–যা। এটাকেও কয়েদঘরে ঢোকা। সর্দার বলল।
যোদ্ধাটি ইঙ্গিতে শাঙ্কোকে বাইরে আনতে বলল। শাঙ্কো সর্দারের ঘরের বাইরে এলো।
আরও একজন যোদ্ধা এগিয়ে এল। দুজনেশাঙ্কোকে নিয়ে চলল কয়েদঘরের দিকে।
শাঙ্কোকে কয়েদ ঘরের সামনে এনে শাঙ্কোর দু’হাত দড়ি দিয়ে বাঁধল। তারপর দরজা খুলে শাঙ্কোকে ঢুকিয়ে দিল।
অন্ধকার ঘরে শাঙ্কো বিস্কোদের ভালো করে দেখতে পেল না।
–শাঙ্কো–তুমিও আটকা পড়লে? বিস্কোরা বলে উঠল।
–পালাতে পারলাম না। অবশ্য আমি ধরা দিতে চেয়েছিলাম যাতে তোমাদের কী হল জানতে পারি শাঙ্কো বলল।
শাঙ্কো নারকেল পাতার ওপরে বসে পড়ল। তারপর শুয়ে পড়ল।
–তাহলে এখান থেকে পালানো যাবে না। সিনেত্রা বলল।
–যাবে। পালানোর ছক কষে ফেলেছি। এখন কাজে লাগানো। শাঙ্কো বলল।
তারপর শাঙ্কো শুয়ে শুয়েই ওর পালাবার ছকের কথা চাপা গলায় বলল। বিস্কো ও সিনেত্রা বলে উঠল–সাবাস শাঙ্কো।
পীপে দুটো কোথায়? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–ঐদিকে কোথায় রেখে দিয়েছি। বিস্কো বলল।
–জল নিয়ে যাওয়া যাবে না। যে অর্ধেক পীপে জল আছে তাই দিয়ে চালাতে হবে হিচকক দ্বীপে পৌঁছোবার আগে পর্যন্ত। শাঙ্কো বলল।
–কখন পালাবে? বিস্কো জানতে চাইল।
–রাতে যখন খাবার দিতে আসবে। শাঙ্কো বলল।
সঙ্কোচ হল। শাঙ্কো উঠে বসল। মাথা নিচু করে বলল–বিস্কো–আমার জামার তলায় ছোরাআছে। বেরকর। বিস্কোদড়িবাঁধা হাতশাঙ্কোরজামার নিচে ঢোকাল। আস্তেআস্তে ছোরাটা বের করে আনল। তারপরশাঙ্কোর হাত বাঁধা বিস্কো আর সিনেত্রার হাত বাঁধা দড়ি কেটে দিল। তারপর দুজন কালা মানুষ অবাক চোখে এই কাণ্ড দেখছিল। শাঙ্কো গিয়েওদের হাতেরদড়িও কেটে দিল। মৃদুস্বরে বলল রাজাকুতুবুবন্দীমাঠেআমাদেরহাতপা বাঁধা ছিল। সেখান থেকে আমরা অতগুলো মানুষ পালাতে পেরেছি। আর এ তো শুধুহাত বাঁধা।
একটু রাত হল।
দুজন প্রহরী খাবার দিতে এল।
দরজা খোলা হল।
একজন প্রহরী খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।
শাঙ্কো একটা পীপে তুলে নিয়ে তৈরিই ছিল। পীপেটা ছুড়ল প্রহরীটির মুখের দিকে। প্রহরীটি দরজার ওপর পড়ল। হাতে আনা খাবারও ছিটকে গেল। দরজার দুটো পাটাই খুলে গেল।
সবাই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। সানেই অন্য প্রহরীটিও অবাক। পরক্ষরেই বর্শা তুলল। শাঙ্কো তৈরি ছিল। ছোরাটা ছুড়ল রহরীটির বুকে লক্ষ্য করে। কিন্তু ছোরাটা গেঁথে গেল প্রহরীটির ডান হাতে। বর্শা ফেলে ও মাটিতে বসে পড়ল। শাঙ্কো এক লাফে সামনে গিয়ে ছোরাটা খুলে নিয়ে চাপাস্বরে বলল–ছোটো প্রাণপণে জাহাজের দিকে। আহত প্রহরীটি আর্তনাদ করে উঠল।
তিনজনে ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। কালোলোক দুজনও ওদের পিছু পিছু ছুটল। আহত প্রহরীটির আর্তনাদ শুনেই বোধহয় ঘুমন্ত যোদ্ধাদের কারো কারো ঘুমে ভেঙে গেল। তারা বর্শা হাতে ছুটে বাইরে এল।
চাঁদের আলো ম্লান। তবু শাঙ্কোদের ছুটতে দেখা গেল।
যোদ্ধারা পিছু ধাওয়া করল। শেষে কাছাকাছিও এসে গেল। একজন বর্শা ছুঁড়ল। কালো মানুষের একজনের পিঠে বর্শা ঢুকে গেল। সে গড়িয়ে বালিয়ারির ওপর পড়ে গেল।
শাঙ্কোরা ছুটছে। আবার একজন যোদ্ধা বর্শাছুঁড়ল। কারো গায়েই লাগল না। অন্যজন ছুঁড়ল। শাঙ্কোর বাঁ কাধ কেটে বর্শাটা বালির ওপর পড়ল। কাঁধ থেকে রক্ত পড়তে লাগল। কিন্তু শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল না। সমানে ছুটে চলল।
ফ্রান্সিস তখনও ঘুমোয় নি। জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে তীর ভূমির দিকে তাকিয়ে ছিল। বন্ধুরা ফিরল না। এই নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল ওর।
হঠাৎ দেখল কারা ছুটে আসছে। চাঁদের ম্লান আলোয় চিনল শাঙ্কোরা। পিছনে উদ্ধত বর্শা হাতে ছুটে আসছে যোদ্ধারা। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–ভাইসব। তরোয়াল নিয়ে চলে এসো। তখনও সবাই ঘুমোয় নি।
অল্পক্ষণের মধ্যে তরোয়াল হাতে অনেক বন্ধু ডেক-এ উঠে এল। যোদ্ধারা তখনও বর্শা ছুঁড়ছে। কিন্তু আর কারো গায়ে বর্শা লাগল না।
শাঙ্কোরা তখন জাহাজের পাতা কাঠের তক্তার কাছে এসে গেছে।
তরোয়াল উঁচিয়ে ভাইকিংরা পাতা তক্তা দিয়ে নেমে আসতে লাগল।
শাঙ্কোদের পিছু ধাওয়া করা যোদ্ধারা থমকে দাঁড়াল। শাঙ্কোরা জাহাজে উঠে এল। যোদ্ধারা নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করতে করতে চলে গেল। শাঙ্কো জাহাজের ডেক এর ওপর শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ছুটে এল হাঁপাতে হাঁপাতে। দেখল শাঙ্কোর বাঁ কাঁধের ক্ষত থেকে রক্ত পড়ছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–শিগগির ভেনকে আসতে বল। বেশি রক্ত বেরুলে শাঙ্কো একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বে।
হ্যারি ছুটল ভেনকে ডাকতে। একটু পরে ভেন ওর পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে এল। শঙ্কো পাশে বসল। একটা বোতল থেকে সমুদ্রের নোনা জল, কয়েকটা শুকনো পাতা বের করল। পাতাগুলো হাতের তালুতে ডলে গুড়ো করল। গুড়োটা ক্ষতস্থানে ছড়িয়ে দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রক্তপড়া বন্ধ হয়ে গেল। এবার বোয়াম থেকে কালো আঠার মত ওষুধ বের করল। ক্ষতস্থানে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। শাঙ্কো একটু নড়ে উঠে স্থির হল। ভেন পোঁটলা-পুটলি গোছাতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল–কিছুনা। কয়েকদিন ওষুধ পড়লেই সেরে যাবে। সব গুছিয়ে নিয়ে বলল–ফ্রান্সিস এখন কোথায় যাবে?
সোজা হিচকক দ্বীপে। ফ্রান্সিস বলল।
ওখানে কটা ছোট ঢিলা দেখেছি। চারপাশে জঙ্গল। আমার ওষুধের জন্যে কিছু গাছপাতা শেকড় খুঁজে বের করতে হবে। আমি দেখব খুঁজতে যাবো। ভেন বলল।
