–তরোয়াল ফেলে দাও। লড়তে এলে মরবে। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়েই বলল। যুবকটি বুঝল লড়তে গেলে ওর জীবন বিপন্ন হবে। ও ডেক-এর ওপর তরোয়াল ফেলে দিল। তাতে ঝনাৎ করে শব্দ হল। কেবিন ঘরে ঘুমন্ত যুবকদের ঘুম ভেঙে গেল। তখন ভোর হয়ে এসেছে।
যুবকরা দল বেঁধে তরোয়াল হাতে ওপরে ডেক-এ উঠে এল। খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের দেখে ওরা থমকে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস তরোয়াল ঘুরিয়ে দাঁত চাপাস্বরে বলল– তোমরা যদি লড়াই চাও আমরা লড়াই করবো। কিন্তু আমরা সংখ্যায় বেশি। প্রত্যেকের # হাতেই তরোয়াল রয়েছে। ভুলে যেও না ভয় পাইনা। লড়াইহলে তোমরা কেউ বাঁচবে না।
যুবকরা মৃদুস্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। ওদিকে একটি যুবক মারিয়ার কেবিন ঘরে ঢুকল। মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মারিয়া ডেক-এ আমার জন্যে বিছানা ছেড়ে উঠল। দেখল দরজায় তরোয়াল হাতে একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যুবকটি ছুটে এসে হাতের তরোয়ালের ডগাটা মারিয়ার গলায় চেপে ধরে গম্ভীরগলায় বলল–ওপরে চলো। নিরুপায় মারিয়া দরজার দিকে চলল। ডেক-এ উঠে এল।
ফ্রান্সিস অবাক। মারিয়া এই জাহাজে এলো কী করে? বোধহয় ওদের খোঁজেই মারিয়া এই জাহাজে এসেছিল। তারপর বন্দী হয়েছে।
ফ্রান্সিসরা দেখল যুবকটি মারিয়ার গলায় তরোয়াল চেপে আছে।
এখানে তো মারিয়ার জীবন বিপন্ন।
যুবকটি গলা চাপাস্বরে বলল–সবাই জাহাজ থেকে নেমে যাও। তারপর রাজা কুতুবুর যোদ্ধাদের হাতে ধরা দাও। নইলে তোমাদের এই সঙ্গিনীকে মেরে ফেলবো।
কেউ কিছু বোঝার আগেই শাঙ্কো দ্রুত গলার দিক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওর ছোরাটা বের করল। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে যুবকটির বুক লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। শাঙ্কোর নিশানা নিখুঁত। ছোরাটা যুবকটির বুকে বিঁধে গেল। ও চিৎহয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। ও এপাশ ওপাশ করল। তারপর স্থির হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস বুঝল আবার মারিয়াকে হত্যার চেষ্টা হবে। এক মুহূর্তে দেরি না করে ও তরোয়াল হাতে যুবকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–ও হো হো। তারপর ওরাও যুবকদের ঠোকাঠুকির ধাতব শব্দ। সুযোগ বুঝে মারিয়া ছুটে এসে ফ্রান্সিসদের পেছনে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস প্রথম সুযোগেই একজন যুবকের বুকে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল। ও চিৎ হয়ে ডেক-এর ওপর পড়ে গেল। লড়াই চলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সংখ্যায় বেশি ভাইকিংদের কাছে যুবকরা হার স্বকার করতে লাগল। কেউ কেউ আহত হয়ে ডেক-এ পড়ে গেল। দুজন যুবক তরোয়াল ফেলে সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরে তীরে উঠল। তারপর ছুটল রাজবাড়ির দিকে।
আহত যুবকরা জাহাজ থেকে নেমে গেল।
তখনই ভোরের আলোয় দেখা গেল রাজা কুতুবের প্রহরীরা খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে আসছে।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–আর লড়াই না। পাল খোল। দাঁড় ঘরে যাও। নোঙর তোল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজ চালাও।
ততক্ষণে পাল খোলা হয়ে গেছে। দাঁড়াটানতেও ভাইকিং বন্ধুরা চলে গেছে। ফ্লেজার হুইলে দাঁড়াল। নোঙর তোলা হয়ে গেছে।
জাহাজ চলল। অল্পক্ষণেরমধ্যেই জাহাজগতি পেল। রাজা কুতুবুর প্রহরীরা ভাঙা জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ ধরবার জন্যে ওরাও ভাঙা জাহাজ চালাল। কিন্তু তাদের জাহাজ তেমন গতি পেল না। ফ্রান্সিসদের জাহাজের সঙ্গে তাদের জাহাজের দূরত্ব বেড়েই চলল।
প্রহরীরা হাল ছেড়ে দিল। ওদের জাহাজ থেমে গেল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলল।
ভাগ্য ভালো। ওদের ঝড়ের মুখে পড়তে হল না।
একদিন পরে। জাহাজে জলাভাব দেখা দিল।
চারটে পীপের মধ্যে মাত্র একটা পীপেয় অর্ধেক জল আছে। তিনটি পীপেই ফাঁকা।
হ্যারি ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস কী করবে?
–পেডোকে বল–ভালো ভাবে নজর রাখতে। কোন দ্বীপটীপ দেখা যায় কিনা।
জাহাজ চলল। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে নজর রেখে চলেছে।
পরদিন দুপুরের দিকে পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল ডাঙা দেখা যাচ্ছে ডাঙা। বিস্কো ফ্রান্সিসকে ডেকে নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে গেল। বলল।
–একটা দ্বীপমত দেখা যাচ্ছে। কত বড় দ্বীপ বা এই দ্বীপে মানুষ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। দ্বীপের কাছে যাও। জাহাজ ভেড়াও। জল নিতে হবে।
দ্বীপটা বেশি বড় নয়। তবে বেলাভূমি বিস্তৃত। ফ্রান্সিস আরসিনাকে জল আনতে যেতে বলল। দুজনে কিছু আগেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। জাহাজ থেকে পাটাতন ফেলা হল।
শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল–ফ্রান্সিস আমি গেলে ভালো হত না। –না-না। জল আনবো। এইজন্যে তোমার মাস্তুলের দরকার নেই। ফ্রান্সিস বলল
বিস্কো আর সিনেত্রা দুটো খালি পীপে নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে এল। বালিয়াড়ি পার হয়ে চলল। কিছুদূরেই কয়েকটা ঘরবাড়ি দেখল।
–চলো। ওখানকার লোকদের কাছে জলের খোঁজ করি। বিস্কো বলল।
–চল। সিনেত্রা মাথা নেড়ে বলল।
বাড়িগুলোর কাছাকাছি এসে দেখল। সব কালো নারীপুরুষ বাচ্ছা-ছেলেমেয়ে। বোঝা গেল এখানে কালো লোকয়জনেরই বাস।
বর্শা হাতে এক যুবক ওদের দিকে এগিয়ে এল। বলল-তোমরা কে?
–আমরা বিদেশি–ভাইকিং। বিস্কো বলল।
–এখানে কেন এসেছো? যোদ্ধাটি জিজ্ঞেস করল।
–আমরা জাহাজে চড়ে এখানে এসেছি। জাহাজে খাবার জল ফুরিয়ে এসেছে। তাই খাবার জল নিতে এসেছি। বিস্কো বলল।
