–কার জ্বর এসেছে?
–যে ছেলেটি তোমার হয়ে চাবুক খেলো।
–এ্যাঁ বলো কি!
হ্যারি তখন আঙ্গুল দিয়ে ফ্রান্সিসের কুন্ডলী পাকানো শরীরটা দেখালো। ফ্রেদারিকো কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল–আমাকে বাঁচাতে গিয়ে–ঈস্! আমি কী করি এখন?
ফ্রেদারিকো নিজের কষ্টের কথাও ভুলে গেল।
–বেঞ্জামিন তো তোমার কথা শোনে, ওকে একবার বলে দেখো।
–ভালো বলেছে, কিন্তু ও কী অতটা করবে? রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। এঁটো থালা, গ্লাস নিতে প্রহরী দু’জন এসেছে। বেঞ্জামিন ওদের পেছনে এসে দাঁড়াল। ওরা থালা নিয়ে বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ করবে। প্রহরী দু’জন থালা গ্লাস নিয়ে চলে গেল। চকিতে ওদের যাওয়ার পথের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বেঞ্জামিন দ্রুতপায়ে ফ্রেদারিকোর কাছে এলো। নীচু হয়ে বসে ফিসফিস্ করে জিজ্ঞেস করলো ফ্রেদারিকো–কেমন আছো?
ফ্রেদারিকো মাথা নেড়ে বলল, আমার কথা বাদ দাও, ঐ ছেলেটাকে একটু দেখো তো, ভীষণ জ্বর এসেছে ওর।
বেঞ্জামিন একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর কোন কথা না বলে উঠে চলে গেল।
ফ্রান্সিস তখন জ্বরের ঘোরে বেঁহুশ। ও যেন স্বপ্নের মত স্পষ্ট দেখতে পেলো, ওদের বাড়িটা বাগানটা সূর্যালোকে ঝম করছে। গাছপালা, ফুল কী, হাওয়া। উজ্জ্বল আলোয় ভরা মধ্য বসন্তের আকাশ। ও বাগানের দোলনায় দোল খাচ্ছে। হাস্যোজ্জ্বল মা’র মুখ। ওর দোলনা ঠেলে দিচ্ছে। ও উঁচুতে উঠে যাচ্ছে নেমে আসছে। ছোটবেলার একটা আলোকোজ্জ্বল দিন ও যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। একজন পরিচারিকা কী নাম যেন, ওর মাকে এসে ডাকলো। ওর মা চলে গেল। পরিচারিকাটি দোলনা ঠেলে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস চাঁচাচ্ছে আরো উঁচুতে ঠেল, আরো উঁচুতে। পরিচারিকাটি ভীতস্বরে বলছে–না, কর্তামা বকবে। তবু সে বেশ জোরেই ঠেলতে লাগল। ফ্রান্সিসের চোখের সামনে আকাশ, সাদাটে মেঘ, ঘরবাড়ি, গাছ-বাগান সব দুলছে। গায়ে হাওয়া লাগছে। ও খুশীতে চিৎকার করছে। হঠাৎ ছবিটার উজ্জ্বলতা কমতে লাগল। আস্তে-আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক। মাথাটা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে।
কয়েদ ঘরের লোহার দরজা খোলার শব্দ হলো। বেঞ্জামিন কী যেন একটা জিনিস লুকিয়ে নিয়ে আসছে। ও চুপিচুপি এসে ফ্রেদারিকোর হাতে একটা চিনেমাটির ছোট বোয়াম দিয়ে ফিফিস্ করে বললো–এটা ওর পিঠে আস্তে-আস্তে লাগিয়ে দাও, তুমিও লাগাও, সব সেরে যাবে। পরে ওটা নিয়ে যাবো। সাবধান, কেউ যেন না দেখে ফ্যালে। বলে কাঠের পাটাতনে কোন শব্দ না তুলে বেঞ্জামিন চলে গেলো।
হ্যারি বোয়ামটা ফ্রেদারিকোর হাত থেকে নিলো। তারপর আস্তে-আস্তে ফ্রান্সিসের পিঠে লাগিয়ে দিতে লাগলো। লাল আঠা-আঠা ওষুধটা। ওটা লাগাতেই ফ্রান্সিসের শরীর কেঁপে উঠলো। হ্যারি সাবধানে আলতো হাতে লাগাতে লাগলো। কেটে যাওয়া কালসিটে পড়া জায়গায় লাগানো শেষ হলো। কে জানে এটা কী ওষুধ? সারবে কিনা? এবার ফ্রেদারিকোর দিকে ফিরলো। ওর শতচ্ছিন্ন জামাটা সরিয়ে ওষুধটা লাগিয়ে দিল আস্তে আস্তে। ফ্রেদারিকো অস্পষ্ট স্বরে গোঙাতে-গোঙাতে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়লো। রাত বাড়তে লাগলো। আস্তে-আস্তে সবাই ঘুমিয়ে পড়তে লাগলো। শুধু হ্যারির চোখে ঘুম নেই। হাতকড়া বাঁধা হাতটা দিয়ে মাঝে-মাঝেই ফ্রান্সিসের কপালের উত্তাপটা দেখছে।
রাত গম্ভীর হতে বেঞ্জামিন পা টিপে টিপে এলো। ওষুধের বোয়ামটা নিয়ে চলে গেল খুব সাবধানে। দু’জন প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে।
সেই রাত্রির দিকে হ্যারির একটু তন্দ্ৰামত এসেছিল। ফ্রান্সিস বোধহয় পাশ ফিরে শুলো, তাই শেকলে শব্দ উঠলো। হ্যারির তন্দ্রা ভেঙে গেল। ও তাড়াতাড়ি ওর কড়া লাগানো হাতটা ফ্রান্সিসের কপালে রাখল। দেখলো, কপাল ঠান্ডা। বোধহয় জ্বর একেবারে ছেড়ে গেছে। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে হ্যারিকে ডাকতেই হ্যারি মুখ নীচু করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল–কি?।
ফ্রান্সিস বললো–শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে।
–ও কিছু না–কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে–হ্যারি বলল।
তারপর কড়া লাগানো হাতটা দিয়ে ফ্রান্সিসের কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস আবার ঘুমিয়ে পড়লো। হ্যারি আর ঘুমোল না। ফ্রান্সিসের কপালে মাথায় হাত বুলোত লাগলো।
সকাল হয়ে গেছে। সকলেই উঠে বসেছে। শুধু ফ্রান্সিস আধশোয়া হয়ে। শরীরের দুর্বলতাটা এখনও সম্পূর্ণ কাটে নি। ওদের সকালে বরাদ্দ খাবার আলুসেদ্ধ আর কফিপাতা মেশানো সূপ। সকলেই খাচ্ছে। ফ্রেদারিকো তখন হ্যারিকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার বন্ধু কেমন আছে?
–মনে হচ্ছে জ্বরটা ছেড়েছে। তবে শরীরটা এখনও দুর্বল আছে।
–বন্ধুর নাম কি?
–ফ্রান্সিস।
ঠিক এই সময়ে বেঞ্জামিন খাবারের থালা নিয়ে এলো। ফ্রেদারিকো ইশারায় ওকে ডাকলো। কাছে আসতে মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে বললো ঐ যে ছেলেটি ফ্রান্সিস, ওকে আমার সঙ্গে রাখো। বেঞ্জামিন সাবধানে চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো। তখন আর দু’জন প্রহরী খেতে গেছে। বেঞ্জামিন চাবি বের করে ফ্রান্সিসের কাছে এসে ওর হাতের কড়া খুলে দিল। তারপর বললো–তুমি ফ্রেদারিকোর পাশে থাকবে। এসো।
ফ্রান্সিস আস্তে-আস্তে উঠে ফ্রেদারিকোর পাশে বসলো। ওখানে ওর হাতকড়া আটকে দিয়ে বেঞ্জামিন চলে গেল। এবার হ্যারি আর ফ্রান্সিস ফ্রেদারিকোর পাশেই জায়গা পেল। ফ্রান্সিসও এটাই চাইছিল। কিন্তু বেঞ্জামিন তো কথা শুনবে না তাই ও কোন কথা বলেনি। ফ্রেদারিকোকে লা ব্রুশ মুক্তোর সমুদ্রের কথা জিজ্ঞেস করেছে। মুক্তোর সমুদ্র কী? কোথায় আছে এই মুক্তোর সমুদ্র? কথাটা শুনে পর্যন্ত ফ্রান্সিসের মনে তোলপাড় চলছে। ফ্রেদারিকোর পাশে বসতেই ফ্রেদারিকো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল–তুমি আমাকে চাবুকের মার থেকে বাঁচিয়েছে ফ্রান্সিস, তোমার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারবো না।
