–রাজা সামুল। ভীষণ রগচটা না? কারো কথায় ব্যবহারে একটু এদিকওদিক দেখলেই কয়েদ ঘর। আমাদেরও ধরেছিল। বলেছিল–নিশ্চয়ই তোমাদের জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র আছে।
বললাম–আমরা ব্যবসায়ী মানুষ। অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আমরা কী করব? বিশ্বাস করল না আমাদের জাহাজ তল্লাসী করল। বিপদ হল–আমরা তরোয়াল বর্শা তৈরি করি জমা করি। বিক্রি করি। একটা ঘরে এসব জমা রাখতাম। কিন্তু সেসব পাচার করার সময় পেলাম না। ধরা পড়ে গেলাম। রাজা মামুলির সে কি রাগ। আমাদের এই মারে তো সেই মারে। আমাদের পাঁচদিন কয়েদঘরে আটকে রাখলো পরে কী ভেবে কে জানে আমাদের সমস্ত অস্ত্রপাতি নিয়ে আমাদের মুক্তি দিল।
মুক্তি পেয়ে আমরা আর জাহাজে ফিরলাম না। কখন আবার আমাদের ধরে। উঠলাম গিয়ে এক সরাইখানায়।
সেখানে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনলাম। সেদিন গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কে গোঙাচ্ছে। কে? সরাইখানায় অনেকেই ঘুমিয়ে আছে। শুনলাম, একটা কোণ থেকে কাতরানোর শব্দ ভেসে আসছে। একটু দেখতে হয়। কী ব্যপার? বিছানা ছেড়ে উঠলাম। সেইদিকে গেলাম। একটা আলোঅন্ধকারে দেখলাম এক বৃদ্ধ শুয়ে গোঙাচ্ছে। বৃদ্ধের মুখের ওপর ঝুঁকে বললাম–আপনি কি অসুস্থ? বেশ কষ্ট করে বৃদ্ধ বলল—হ্যাঁ। আমি বাঁচবোনা। কথাটা মিথ্যে নয়। সত্যিই বৃদ্ধ গুরতর অসুস্থ। বৃদ্ধহাঁপাতে হাঁপাতে বলল– আমার কাছে একটা জিনিস আছে। সেটা কাকে দিয়ে যাবো তাই আমার চিন্তা।
–সেটা কী? আমি জানতে চাইলাম।
–একটা পেতলের মাপকাঠি। বৃদ্ধ বলল—
–একটা মাপকাঠি নিয়ে এত ভাবছেন কেন? আমি বললাম।
সব ঘটনা শুনলে তুমি বুঝতে পারবে। ডেভিড বলল–এবার সেই বৃদ্ধ যা বলল– তাই বলছি। প্রায় দেড়শো দুশো বছর আগে বর্তমান রাজা মামুনের পূর্ব পুরুষ এক রাজা ছিল। রাজা সুমালী। সেও ছিল এক আধ পাগল রাজা। তার মাথায় বিচিত্র সব চিন্তা আসতো। একদিন সমুদ্রের ধারে বেড়াচ্ছে একটা ঝুনো নারকেল তার কাঁধে পড়ল। রেগে গিয়ে সে এলাকার সব নারকেল গাছ কেটে ফেলার হুকুম দিল। তার বিচিত্র সব কাণ্ড কারখানার কথা শুনলে অবাক হয়ে যাবে।
সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করল রাজা প্রাসাদের বিরাট এক ঘরে ছোট ছোট ঘর তৈরি করলো। কোন ঘরেরই দরজা জানলা নেই। ঘরগুলোর মাঝখান দিয়ে গলি। রাজা সুমালীর শখ–সেই ঘরের আড়ালে আড়ালে গলিপথ দিয়ে ছুটো ছুটি করে লুকোচুরি খেলবেন।
সেই খেলা যেদিন শুরু হল প্রাসাদের বাইরে রাজ্যের লোক ভেঙে পড়ল। দুপুরে রাজা সুমালী এলো। মন্ত্রী সেনাপতি অমাত্যরা সবাই এলেন। পাকা দাড়ি গোঁফের ভিড়। তারা ঘরের আড়ালে আড়ালে লুকোচুরি খেলা শুরু করল। সেকিউৎসাহ কী উদ্দীপনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলা জমে গৈল। বুড়োদের সে কিছুটোছুটি। প্রজারা হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিতে লাগল।
কিন্তু হাজার হোক বয়েস তো হয়েছে। কতক্ষণ আর ছুটোছুটি করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়োরা হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। খেলা বন্ধ হয়ে গেল।
আবার পরদিন খেলা হল। এই অদ্ভুত খেলা দেখতে বিদেশী রাজাদের লোকেরাও এল। প্রজারাতো আছেই।
কয়েকদিন পরপর খেলা চলল রাজঅন্তঃপুরের মেয়েরাও খেলা দেখতে এল। সেখানেই খেলা শেষ হতে রানি এসে দাঁড়ালেন। রাজা সুমালীকে ধমক দিয়ে বললেন-বুড়ো বয়েসে ভিমরতি ধরেছে। বন্ধ কর এসব খেলা। এই পরিশ্রম আমাদের সহ্য হবেনা। অকালে মারা যাবেন। এই খেলা আর হবে না।
রাজা সুমালী মাথা চুলকোতে লাগলেন। কী বলবেন বুঝে উঠতে পারলেননা। প্রজাদের সামনে মন্ত্রী অমাত্যের সামনে রাজা বেশ অপ্রস্তুত হলেন।
আর কি। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। রাজা সুমালীর মন খুব খারাপ হয়ে গেল।
ঘরগুলো আর ভাঙা হল না। সেগুলো রয়েই গেল।
পাগল রাজার বিচিত্র সব কাহিনী হিচকক দ্বীপের ধারে সমুদ্রে প্রচুর ঝিনুক। ঝিনুকে বড় বড় মুক্তো। সমুদ্রের ধারে ঝিনুক তুলে মুক্তো খোঁজে যারা তাদের ভিড় লেগেই আছে। দলে দলে লোক ঝিনুক তোলে আর ঝিনুকের মুখ খুলে খুলে মুক্তো বের করে। অনেক লোকের এটাই জীবিকা।
হঠাৎ রাজা সুমালী ঘোষণা করলেন কেউ সমুদ্র থেকে মুক্তো তুলতে পারবে না। শুধু উনি নিজে তুলবেন।
হাতে ছোট জাল নিয়ে রাজা সুমালী একদিন সকালে সমুদ্রের ধারে এলেন। সেদিনও প্রজাদের সে কি ভিড়।
মুক্তোশিকারীদের মতই রাজার পরনে নেংটি। জাল হাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। উঠলেন একটু পরেই। জালে পড়া ঝিনুক। জাল নিয়ে পাড়েরাখলেন। এক সৈন্যকে বললেন– এ্যাই সব ঝিনুক ভাঙ। দ্যাখ-মুক্তো পাস কিনা। সৈন্যটি ঝিনুক ভাঙতে লাগল।
রাজা আবার নামলেন জলে। কিছুক্ষণ পরেই উঠে এলেন। জাল ভর্তি ঝিনুক। আবার এক সৈন্যকে বললেন–ঝিনুক ভাঙ।
ঝিনুক ভাঙা হতে লাগল। রাজার ভাগ্যি। দু দফায় ঝিনুকে দুটো বড় মুক্তো পাওয়া গেল। সমবেত প্রজারা রাজার জয়ধ্বনি দিল–রাজা সুমালীর জয় হোক। রাজা সুমালীও খুশি। সগর্বে চারিদিক তাকাতে তাকাতে পোশাক পরলেন। রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলেন।
মুক্তো শিকারীদের জীবিকাই ছিল এটা। তারা রাজার দরবারে গেল। নিজেদের সমস্যার কথা বলল। রাজা অনড়-না–শুধু আমি মুক্তো তুলবো।
এবারেও রানিই প্রজাদের বাঁচালেন। রানি রাজসভায় প্রজাদের বললেন–দাঁড়াও। আমি দেখছি। রাজার দিকে চেয়ে বললেন-তোমার কি মাথা খারাপের বাকি নেই। ঐ জলে চুবানি খেয়ে মুক্তো তুলতে যাচ্ছ? বন্ধ কর এসব। মুক্তো শিকারীরা এই মুক্তো বিক্রী করে সংসার চালায় বেঁচে আছে, আর সেটা তুমি বন্ধ করে দিতে যাচ্ছ?
