–তোমরা জানো আমাদের সর্দার অনুমতি না দিলে এখান থেকে এক ফোঁটাও জল নিয়ে যেতে পারবে না। যোদ্ধাটি বলল।
–না। আমরা জানি না। সিনেত্রা বলল।
–সর্দারের কাছে চলো। এই বলে যুবকটি একটা বড় বাড়ির দিকে হেঁটে চলল। বিস্কোরাও পীপের হাতে পেছনে পেছনে চলল।
যেতে যেতে সিনেত্রা বলল–বোধহয় বিপদে পড়লাম।
না-না। সদারের কাছে অনুমতি নেব। জল নিয়ে চলে যাব। বিস্কো বলল।
দুজনে ঘরে ঢুকল। প্রায় অন্ধকার ঘর। অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে দেখল ঘরে, একটা নারকোল গাছ কেটে পায়াওয়ালা একটা কাঠের তক্তপোষ একটি কালো মতো বয়স্ক লোকবসে আছে। গায়ে বেশ দামি কাপড়ের জামা। পরনে রঙিন পায়জামা।
যোদ্ধা যুবকটি বলল–আমাদের সর্দার। মাথা নোয়াও। দুজনে মাথা একটা নোয়াল। যোদ্ধাটি বলল–এরা বিদেশি। কী যেন কিং-এর জাত। এখানে খালি পীপে হাতে জল নিতে এসেছে,
–চালাকি–চালাকি। এরা চোর। আমার রত্নভাণ্ডার চুরি করতে এসেছে। বেশ গলা চড়িয়ে সর্দার বলল।
–আমাদের মিথ্যে দোষ দিচ্ছেন। আমরা চোর নই। বিস্কো বলল।
–উঁহু। তোমরা জল খোঁজার নাম করে রাত পর্যন্ত এখানে থাকবে। তারপর রাত বেশি হলে আমার রত্নভাণ্ডার চুরি করে পালাবে। –এই মতলব তোমাদের। সর্দার বলল।
–আমরা এই দ্বীপে এই প্রথম এসেছি। আমরা জানিই না যে আপনার রত্নভাণ্ডার আছে। সিনেত্রা বলল।
–সবজানো তোমরা আমাররত্নভাণ্ডারের খোঁজেএসেছো তোমরা। সর্দারবলল। তারপর চেঁচিয়ে বলল-দুটোকেইকয়েদ ঘরে ঢোকা। আরো দুটো চোর বোধহয় আছেওখানে।
–হ্যাঁ। যোদ্ধাটি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
দুজনে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। সিনেত্ৰা বলবার চেষ্টা করল
–শুধু সন্দেহের বশে আমাদের
–চোপ–সর্দার ধমকে উঠল!
যোদ্ধাটি ওদের ঘরের বাইরে নিয়ে এল। তখনও দুজনের হাতে পীপে।
বাইরে এসে দেখল প্রায় আট দশখানা যোদ্ধা বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। যোদ্ধাটি এগিয়ে গিয়ে ওদের বলল। দু’জন যোদ্ধা এগিয়ে এল। ওর পেছনে পেছনে আসতে ইঙ্গিত করল।
দু’জনে পিপে হাতে চলল।
একটা বড় গাছের নিচে ছোটঘর। গাছের ডাল দিয়ে তৈরি দেয়াল। মাটি লেপা। ঘরটার সামনে দু’জন প্রহরী দাঁড়িয়ে। দুজনে যেতেই একজন প্রহরী কোমরের ফেটি থেকে চাবি খুলল। দরজার তালা খুলে ঢুকতে বলল। দু’জনে ঢুকে যাবে একজন প্রহরী পীপেটা নেবে বলে হাত বাড়াল। সিনেত্রা পীপে সরিয়ে নিয়ে বলল–না পীপে দুটো। আমাদের কাছেই থাকবে। প্রহরীটি আপত্তি করল না।
ঘর অন্ধকার। জানালা বলে কিছু নেই। মাথার ওপরে বেশ উঁচুতে বেলে মাটি আর। শুকনো ঘাসের ছাউনি।
মেঝেয় নারকেল পাতায় ছড়ানো। তার ওপরেই দুজনে বসল। প্রহরী এসেনারকেলের দড়ি দিয়ে দুজনের হাত বেঁধে দিয়ে গেল।
অন্ধকার চোখে সয়ে আসতে দেখল আরো দুজন বন্দী রয়েছে। দুজনেই কালো। একজন বিস্কোর কাছে এগিয়ে এল। বলল তোমার তো বিদেশি। তোমাদের আটকালো কেন?
–আমরা নাকি চোর। সর্দারের রত্নভাণ্ডার চুরি করতে এসেছি। সিনেত্রা বলল।
–আমরা পাকুই দ্বীপের বাসিন্দা। বেকার। এখানে এসেছিলাম কাজের খোঁজে। আমাদেরও চোর বলে আটকে রেখেছে। কালো লোকটা বলল।
–সর্দারের এটা একটা চালাকি। চোর অপবাদ দিয়ে এইভাবে আটকে রাখা। বিস্কো বলল। কালো লোকটা আর কোন কথা বলল না। অন্য লোকটি এগিয়ে এল। ফিস ফিস করে বলল–এখান থেকে পালানো যায় না?
–কী করে পালাব? দরজায় দুজন প্রহরী বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। পালাতে গেলে মরতে হবে। বিস্কো বলল।
-একটা উপায় বের করতে হবে। লোকটা বলল।
–দেখি কয়েকটা দিন। সিনেত্রা বলল।
সেদিন কাটল।
ওদিকে ফ্রান্সিসরা চিন্তায় পড়ল। বিস্কো সিনেত্রা জল আনতে গিয়ে সারা রাতেও ফিরল না।
পরদিন সকালে শাঙ্কো বলল-আমি একা যাচ্ছি। জাহাজে জলের অভাব। জল তো আনতে হবে।
–বেশ যাও। তবে বিপদ দেখলে পালিয়ে এসো। কোনকমে ওদের দুজনের খোঁজ নিয়ে এসো। তেমনঅবস্থা দেখলে আমরা সবাইযাবো। আরতরোয়াল নিয়ে যেওনা। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো জাহাজ থেকে নেমে এল। চলল। বাড়িঘরগুলোর দিকে।
বাড়িঘরগুলোর কাছে আসতে দু’জন বর্শাধারী যোদ্ধা ছুটে এলো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। বালিয়ারির মধ্যে দিয়ে জাহাজের দিকে ছুটল। কিন্তু পালাতে পারল না। বালির ওপর দিয়ে দৌড়ানো যায় না। পা আটকে আছে। যোদ্ধারা বালির ওপর দিয়ে দৌড়াতে অভ্যস্ত। সহজেই শাঙ্কোকে ধরে ফেলল। বর্শা উঁচিয়ে বলল–আমাদের সঙ্গে চলো।
–কোথায় শাঙ্কো জানতে চাইল।
সর্দারের কাছে। যোদ্ধাটি বলল।
–বেশ। চলো। শাঙ্কো বলল। শাঙ্কো সর্দারের কাছে এসে দাঁড়াল। সর্দার পাতায় মোড়া তামাক টানছিল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল–
এই দ্বীপে কেন এসেছো?
–জল নিতে। শাঙ্কো বলল।
–কীসে করে জল নেবে? সর্দার বলল।
বন্ধুদের কাছে পীপে আছে। শাঙ্কো বলল।
–ও। তাহলে যে দুটোকে কয়েদ ঘরে আটকে রেখেছি তারা তোমার।
–হ্যাঁ। শাঙ্কো মাথা ওঠানামা করল।
–তোমরা সবাই চোর। আমার রত্নভাণ্ডার চুরি করতে এসেছে। সর্দার বলল।
–আপনার রত্নভাণ্ডারের নামও আমরা শুনিনি। শাঙ্কো বলল।
–এসব চালাকির কথা। তুমিও বন্ধুদের কাছে যাও। সর্দার বলল।
তার মানে আমিও–শাঙ্কো কথাটা শেষ করতে পারল না।
–হ্যাঁ। বিদেশিদের আমি বিশ্বাস করি না। সর্দার চেঁচিয়ে বলল।
সর্দার কার নাম ধরে ডাকল। একজন যোদ্ধা ঘরে ঢুকল।
