–পারবো? ফ্রান্সিস বলল।
–পারতেই হবে। এখানে থাকলে মারা পড়বো। চলো।
গৃহকর্তা ওদের দেখে এগিয়ে এল। বলল–আগ্নেগিরি জেগেছে। তবে এরকম মাঝেমাঝে হয়। ঘণ্টা কয়েক গলিত লাভা ছাই ছিটকে বেরোয়। তারপর সব বন্ধ হয়ে যায়। আগ্নেয়গিরি ঘুমিয়ে পড়ে। ভয় পাবার কিছু নেই। এই আগ্নেয়গিরি আমাদের কাছে দেবতার মত। আমরা বছর বছর ফুল পাতা দিয়ে পূজা করি। আমরা রক্ষা পাই।
ফ্রান্সিস বলল–এটা সবসময় হয় না। আগুনে পাথর লাভাস্রোত শুরু হলে রেহাই নেই। আমরা চলে যাচ্ছি।
–ঐ ছোট নৌকোয় চড়ে? ফ্রাসিস বলল।
–হুঁ। শাঙ্কো মাথা ঝাঁকাল।
–দাঁড়ান আপনাদের একটা বড় নৌকো দিচ্ছি। গৃহকর্তা কোথায় চলে গেলেন। একটু পরে ফিরে এল। ওদের সমুদ্রের ধারে নিয়ে গেল। দেখা গেল একটা বেশ বড় নৌকো। মাথা ঢাকা নৌকোর কাছে গিয়ে ওরা দেখল নৌকায় দাঁড় হাল রাখা।
ফ্রান্সিসরা দেরি করলো না। নৌকায় উঠে বসল। নৌকা ছেড়ে দিল। দূর থেকে দেখল সত্যিই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে আগুনের ধোঁয়া বেরুনো অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু ফ্রান্সিসরা তীরে নেমে এল না। নৌকা ভাসাল।
যতটা জেগেছে আগ্নেয়গিরি তাতেই সমুদ্রের জল ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফ্রান্সিসরা দক্ষ হাতে হাল ধরে রইল। শাঙ্কো দাঁড় বাইতে লাগল। আগ্নেয়গিরির মাথার আকাশটা আস্তে আস্তেস্ফভাবিকহল। আগুনেরআভা নিভেএল। গৃহকর্তাঠিকইবলেছিল ওরা আগ্নেয়গিরিকে দেবতার মত শ্রদ্ধা করেফুলপাতা দিয়ে পূজো করে। আগ্নেয়গিরিটিও ওদের বাঁচিয়ে রাখে।
রাত কাটল। ওর মধ্যেই জলে দাঁড়বন্ধ করে ওরা কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিল। জল ফুলে ফেঁপে ওঠা বন্ধ হয়েছে অনেকক্ষণ।
পরদিন দুপুরে দূর থেকে একটা দ্বীপ দেখল। দূর থেকে ঠিক বুঝল না কতদূর। তবু ঐ দ্বীপ লক্ষ্য করেই ওরা নৌকো চালাল।
সন্ধ্যের অন্ধকারে সেই দ্বীপে পৌঁছল। তীরে বেশ কয়েকপা যেতেই ফ্রান্সিস বলে উঠল–সর্বনাশ।
কী হল? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–আমরা সেই ক্রীট দ্বীপেই ফিরে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো কি। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
–কী করে বুঝলে? শাঙ্কো বলল।
–ফ্রান্সিস আঙুল তুলে একটা বাজ পড়া নারকেল গাছ দেখাল।
–আবার কয়েদ ঘর? শাঙ্কো বলল?
–অগত্যা উপায় কি। এখন উপায়।
ওরা কয়েকটা ঝোঁপের আড়ালে বসে রইল।
রাত বাড়ল। খিদেয় পেট জ্বলছে। ফ্রান্সিস বলল চলো খাবার চুরিকরবে। ভীষণ খিদে।
দুজনে এবাড়ি ওবাড়ির গা ঘেঁষে ঘুরতে লাগল। একটা ফাঁকা এলাকায় একটা বাড়ি পেল। ফ্রান্সিস বলল–এই বাড়িটার ধারে কাছে বাড়ি নেই। এটাতেই চেষ্টা করি।
দু’জনে জানলা দিয়ে তাকাল। দেখল মেঝেয় দুটো বিছানো পাতায় খাবার সাজানো। গাছের ডালে তৈরি বিছানায় একজন পুরুষ শুয়ে আছে। একজন স্ত্রীলোক। মেঝেয় বসেছিল। এবার পাশের ঘরে গেল। বোধহয় জল অথবা নুন আনতে।
ফ্রান্সিস কাঁপা গলায় বলল-জলদী। দুজনে গোল দরজা দিয়ে ঘরটায় ঢুকে পড়ল। স্ত্রীলোকটি ফেরার আগেই দুটো পাতাভর্তি খাবার নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এল। পুরুষটি হৈ হৈ করে উঠল। ফ্রান্সিসরা তার আগেই একটা বড় ঝোপে ঢুকে পড়ল।
দুজনে হাঁপাচ্ছে তখন ওরা একটুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপরঅল্প অন্ধকারে গোগ্রাসে খাবার গিলতে লাগল।
খাওয়া শেষ। কোথায় আর হাত মুখ ধুতে যাবে। জংলি গাছের পাতা ছিঁড়ে হাত মুছল। জামার হাতায় মুখ মুছল।
রাত বেড়ে চলল। রাতের মত খাওয়া হয়েছে।
নিশ্চিন্ত মনে দুজনে গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পাতল। তারপর ওখানেই শুয়ে পড়ল।
এবার কী করবে? শাঙ্কো বলল।
ধরা দেব। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো কি। আবার কয়েদ ঘর? শাঙ্কো বলল।
–উপায় নেই। এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে থেকে লাভ নেই যদি না পালাতে পারি। কয়েদ ঘর থাকলে দুটো খাওয়া ও নিশ্চিন্তে থাকা যায়। তারপর পালানো। ফ্রান্সিস বলল।
–বড় বেশি ঝুঁকি নেওয়া হবে। শাঙ্কো বলল।
ঝুঁকি তো থাকবেই। কালকে সোজা কয়েদ ঘরে গিয়ে হাজির হবে। প্রহরীদের কাছে আমরা যথেষ্ট পরিচিত। ওরাই আমাদের কয়েদঘরে পাঠাবে। রাজা বা দলনেতার দরকার নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–এভাবে ধরা দেওয়া। শাঙ্কো বলল।
–দাঁড়াও। দুচারটে দিন বিশ্রাম নিই। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে টুমিয়ে শরীরে কিছু জোর করি। তারপর পালানো। ফ্রান্সিস বলল।
সকাল হল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল। কাছেই পুকুর থেকে হাত মুখ ধুয়ে এল।
এখন যাবে কয়েদখানায়? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। সকালের খাবারটাও জুটবে। চলো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে কয়েদ ঘরের সামনে এল।
একজন প্রহরী দলনেতাকে নিয়ে এল। দলনেতা হেসে বলল–তাহলে নিজেরাই এসে ধরা দিলি। আমাদের খাটুনি কমিয়ে দিলে।
সকালের খাবার খেতে দাও। ফ্রান্সিস বলল।
আগে কয়েদঘরে ঢোকো। দলনেতা বলল। প্রহরীরা দুজনকে কয়েদঘরে ঢোকাল। দুজনে ঘরে ঢুকেই বসে পড়ল। একটু পরেই সকালের খাবার এল। দুর্জনে পেটপুরে খেল।
এখন তো শুধু শুয়ে বসে সময় কাটানো।
পরদিন রাজা কয়েদ ঘরে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল শুনলাম তোমরা নিজেরাই ধরা দিয়েছ।
–হ্যাঁ। খিদে পেয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল?
–ঠিক আছে। থাকো। দেখি তোমাদের কী শাস্তি দেওয়া যায়। রাজা বলল।
–কী আর শাস্তি দেবেন। এইনরককুণ্ডে আছি এটাই তো যথেষ্ট শাস্তি। শাঙ্কো বলল।
–উঁহু, অন্য কোন শাস্তি। রাজা বলল।
