রাজা সুমালী কয়েকবার মাথা চুলকে বললেন–ঠিক আছে। তারা মুক্তো তুলবি। রাজসভায় উপস্থিত প্রজারা উচ্চকণ্ঠে রাজার নামে জয়ধ্বনি দিল।
তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–এই পাগলা মনভুলা রাজা আর একটি কাণ্ড করেছিলেন। সেটা জানা গেল তার মৃত্যুর পূর্বক্ষণে।
তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়।
হঠাৎ ঘোষণা করলেন–আমি ইনকা কর্মকারদের সাহায্যে একটা সম্পূর্ণ সোনার ঘর তৈরি করিয়েছে। সেটা আমি অত্যন্ত গোপনে করিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হল আমি যে মাপকাটি ব্যবহার করেছিলাম সেটা হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানি না সেটা কোথায়? কাজেই একমাত্র নির্ভর উত্তরপুরুষরা। তারা যদি সেই সোনার ঘর আবিষ্কার করতে পারে। আমি কোন সূত্রও দিয়ে যেতে পারলাম না।
রাজা সুমালী মারা গেলেন।
রাজা সুমালী ঘরটি তৈরি করেছিলেন অত্যন্ত গোপনে। যে দরজা জানালাহীন ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল সেটাকে চারদিক দিয়ে দেওয়াল গাঁথা হল। একটা মাত্র দরজা। তাও তালাবন্ধ। গভীরভাবে ইনকা কর্মকারেরা আগুনের উনুন জ্বেলে মোম গলিয়ে সোনার ঘরে ঢালে। আস্তে আস্তে সোনার ঘর তৈরি হয়। বেশ সময় লেগেছিল। সেই কাজের সময় ধারেকাছে কাউকে যেতে দেওয়া হত না, এমন কি প্রহরীদেরও না।
রাজা সুমালীর প্রচুর ফাসম্পদ ছিল। দু’তিন পুরুষের সঞ্চয়। কাজেই একটা ছোট ঘর নিশ্চয়ই তৈরি করার মত সোনা তার ছিল।
সোনার ঘর তৈরির চিন্তাটাই পাগল রাজার মাথায় এসেছিল কেন সেটা বোঝার উপায় ছিল না। পাগলের খেয়াল।
–তাহলে সেই সোনার ঘর কেউ উদ্ধার করতে পারে নি। ফ্রান্সিস বলল।
–না। তোমরা চেষ্টা করবে? ডেভিড বলল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
–তাহলে মন্ত্রীমশাইয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলতে পারো। মন্ত্রীমশাই খুব ভাল মানুষ। ডেভিড বলল।
–দেখি ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা নিজেদের জাহাজে ফিরে এল। ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরে ঢুকল। মারিয়া চুপচাপ বসেছিল। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া তোমার এ দেশের অতীতের এক রাজার কথা বলি। সে এক বিচিত্র কাহিনী।
হ্যারি দরজায় এসে দাঁড়াল।
–এসো এসো হ্যারি। এই হিচকক দ্বীপের অতীতের এক রাজার কাহিনী বলি।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে শোনা কাহিনী সব বলল। সব শুনে মারিয়া হ্যারি দুজনেই অবাক।
–সেই সোনার ঘর তাহলে হিচকক দ্বীপে আছে? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। কোথায় আছে সেটার খোঁজখবর করতে গেলে ওখানে যেতে হবে। সব দেখতে হবে জানতে হবে। মারিয়ার মুখ ভার হল। আস্তে আস্তে বলল–তার মানে আরো কিছুদিন এখানে থাকতে হবে।
হ্যাঁ মারিয়া। কী করবো বলো। আমার ভালো লাগে এসব। কী হবে দেশে ফিরে? সেই তো খাও দাও ঘুমোও এর জীবন। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু আমার তো বাবা মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। মারিয়া বলল।
–খুবই স্বাভাবিক। তবু বলে মারিয়া এই কষ্টটা মেনে নাও। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ মারিয়া আর কোন কথা বলল না।
এরমধ্যে ভাইকিংরা পাগলারাজা সুমালীর কাহিনী শুনে নিয়েছে। ফ্রান্সিস সোনার ঘর খুঁজে বের করার পরিকল্পনা নিয়েছে তাও জানল ওরা।
সেদিন শাঙ্কো ছুটতে ছুটতে এল। খুবখুশী। শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল উৎসব উৎসব
–কীসের উৎসব? হ্যারি জানতে চাইল।
–এই হিচকক দ্বীপে প্রতিবছর এই দিনে সমুদ্র পূজা হয়। মেলা বসে সমুদ্রতীরে। রাজা রানি আসেন। রাজ পুরোহিত ফুলপাতা দিয়ে সমুদ্র পূজা করে। শাঙ্কো বলল।
–সমুদ্র পূজা কথাটা নতুন শুনলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস হ্যারি হেসে বলল–আমরাও তো তরোয়ালি পূজা করেছিলেন।
ফ্রান্সিস হেসে ফেলল। বলল–ঐ তরোয়ালপূজা করেই তো পালাতে পারলাম।
তুমি মাথা থেকে জব্বর পরিকল্পনা বের করেছিলে। কত লোক সমুদ্রতীরে জড়ো হয়েছে। মেলা বসেছে। নানা দোকানপাট বসেছে। জৈার কেনাকাটা চলছে। আমরাও যাবো।
–বেশ। সবাই যাবো। এরকম মেলাটেলায় তো যাওয়া হয় না।
–দেশের মেলার কথা মনে করিয়ে দিলে ফ্রান্সিস। মনটা খারাপ হয়ে গেল। হ্যারি একটু ভারি গলায় বলল।
–পাগল। ওসবনিয়ে ভেবোনা। আমরাকি কোনদিন দেশে ফিরবোনা? ফ্রান্সিস বললো।
–সত্যিই কি দেশে ফিরে যেতে পারবো ফ্রান্সিস? হ্যারি বলল। হা। এটা ঠিক কয়েকজন বন্ধুকে আমরা হারিয়েছি। এটা তো স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে কত কত দ্বীপে, দেশে ঘুরে বেড়ালাম। বিপদ আপদ তো হবেই। এর জন্যে ভয় পেয়ে দেশে ফিরে যাওয়া কোন কাজের কথা নয়। ফ্রান্সিস বলল আমরা এখনই যাবো।
–ঠিক আছে। বন্ধুদের বল। সবাইকে খবর দিতে শাঙ্কো প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরে গেল। দেখল মারিয়া সঁচ-সুতে দিয়ে ছেঁড়া পোশাক সেলাই ফোঁড়াই করছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল–মারিয়া–অনেকদিন তো মেলা-টেলা দেখনা।
সমুদ্রের জলে মেলা বসে? হু! মারিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল।
না ডাঙাতেই বসে। মেলায় যাবে? ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া হাঁ করে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস জানে মেলায় লোকজন দোকানপাট এসব দেখলে মারিয়া সবচেয়ে খুশি হয়।
–কী বলছো বুঝে উঠতে পারছি না। মারিয়া বলল। এসোসমুদ্রের ধারে কত লোক এসেছে। ডেক-এ উঠে দেখে এসোসমুদ্রের ধারে কত লোক এসেছে। মেলা। বসেছে? ফ্রান্সিস বলল।
-বলো কি। দেখি তো! মারিয়া হাতের কাজ রেখে দরজার দিকে ছুটল।
একটু পরেই ফিরে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মেলা দেখতে যাবো।
