যোদ্ধা-সর্দার লোকটির কাছে গেল মাথা একটুনুইয়ে সম্মান জানিয়ে কিছু বলে গেল। ডাব ছুঁড়ে ফেলে লোকটি ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর ফ্রান্সিসদের এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল।
যোদ্ধা-সর্দার মৃদুস্বরে বলল-রাজা কুতুবুর কাছে যাও।
ফ্রান্সিসরা রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। রাজা কুতুবুবলল–তোমরা বিদেশী? আশ্চর্য তোমরা সবাই নতুন জামাকাপড় পরে আছো।
–হুঁ। আমরা ভাইকিং। জাহাজে চড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই।
–উদ্দেশ্য? রাজা কুতুবু কুৎকুতে চোখে তাকিয়ে বলল।
–কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। গুপ্তধন ভাণ্ডারের কথা জানতে পারলে সেসব বুদ্ধি খাঁটিয়ে পরিশ্রম করে উদ্ধার করি।
তারপর গুপ্তধন চুরি করে জাহাজে চড়ে পালাও। রাজা কুতুবু বলল।
–না। গুপ্তধনের যিনি প্রকৃত মালিক তাকে দিয়ে দি। ফ্রান্সিস বলল।
বিশ্বাস হচ্ছেনা। যাক গে–তোমরা আমার জাহাজ চুরি করতে এসেছো। তোমাদের সাহসতো কম নয়। কুতুব বলল
–আমরা আপনার জাহাজ চুরি করতে আসি নি। ঐ জাহাজটা আমাদের। হিচকক দ্বীপের একজন লোক ঐ জাহাজটা চুরি করে আপনার লোকজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। তাই আমরা আমাদের জাহাজের খোঁজে এসেছি। অনুরোধ আমাদের জাহাজটা আমাদের ফিরিয়ে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
কক্ষনো না। ঐ জাহাজ আমার। কুতুবু গলা চড়িয়ে বলল।
–ঠিক আছে। আমরা ফিরে যাচ্ছি।
না। তোমাদের কাউকে ছাড়া হবে না। তোমাদের এখানে বন্দী হয়ে থাকতে হবে।
—আমাদের অপরাধ?
–তোমরা জাহাজ চোর। আমার জাহাজ চুরি করতে এসেছিলে। তার শাস্তি পেতে হবে। কুতুবু বলল।
–আমরা যে জাহাজটা চড়ে এসেছি সেই জাহাজটা আপনি রাখুন আমাদের জাহাজটা আমাদের ফিরিয়ে দিন। হ্যারি বলল।
–তোমরা যে জাহাজ চড়ে এসেছে সেটাও চোরাই জাহাজ। আমার সর্দার তাই বলছে। কুতুব বলল।
আমাদের ওপর মিথ্যে অপবাদ। ফ্রান্সিস বলল।
–কোন কথা শুনতে চাই না। রাজা কুতুবু বলল।
তারপর যোদ্ধা সর্দারকে বলল কয়েদী মাঠেনিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখ। দেখিস্ পালাতে না পারে। জাহাজ চোরের দল। কুতুবু বলল।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না।
যোদ্ধারা আবার ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। নিয়ে চলল একটা জঙ্গলের দিকে।
জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ। সেই পথ দিয়ে সবাই চলল। ফ্রান্সিস দুদিকে ভালোভাবে তাকাতে তাকাতে চলল। একটা শুকনোমরা গাছ দেখল ডানদিকে। ঘন জঙ্গ ল নয়। গাছপালা ছাড়া ছাড়া।
কিছু পরে সবাই একটা ঘাসে ঢাকা ফাঁকা জায়গায় এল। ফাঁকা জায়গাটা প্রায় গোল। চারদিকে কোন পাথরের দেওয়াল বা গাছের ডাল পুঁতে রাখা হয়নি।
সর্দার যোদ্ধা বলল–কয়েদী মাঠের মাঝখানে গিয়ে তোমরা বসো।
ফ্রান্সিসরা মাঠটার মাঝামাঝিজায়গায় এল। তারপর ঘাসের ওপর বসে পড়ল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। তখনই দেখল আরো কয়েকজন মানুষ হাত-পা বাধা অবস্থায় বসে অছে। বোঝা গেল ওরাও বন্দী।
একটু পরেই সর্দার যোদ্ধা কয়েকজন যোদ্ধকে নিয়ে এল। যোদ্ধারা ফ্রান্সিসদের হাত-পা শক্ত শুকনো লতাগাছ দিয়ে বাঁধতে লাগল। ফ্রান্সিস হাতমুছড়ে বুঝল বুনে লতা বেশ শক্ত। দড়ি বাঁধলে তবু সহ্য করা যায়। কিন্তু এই শুকনো বুনোলতা হাতে পায়ে যেন কেটে বসছে।
দুপুর হয়ে এল। শাঙ্কো একজন যোদ্ধার দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল–আমাদের খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। খাবার জল দাও।
–চেঁচিও না। অপেক্ষা কর। যোদ্ধা সর্দার বলল।
হাত-পা বাঁধা শেষ হল।
একটু পরেই নারকেল গাছের গুড়ি কুঁদে বড় পাত্ৰ মত করার পাত্র নিয়ে কয়েকজন এল। মাটির পাত্রে জল। সবার সামনে পাতা দেওয়া হল। ভাত সামুদ্রিক মাছের ঝোলমত দেওয়া হল।
হ্যারি যোদ্ধা সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলল–হাত-বাঁধা। খাবো কী করে?
ওভাবেই খেতে হবে। রাজার হুকুম। যোদ্ধা সর্দার বলল।
ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা কেউ আর কোন কথা বলল না। বেশ অসুবিধার মধ্যেই ওরা খাবার খেয়ে নিল।
সান্ধ্য হল। ফ্রান্সিসরা কোনরকমে শুয়ে বসে রইল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। চারপাশে সব কিছু মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শাঙ্কো ফ্রান্সিসেরকাছে এল। ফিসফিস করে বলল–ছোরাটা বেরবো?
না আজকে নয়। দু-একদিন যাক। আমরা নতুন। ওরা এখন আমাদের কড়া পাহাড়ায় রাখবে। ফ্রান্সিস বলল।
–প্রহরীই তো নেই। শাঙ্কো বলল।
রাজবাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো ঝাউ গাছটার নিচে তিনজন প্রহরী বসে আছে। ফ্রান্সিস আস্তে বলল।
–মাটিতে বসে আছে? শাঙ্কো বলল।
–না। নারকোল গাছের কাটা কাঠের ওপর। আমি অনেকক্ষণ যাবৎ লক্ষ্য করছি। তাই দেখতে পেয়েছি।
–তাহলে পালাব না? শাঙ্কো বলল।
নিশ্চয়ই পালাবো। সমস্ত সুযোগ বুঝে। ফ্রান্সিস আস্তে বলল।
সকলের খাবার খাওয়া হল। হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই। বাঁধা হাত নিয়ে খাওয়া। অর্ধেক খাবারই পড়ে গেল। কিন্তু ওরা বুঝল এই অবস্থাতে থাকতে হবে। পালাতে না পারলে এই জীবনই মেনে নিতে হবে।
দুপুরে রাজা কুতুবু এল। হাতের শেকলে বাঁধা একটা অ্যালশেসিয়ান কুকুর। ফ্রান্সিসদের ঐ অবস্থায় দেখে কুকুরটা ঘেউ ঘেউ শুরু করল। বিরক্তির সঙ্গে শাঙ্কো বলে উঠল কুকুরের ডাক থামান।
–তোমাদের বিদেশি দেখে তো তাই ডাকছে। চিনে গেলে আর ডাকবেনা। কালো মুখে সাদা দাঁত বেরকরেকুতুবু হেসে ফেলল। তারপর বলল–ভাবছি তোমাদেরভাঙা জাহাজটা বিক্রি করে দেব। কী হবে আর ঐ জাহাজটা রেখে। তোমরা তো আর ঐ ভাঙা জাহাজে এই জীবনে আর চড়তে পারবেনা। বিক্রি করে মাঝখান থেকে আমার কিছু স্বর্ণমুদ্রা আয় হবে।
