–তা যেও। ওখানে তো আমরা লড়াই করতে যাচ্ছিনা। কাজেই শান্তিতেই তোমার কাজ করতে পারবে। ফ্রান্সিস বলল।
এবার ফ্রান্সিস কালো লোকটিকে দেখল। বিস্কো সিনেত্রার সঙ্গে সেও ডেক-এ বসে আছে। ফ্রান্সিস বললশাঙ্কো–ওকে?
–আমাদে রসঙ্গে বন্দী ছিল। আমাদের সঙ্গেই পালিয়ে এসেছে। পাতুই দ্বীপের বাসিন্দা। এই দ্বীপে কাজের খোঁজে এসেছিল। সর্দার চোরঅপবাদ দিয়ে কয়েদ ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। চলুক আমাদের সঙ্গে হিচককদ্বীপে। সেখানে না হয় কাজ জোগাড় করে নেবে। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। বলল–তোমার নাম কী?
–তুতুম্ফা। যুবকটি কালো মুখে সাদা দাঁত বের করে হাসল।
–ঠিক আছে। চলো আমাদের সঙ্গে। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস। শাঙ্কো একটু দুর্বলকেই ডাকল।
–বলো।
রাতের খাওয়া হয় নি। বড্ড খিদে। শাঙ্কো বলল।
–চলো। তোমাকে খাবার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর বা বগলটা ধরে শাঙ্কোকে দাঁড় করাল। শাঙ্কো ডান হাত দিয়ে ফ্রান্সিসের গলা জড়িয়ে ধরল। দুজনে সিঁড়ি ঘরের দিকে চলল।
যেতে যেতে শাঙ্কো বলল–জল আনতে পারলাম না।
–ঠিক আছে। পীপের অর্ধেক জল অল্প অল্প করে খেয়ে চালিয়ে দেব। হিচকক দ্বীপ বেশি দূরে নয়। ফ্রান্সিস বলল।
সিঁড়ি ঘরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–জাহাজ ছেড়ে দাও। দাঁড় টানো, আমাদের যত দ্রুত সম্ভব হিচকক দ্বীপে পৌঁছতে হবে। যতটুকু জল না খেলে নয় ততটুকু জল খাবে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ তীরভূমি ছাড়ল। হাওয়ার বেশ তেজ। পালগুলো ফুলে উঠল। ওদের জাহাজ বেশ দ্রুতই চলল।
একদিন পরে ফ্রান্সিসদের জাহাজ হিচকক দ্বীপের জাহাজ ঘাটে এসে নোঙর করল।
এবার সোনার ঘর খোঁজার পালা।
একদিন পর ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–সোনার ঘরের খোঁজের আগে আর একটা কাজ। শুনলাম এই দেশবাসী একজনের মুখে এই হিচককের দক্ষিণে এক সমুদ্র আছে। তারপরেই এক দ্বীপ ক্রীট। হিচকক দ্বীপের সঙ্গে চির বিরোধ। ঐ যে মাঝখানের সমুদ্রের ফালি বললাম ঐ ফালিতে প্রচুর ঝিনুক। মুক্তোও পাওয়া যায়। কিন্তু দুই দ্বীপের কেউ ঐ সমুদ্রের ফালিতে ঝিনুক তুলতে নামে না। দুদেশের প্রহরীরাই বর্শা ছুঁড়ে মারে।
–তা তুমি কী স্থির করেছো? শাঙ্কো বলল।
–ঐ একফালি সমুদ্রে মুক্তো শিকার করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–পাগল হয়েছ? ঐ প্রহরীদের বর্শার কথা ভাবছো না। শাঙ্কো বলল।
–সেসব ভাবতে গেলে কোন কাজই করা হয় না। মনে আছে আর তো আমার সেই মুক্তোর সমুদ্রে ডুব দিয়ে মুক্তো তোলা। ফ্রান্সিস বলল।
—হ্যাঁ। তুমি তো মুক্তো শিকারীদের দলে ভিড়ে কী করে বেশিক্ষণ দম রাখতে দ্রুত ঝিনুক তুলতে হয় এসব শিখেছিলে। শাঙ্কো বলল।
এবার সেটা কাজে লাগানো। ফ্রান্সিস বলল।
–কবে যাবে? শাঙ্কো বলল।
–পূর্ণিমার রাতে। তুমি তো জানোনা পূর্ণিমার রাত কবে? ফ্রান্সিস বলল।
–না। ভেন এসব জানে। শাঙ্কো বলল।
–ভেন-এর কাছে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে ভেনএর কাছে এল। ভেন হিসেব করে বলল–পরশুদিন পূর্ণিমা।
ফ্রান্সিস সেই দিনটাই স্থির করল।
কিন্তু ফ্রান্সিসের দুর্ভাগ্য। দক্ষিণের দ্বীপে ক্রীট সেই রাতেই হিচকক দ্বীপ আক্রমণ করে বসল।
উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো-ফালি সমুদ্রের তীরে এল। সারি সারি নারকেল গাছের পেছন দিয়ে আড়ালে আড়ালে ওরা ফালি সমুদ্রের জলে নামল। হিচকক দ্বীপের প্রহরী তখন দূরে পাহারারত। ফ্রান্সিসরা বেশ কায়দা করে ওদের চোখকে ফাঁকি দিল।
দুজনে জলে নামল। কিছুটা ডুব সাঁতার দিয়ে গেল। মাথা তুলল।
আজই ক্রীট দ্বীপের দিকে হৈ হৈ চিৎকার শোনা গেল। ফ্রান্সিসরা দেখল একটি দ্বীপের সৈন্যরা চিৎকার করতে করতে ছুটতে ছুটতে আসছে। হাতে খোলা তরোয়াল। হিচকক দ্বীপের পাহারাদাররা পড়িমরি ছুটল রাজবাড়ির দিকে। ক্রীট এর সৈন্যরা আক্রমন করেছে। লড়াই।
ওদিকে ক্রীটের সৈন্যরা জলে নেমে পড়েছে। সাঁতরে আসতে শুরু করেছে। হিচকক দ্বীপের সৈন্যদের মধ্যেও সাজো সাজো রব পড়ে গেল। তারাও তরোয়াল হাতে ছুটে এল। জলের মধ্যেই লড়াই শুরু হয়ে গেল। চিৎকার আর্তনাদ গোঙ্গানি শোনা যেতে লাগল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো জল পার হয়ে ক্রীট দ্বীপের দিকে চলে এল।
লড়াই তখনও চলছে। লড়াইয়ের চিৎকার তরোয়ালের ঝনঝনানি চলল।
হিচককের সৈন্যরা সংখ্যায় বেড়ে গেল। ক্রীটের সৈন্যরা সংখ্যায় বেশ কমে গেল। ওরা লড়াই চালাল। তবে বোঝা গেল ক্রীটের সৈন্যরা পারবে না। হেরে যাবে।
হলও তাই। ক্রীটের সৈন্যরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসতে লাগল। একসময় সবাই পিছিয়ে এল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো একটা নারকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্রীটের সৈন্যদের এক দলনেতা হঠাৎ ফ্রান্সিসের হাত ধরে ফেলল। অন্য হাতে ধরল শাঙ্কোর হাত। চিৎকার করে উঠল–এরা বিদেশী গুপ্তচর। হিচককের সৈন্যরা এত তাড়াতাড়ি আমাদের আক্রমনের কথা জানল কী করে? নিশ্চয়ই এরা আগেভাগেই খবর দিয়েছে।
–আপনি অন্যায় কথা বলছেন। ফ্রান্সিস বলল আপনাদের এইলড়াইয়ের সঙ্গে আমাদের। কোন যোগ নেই। আপনাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। ফ্রান্সিস বলল।
না। তোমরা গুপ্তচর। দলনেতা গলা চড়িয়ে বলল–এ্যই এই দুজনকে বাঁধ। দুজন ও সৈন্য দড়ি হাতে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস রেগে গেল। বলল–দুটো তরোয়াল দিন তারপর আমাদের হার স্বীকার করুন।
