাড়িটায় এল। বোধহয় বাড়ির মালিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল–জায়গাটা কি দ্বীপ?
-হ্যাঁ। পিলকে দ্বীপ।
–আপনাদের পেশা কী?
–এই দ্বীপের মাঝখানে রয়েছে একটা বিরাট হ্রদ। মিষ্টি জলের হ্রদ। এইদই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এই হ্রদেই আমরা মাছ ধরি। মাছ চাষ করি। সেই মাছ বিক্রির অর্থেই আমরা সংসার চালাই। ওটাই আমাদের রোজগার। বাইরের দ্বীপ থেকেও মানুষ আসে মাছ কিনতে। নিজেরাও চালান দিই। খাড়ির মালিক বলল।
আবার বলল আপনারা বোধহয় বিদেশী।
–হ্যাঁ। সারা পৃথিবী আমরা ঘুরে বেড়াই। এতেই আমরা আনন্দ পাই। হিচকক দ্বীপে আমাদের জাহাজ রয়েছে। মাঝখানে ক্রীট দ্বীপে আমরা বন্দী হয়ে রইলাম। সেখান থেকে, পালিয়ে এসেছি। এখন এখান থেকে আমাদের জাহাজ ফিরবে।
–ততদিন কি এখানে থাকবেন? গৃহকর্তা জিজ্ঞাসা করল।
কিছু ঠিক করি নি তবে দু’চারদিন তো থাকবেই। যাক গে–সারা দিন না খেয়ে আছি। কিছু খেতে দিন। শাঙ্কো বলল।
নিশ্চয়ই। আসুন। গৃহকর্তা বলল।
দুজনে ঘরের মধ্যে ঢুকল। কাঠ ও মাটির তৈরী বাড়ি। ছাউনি শুকনো ঘাসপাতার। ঘরে তিমি মাছের তেলের প্রদীপ জ্বলছে। অন্ধকার মোটামুটি দূর হয়েছে।
মালিক তার স্ত্রীর সঙ্গে কী কথাবার্তা বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল দুপুরের বাসি খাবার তো বেশি নেই। আমাদের পেট ভরবেনা। তার চেয়ে রাতের রান্নার তো সময় হয়ে গেল। একটু অপেক্ষা করুন। আপনাদের টাটকা খাবার দেওয়া হবে।
ঘাস দিয়ে বোনা একটা আচ্ছাদন মাটিতে পাতা। তার ওপরেই বসল দুজনে।
তারপর কথাবার্তা চলল। বাড়ির মালিক বলল–আমাদের কোথায় আর শোবেন। খেয়েদেয়ে এখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। পাশের ছোট ঘরটায় আমরা থাকবো।
ফ্রান্সিস শাঙ্কো বেশ পেট ভরেই খেলো। ঘুমও পেল তাড়াতাড়ি। দুজনে বেশ তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে তিনখানা রুটি আর শাকপাতার ঝোল দিয়ে খেল। তারপর হ্রদ দেখতে গেল। সত্যিই বিরাট হ্রদ। পরিষ্কার ঝকঝকে জল। মাছ ধরা চলছে নৌকায়। পাত্র ভরে খাবার জল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চারদিক লোকজনের সাড়াশব্দ।
কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে ফ্রান্সিসরা গৃহকর্তার বাড়িতে ফিরে এল। যাত্রীরা ওদের ছাড়ল না। বলল গৃহকর্তা।
যে কদিন এখানে থাকবেন আমাদের বাড়িইে থাকুন। আপনাদের কোন অসুবিধে হবেনা।
না-না-আপনি যত্নে আমাদের রেখেছেন। ঠিক আছে কটা দিন এখানেই থাকবো।
বিকেলে ফ্রান্সিসরা ঘুরে ফিরে আসার জন্য বেরুবেতখন ভদ্রলোক বললেন–এখানে তো সবই ভালো। কিন্তু বিপদ হল উত্তরের-আগ্নেয়গিরিটা। ওটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। মাঝে মাঝেই মাটি কাপে। তবে অগ্নদগার হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। আবার কবে অগ্নদগার হয় সেই ভয়ে থাকি আমরা।
–আগ্নেয়গিরিটা কোথায়? ফ্রাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
–হ্রদের উত্তর কোণায়। যান–দেখে আসুন। গৃহকর্তা বলল।
–শাঙ্ক। চলো দেখে আসি। ফ্রান্সিস বলল।
দু’জনে হ্রদের ধারে এল। উত্তর দিকে চলল। জঙ্গল এখানে। তার মধ্য দিয়ে দু’জনে হেঁটে চলল। জঙ্গল খুব ঘন নয়।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় আগ্নেয়গিরিটা দেখল। কালো পাহাড়। ওরা পাহাড়ের নিচে এসে পৌঁছাল। বিকেলের নরম রোদে পাহাড়টা মাথা উঁচিয়ে আছে।
দুজনে পাহাড়টায় উঠতে লাগল। জমাট গলাপাখিরা মাঝে মাঝে ছাইয়ের মত কিছু ছড়ানো।
ফ্রান্সিস বলল–কী মাথায় উঠবে?
–এতদূর এলাম। একটু আগ্নেগিরির মুখটা দেখে আসব না? শাঙ্কো বলল।
–না শাঙ্কো। যদি হঠাৎ জেগে ওঠে আমরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবো। অত ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না। এখান থেকে যা দেখা যায় তাই দেখে ফিরে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে ওখানেই দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। জ্বালামুখ থেকে পাতলা কুয়াশার মত নিলচে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। এটাই জীবন্ত আগ্নেয়গিরির প্রমাণ।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল দুজনে। হঠাৎই দেখল ধোঁয়াটা ঘন হতে শুরু করেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই জ্বালামুখ দিয়ে ঘন ধোঁয়া আকাশে উঠতে লাগল। মাটিতে খুব মৃদু কম্পন অনুভব করল দুজনে। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো লক্ষণ সুবিধের নয়। ফিরে চলো।
দুজনে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব ফিরে চলল।
যখন গৃহকর্তার কাছে ফিরল তখন সন্ধে হয়ে গেছে।
বসতি এলাকার মানুষের মধ্যে তখন উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে। লোকজন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস বলল-শাঙ্কো বোধহয় অগ্নদগার হবে। এরা অভিজ্ঞ। জানে কখন কী অবস্থায় আগ্নেয়গিরি জাগে।
–কী করবে? শাঙ্কো বলল?
আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। চলো পালাই। ফ্রান্সিস বলল।
–ঐ নৌকোয় চড়ে পালাতে হবে। শাঙ্কো বলল।
