–পারবে! ফ্রান্সিস ক্লান্ত হাসি হেসে বলল।
–কি করে।
–যদি বলো মুক্তোর সমুদ্র ব্যাপারটা কি?
কথাটা শুনে ফ্রেদারিকোর মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল। ভীতমুখে ও বললো না না–মুক্তোর সমুদ্রের কথা ভুলে যাও–ওখানে গেলে কেউ ফেরে না।
ফ্রান্সিস হাসল। তুমি বলো তো মুক্তোর সমুদ্র ব্যাপারটা কি?
–তুমি ওখানে যেতে চাও? ফ্রেদারিকো অবাক চোখে তাকাল।
–আগে শুনি তো।
–গেলেও ফিরে আসতে পারবে না।
–ঠিক আছে, ধরে নাও না আমার কৌতূহল হয়েছে।
ফ্রেদারিকো মুখ নীচু করে কী ভাবলো। তারপর বলল–দেখো লা ব্রুশকে আমি সবই বলেছি, কিন্তু মুক্তোর সমুদ্র থেকে অক্ষত দেহে বেরিয়ে আসবার ব্যাপারটা আজও আমার কাছে রহস্য থেকে গেল। কিন্তু লা ব্রুশের বিশ্বাস যে অমি সেটাও জানি। অথচ ঐ রহস্যটা যে ভেদ করা অসম্ভব, সেটা আমি ওকে বোঝাতে পারি নি।
ঠিক আছে–ফ্রান্সিস উঠে বসে বলল–তুমি যা জানো, বলো।
একটু থেমে ফ্রেদারিকো বলতে লাগলো–কত বছর আগেকার কথা আমি বলতে পারবো না। কারণ এখানকার এই নরকে দিন রাত্রির কোন পার্থক্য নেই। আমি প্রথম প্রথম দিনরাত্রের হিসাবের বহু চেষ্টা করেছি। পরে হাল ছেড়ে দিয়েছি।
ফ্রেদারিকো থেমে তার কোমরের গাঁট থেকে তামাকপাতা বের করে মুখে ফেলে চিবুতে চিবুতে বলতে লাগল–একবার চাঁদের দ্বীপের কাছাকাছি আমাদের জাহাজ এসেছিল। আমাদের জাহাজটা ছিল মালবাহী জাহাজ। গায়েরও জোরছিল, খাটতেও পারতাম খুব। ক্যাপ্টেন আমাকে খুব ভালোবাসতো। সেই প্রথম আমরা চাঁদের দ্বীপে যাচ্ছি।
–চাঁদের দ্বীপ কোথায়?
–আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ডাইনী দ্বীপ, তারও দক্ষিণে।
–লা ব্রুশ যে সেদিন বলেছিল এই ক্যারাভাল ডাইনী দ্বীপে যাবে।
–তা-তো যাবেই। লা ব্রুশ সমস্ত লুঠের সম্পদ ঐ দ্বীপেই রাখে। তারপরেই ও যাবে চাঁদের দ্বীপে।
–ও। তারপর?
–চাঁদের দ্বীপের বন্দরটার নাম সোফালা। এই দ্বীপের অধিবাসীদের বলা হয় ভাজিম্বা। হলদে চামড়া, বেঁটেখাটো মানুষ এরা। সোফালা বন্দর থেকে প্রচুর তামাক আর মধু রপ্তানি হয়। আমাদের জাহাজ থেকে চিনি, ময়দা, কাপড়-চোপড় এসবের বদলে তামাক পাতা, মধু নেওয়া হলো। এসব বাণিজ্যের জন্য ভাজিম্বাদের রাজার অনুমতি নিতে হয়। রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজসভায় রাজার অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়–এই। রীতি। কিন্তু এই চাঁদের দ্বীপের খ্যাতি অন্য কারণে। সেটা হলো এখানকার মুক্তোর সমুদ্র। এই অঞ্চল দিয়ে যে সব জাহাজ যায়, সেইসব জাহাজের লোকরা সকলেই এই মুক্তোর সমুদ্রের গল্প শোনে। কিন্তু কেউ জানে না সেই মুক্তোর সমুদ্র কোথায়। তবে এটা সবাই জানতে পারে, যে সেখানে গেলে কেউ ফিরে আসে না। পরে সেই মুক্তোর সমুদ্র আমি দেখেছিলাম। আসলে ওটা একটা ল্যাগুন। ভাজিম্বারাও বলে মুক্তোর সমুদ্র। মস্তবড় ঝিনুক-এর তলায় বড়-বড় মুক্তো। হাঁসের ডিম থেকে শুরু করে উটপাখির ডিমের মতো বড় সেই মুক্তো।
–বলো কি? ফ্রান্সিস আশ্চর্য হয়ে বললো। হ্যারিও কম অবাক হয় নি। বলো কি? এত বড় মুক্তো।
–সেই মুক্তোর সমুদ্র কী ঐ দ্বীপের মধ্যেই?
–হ্যাঁ–বলে ফ্রেদারিকো চুপ করে গেল। আর কোনো কথা না বলে চোখ বুজে তামাক পাতা চিবুতে লাগল। ফ্রান্সিস হ্যারি দু’জনেই অধীর হয়ে উঠলো। ফ্রান্সিস বলে উঠলো–তারপর?
ফ্রেদারিকো সেই চোখ বুজে তামাকপাতা চিবুতে লাগল। হ্যারি ওকে মৃদু ঝাঁকুনি দিল–ফ্রেদারিকো, কি হলো?
ফ্রেদারিকো পাতা চিবুনো বন্ধ করে চোখ মেলে ফ্যাফেসে গলায় বললো–এই জোয়ান বয়েসে তোমার জীবন শেষ হয়ে যাক, এটা আমি চাই না।
–সেটা আমরা বুঝবো। তুমি বলো। ফ্রান্সিস অধৈর্য হয়ে বলল। কিন্তু ফ্রেদারিকো সেই যে চুপ করলো আর একটি কথাও বললো না। ফ্রান্সিস আর হ্যারি অনেক ভাবে কথা বলাবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফ্রেদারিকো মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে দিল! সেই চোখ বুজে তামাক পাতা চিবুতে লাগল। শেষে ফ্রান্সিস আর হ্যারি হাল ছাড়লো।
এর মধ্যে ফ্রান্সিস সুস্থ হলো। বেনজামিনের ওষুধে খুব উপকার হতে কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ও আগের মতো গায়ে শক্তি ফিরে পেল।
***
দিন যায়। ক্যরাভেলও চলেছে। কোনদিকে কোথায় যাচ্ছে, ফ্রান্সিসরা কেউ জানে । ওদের একঘেঁয়ে বন্দীজীবন কাটাতে লাগল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি পালাবার কত ফন্দী বার করে, কিন্তু কোনটাই শেষ পর্যন্ত কার্যকরী করা যাবে না মনে হয়। ওরা হাল ছেড়ে দিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
এদিকে ফ্রেদারিকোও আর মুক্তোর সমুদ্রের গল্প করে না। ঐ প্রসঙ্গ তুললেই ও চুপ করে যায়। চোখ বুজে তামাকপাতা চিবোয়। কখনও বা গলায় লকেটের মতো ঝোলানো ভাঙা আয়নাটায় মুখ দেখে, চোখ বড়-বড় করে নাম কুঁচকে ভেংচি কাটে। অন্য অনেক কথা বলে–ওর অতীত জীবনে জিপসিদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার গল্প বা জাহাজী জীবনের গল্প সব বলে। কিন্তু মুক্তোর সমুদ্রের কথা উঠলেই চুপ করে থাকে।
এক দিন। সকালই হবে তখন। হঠাৎ ক্যারাভেলটা যেন থেমে আছে মনে হলো। জলদস্যদের হাঁক-ডাক শোনা গেল। নোঙর ফেলবার ঘড়ঘড় শব্দ ভেসে এলো। সেই সঙ্গে পাখির কিচির-মিচির ডাক। নিশ্চয়ই কোন স্থলভূমিতে ক্যরাভেল লেগেছে। ফ্রান্সিসের মনটা খারাপ হয়ে গেল–আঃ কতদিন মাটি দেখিনা গাছপালা দেখি না–পাখি পাখালির ডাক শুনি না, আকাশ দেখি না। ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাড়ির কথা মনে পড়লো। মা’র কথা। সবার কথা। ছোট ভাইটা এখন না জানি কত বড় হয়েছে। আর কি ওদের দেখতে পাবো? কোনদিন কি আর মাটি-আকাশ দেখতে পাবো? ফ্রান্সিস হঠাৎ মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসলো। এসব চিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। তাহলে শরীর মন ভেঙে যাবে। তা কখনই হতে দেওয়া চলবে না। এই বন্দী জীবন থেকে যে করে হোক পালাতে হবে। এবার যেতে হবে মুক্তোর সমুদ্রে। উট পাখীর ডিমের মত মুক্তো। আঃ কল্পনাই করা যায় না। এখন শুধু ফ্রেদারিকোর কাছ থেকে মুক্তোর সমুদ্রের খোঁজটা নেওয়া। তারপর এখান থেকে পালানো! পালাতেই হবে। যে করে হোক।
