— না। তোমাদের লড়তে দেওয়া হবে না। দুজনকে কয়েদ ঘরে ঢোকাও। দলনেতা বলল। শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস শান্ত হও।
আরো কিছু হিচকক দ্বীপের সৈন্যকেও বন্দী করা হল। সবাইকে কয়েদ ঘরে ঢোকানো হল।
ঘরে একটা মাত্ৰ মশাল জ্বলছে। তাতেই যা অন্ধকার দূর হয়েছে। মেঝেয় ঘাস পাতা বিছোনো। ফ্রান্সিস প্রথমে বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। ও ভাবল–বোকার মত ধরা পড়লাম। পালাতে পারতাম। যা হবার হয়েছে। এখন এই বন্দী দশা থেকে পালাবো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
আরো কিছু হিচকক দ্বীপের সৈন্যও বন্দী ছিল।
একটু রাত হল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো দলনেতাকে আসতে বল তো।
শাঙ্কো লোহার দরজার কাছে গেল। দরজায় ধাক্কা দিল। একজন প্রহরী এল। বলল– কী ব্যাপার?
–তোমাদের দলনেতাকে আসতে বল। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা কী এমন রাজা এলে যে তোমরা ডাকলেই দলনেতা আসবে। প্রহরী বলল।
বাজে কথা ছাড়ো। ডেকে আন। ফ্রান্সিস বলল।
–না। প্রহরী মাথা নাড়ল।
ফ্রান্সিস উঠে এল। আস্তে আস্তে বলল–ভাই–আমরা কোন অপরাধ করি নি অথচ কয়েদ খাটা। আমাদের গুপ্তচর বলে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। দলনেতাকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবো। আজ বন্দি হয়েই এই অন্যায় আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে।
–হুঁ। দেখছি।
কিছু পরে দলনেতা এল। বলল কী বলবে তোমরা?
–একটা কথাই বলবো। গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে আমাদের অন্যায়ভাবে বন্দী করা হয়েছে। আমরা নির্দোষ। ফ্রান্সিস বলল।
–না। তোমাদের কথা রাজাকে বলা হয়েছে। রাজা তোমাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দলনেতা বলল।
মৃত্যুদণ্ড? ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল ঠিক আছে আমরা রাজার সঙ্গে কথা বলবো।
–রাজা কথা বলতে রাজি নাও হতে পারেন। দলনেতা বলল।
–তবু একবার বলে দেখুন। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি।
বেশ কিছুক্ষণ পরে রাজা এলেন। ফ্রান্সিস বলল–মাননীয় রাজা আমাদের অন্যায়ভাবে বন্দী করা হয়েছে। আমরা নির্দোষ।
–তোমরা বিদেশী। রাজা বলল।
আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–জলদস্যুর জাত। রাজা বলল। ফ্রান্সিস রেগে আগুন হয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করল। বলল–আমরা বিদেশী। আপনাদের এই দেশের যুদ্ধবিগ্রহের। সঙ্গে আমাদের কী যোগ বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা হিচকক দ্বীপের সৈন্যদের কাছে আমাদের সৈন্যসঙঘার খবর পৌঁছে দিয়েছো নইলে ওরা অত দ্রুত আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করল কী করে? রাজা বলল।
–আমরা সর্বক্ষণ সমুদ্রের জলেই ছিলাম। হিচকক দ্বীপের সৈন্যদের খবর দেব কী করে? ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব বুঝিনা। তোমাদের জন্যই আমরা লড়াইয়ে হেরে গেছি। রাজা বলল।
–না আমাদের কোন দোষ নেই’ ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব বলে লাভ নেই। তোমাদের কয়েদঘরে থাকতে হবে। মুক্তি নেই। মুক্তি আছে। একবারে মৃত্যুতে। রাজা বলল।
তার মানে আপনি আমাদের হত্যা করবেন? ফ্রান্সিস বলল।
–নিশ্চয়ই। রাজা বলল।
–কী অন্যায় বিচার। শাঙ্কো বলল।
–এটাই তোমাদের প্রাপ্য শাস্তি। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল রাজা কোন যুক্তি মানবে না। ওদের হত্যা করবেই।
কয়েকদিন কাটল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো চুপচাপ শুয়ে বসে থাকে। ভাবে ভবিষ্যৎ কী? এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? যা থেকে সব এখানকার নিয়মটিয়ম দেখতে বুঝতে হবে। তারপর উপায়।
কদিন পর গভীর রাত্রে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল। কালো আকাশ যেন ছিঁড়ে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সেইসঙ্গে প্রবল বাতাস।
প্রচণ্ড জোর শব্দে একটা বাজ পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কয়েদ ঘরের একটা কোনা ভেঙে পড়ল। ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। যাক প্রকৃতিই বাঁচার পথ করে দিল। ফ্রান্সিস বলল– শাঙ্কো–আর বসে থেকো না। রাস্তা খোলা, পালাও।
দু’জনে এক লাফে ভাঙা কয়েদ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পেছনে অন্য বন্দীরাও।
দুজনে ছুটল দক্ষিণের সমুদ্রের দিকে।
ততক্ষণে বৃষ্টিকমে গেছে। হাওয়ার গতিও কমের দিকে। ছুটতে ছুটতেশাঙ্কো বলল– দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে গিয়ে কী হবে?
-ওখানে নৌকো পাবো। নোকায় চড়ে পালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–চলো। দেখা যাক। ফ্রাঙ্কো বলল।
দুজনে দক্ষিণ সমুদ্রতীরে পৌঁছল। এবার নৌকো জোগাড় করা। সমুদ্রতীর থেকে বেশ কিছু দূরে লোকজনের বাড়ি-ঘর। সেই বাড়িঘরটরের কাছে বালিতে নৌকো রাখা। নৌকোর ভেতরে দাঁড়। তখন ভোর হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসরা নৌকা খুঁজতে লাগল।
ফ্রান্সিসরা যেখানে এল। স্থানীয় বাসিন্দারা ওদের দেখল কিন্তু ওরা যে কয়েদঘর থেকে পালিয়েছে তা তো ওরা জানে না। ফ্রান্সিসরা নিশ্চিন্তমনেই ঘুরে বেড়াতে লাগল। নজর নৌকার দিকে।
দেখল একটা নৌকা একটা ঝোঁপের কাছে রাখা। ধারে কাছে কোন বাড়িঘর নেই।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে নৌকোটার কাছে গেল। তারপর দাঁড় দুটো ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে এক হঁচকা টানে নৌকাটা মাথারওপর তুলে ফেলল। তারপর সমুদ্রের দিকেছুটল। পেছনে ফ্রান্সিস।
দুজনে সমুদ্রের ধারে এল তখনই দেখল নৌকার মালিক লাঠি হাতে ছুটে আসছে। ওরা দুজনে লাফিয়ে নৌকায় উঠে গেল। তারপরদাঁড়বাইতে শুরু করল। নৌকার মালিক লাফিয়ে জলে নৌকার দিকে সাঁতার কাটতে শুরু করল। ফ্রান্সিসরা নৌকার গতি বাড়িয়ে দিল।
মালিক মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। হাত-পা টেনে মালিক হাল ছেড়ে দিল। সমুদ্রতীরের দিকে ফিরে চলল। তীরে উঠে গেল।
সমুদ্রের ঢেউ তখনও শান্ত হয় নি। উঁচু উঁচু ঢেউ তার মাঝখান দিয়েই ফ্রান্সিস নিপুন। হাতে দাঁড় বেয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে কাত হওয়া নৌকায় ছিটকে জল উঠছে। শুধু হাতেই শাঙ্কো করুন জল ঘেঁচে ফেলছে।
