অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের জাহাজের পাল ফুলে উঠল। জাহাজ গতি পেল। জলদস্যুদের জাহাজ পেরিয়ে যাবার সময় শাঙ্কো চার জলদস্যুকে দুহাতে ধরে ঘোরাতে ঘোরাতে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলল।
ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাল। মারিয়া কোথায়? মারিয়া ডেকে উঠে আসেনি। ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল ও দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের কেবিনঘরে এসে দেখল দরজা খোলা। ফ্রান্সিস এক লাফে ঘরে ঢুকল। দেখল মারিয়া চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে। দুচোখ বোঁজা। ফ্রান্সিস দ্রুত কাছে এসে ডাকল মারিয়া-মারিয়া। মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। হাসল।
কী হয়েছে তোমার?
জ্বর হয়েছে। তবে ভাল আছি। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস মারিয়ার কপালে গলায় হাত বুলোল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।
ফ্রান্সিস বলল–কী বলছো? সাংঘাতিক জ্বর। আমি ভেনকে ডেকে আনছি।
একটু পরে ভেন এল। হাতে দুটো বোয়াম। ন্যাকড়া, দুটো পাথর। ভেন মারিয়ার কপালে হাত রাখল।
ঝোলা থেকে দুটো শুকনো ফুল বের করল। পাথর দুটো চেপে ফল দুটো গুঁড়ো করল। ন্যাড়ায় ছাঁকল জল মিশিয়ে হাতের তালুতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তিনটে বড়ি বানাল। মারিয়ার হাতে দিয়ে বলল–এখন একটা খান। রাত্রে একটা খাবেন। কাল সকালে একটা খাবেন। মারিয়া বড়ি তিনটে নিল ফ্রান্সিস কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে এল। মারিয়া একটা বড়ি নিলো।
ভেন চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল–কিছুনা। ঠাণ্ডা লেগেছে।
–তাই হবে। কাল রাত্রে অনেকক্ষণ ডেকএর ওপর ছিলাম। ঠাণ্ডা হাওয়ায় ঠাণ্ডা কি, লেগেছে। তবু ফ্রান্সিসের চিন্তা গেল না। এই বিদেশে এমন কঠিন অসুখ করলে মরিয়াকে বাঁচানোই যাবে না। মারিয়ার কপালে সারা রাত ফ্রান্সিস জলপট্টি লাগল। ভেন এর ওষুধে কাজ হল। পরদিন সন্ধ্যে নাগাদ মারিয়া সুস্থ হল।
সেই বৃদ্ধ লোকটিকে ফ্রান্সিসরা নিজেদের জাহাজেই তুলে নিয়েছিল। ফ্রান্সিসদের সঙ্গেই রইল।
দিন কয়েক পরে।
সেদিন ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–ফ্লেজার কিছু দিকঠিক করতে পারলে?
–কিছুনা। বলতে পারো একেবারে আন্দাজে চলছে জাহাজ।
–শুধু উত্তরদিকটা ঠিক রাখো। ফ্রান্সিস বলল।
–তাই বা পারছি কই। ফ্রেজার বলল।
এ ছাড়া কোন উপায় নেই। দেখি ধারে কাছে কোন দেশ দ্বীপ পাই কিনা। পেলে দিক চেনাটা সহজ হবে। ফ্রান্সিস বলল।
চারপাঁচদিন পরের কথা। সেদিন দুপুরে নজরদার পেড্রো চেঁচিয়ে বলল–আমাদের দেশের এক জাহাজ যাচ্ছে। জাহাজে দেশের পতাকা উড়ছে। ফ্রান্সিসকে বলো। বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এল, বলল–আমাদের দেশের একটা জাহাজ আমাদের জাহাজের খুব কাছে। ওদের সঙ্গে কথা বলব?
–নিশ্চয়ই। দেশবাসী বলে কথা। চলো ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল।
–আমাদের কাছে যে কোন পতাকাই নেই। ওরা বুঝতে পারেনি। বিস্কে বলল।
–আমাদের জাহাজে অনেকদিন আগেই ছিঁড়ে উড়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্লেজার তাদের জাহাজ নতুন জাহাজের কাছাকাছি আনল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে। বলল–ভাই তোমরা কি ভাইকিং? ভাইকিং দেশ থেকে এসেছো?
–হ্যাঁ। ঐ জাহাজের একজন গলা চড়িয়ে বলল। ফ্রান্সিসদের জাহাজের ভাইকিং বন্ধু ধ্বনি তুলল–ও হে বো। ঐ জাহাজ থেকেও ভাইকিংরাও গলা মেলাল। সবাই আনন্দ করতে লাগল।
জাহাজ দুটো গায় গায় লাগল। ফ্রান্সিস লাফিয়ে ঐ জাহাজে গেল। ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমাদের দলনেতা। এজন বেশ শক্তসমর্থ যুবক এগিয়ে এল। বলল– আমি। ডেভিড।
–আমি ফ্রান্সিস তোমরা এদিকে এসেছো কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
ব্যবসা করি আমরা। বড় বড় বন্দর থেকে দড়িপালের কাপড় সস্তায় কিনে বিভিন্ন ছোট ছোট বন্দরে বিক্রি করি।
–তোমরা গুপ্তধনের সন্ধান করো না? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–না-না। ডেভিড মাথা নাড়ল।
–আমরা তাই করি। অনেক গুপ্তধন আমরা আবিষ্কার করেছি। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে, গুপ্তধন খুঁজে বের করতে আমরা আনন্দ পাই। ফ্রান্সিস বলল।
বদলে তোমরা কি পাও? ডেভিড জানতে চাইল।
–কিছুইনা। ফ্রান্সিস বলল।
–সেকি কত কষ্ট করে গুপ্তধন খুঁজে বের করলে অথচ বিনিময়ে কিছুই নাও না। ডেভিড বলল।
–হ্যাঁ। ওটাই আমাদের নীতি। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো বহু দেশ ঘুরেছো? ডেভিড বলল।
অনেক অনেক দেশ। ফ্রান্সিস বলল।
–দেশে ফিরবে না? ডেভিড জানতে চাইল।
–সেটাই আর হয়ে উঠবে না। ফ্রান্সিস বলল।
ডেভিড হঠাৎ বলল–দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি তোমার নাম বললে ফ্রান্সিস।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
–তুমি আর তোমার বন্ধুরাই কি সোনার ঘণ্টা উদ্ধার করেছো? ডেভিড বলল।
হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা রাজবাড়িতে দেখেছি। ডেভিড বলল। তোমাদের বীরত্বের কথা সারা দেশ জানে। তোমাকে চিনতে আমার দেরি হল এজন্য মাফ কর। ডেভিড বলল।
না না তাতে কী? তোমরা কবে দেশে ফিরবে? ফ্রান্সিস বলল।
–মাস ছয়েক পরে। ডেভিড বলল।
–আমরাও দেশে ফেরার চেষ্টা করছি। কিন্তু সমুদ্রপথ হারিয়ে কোথায় যে যাচ্ছি। তার ঠিক নেই।
–সোজা উত্তরমুখো জাহাজ চালাও-দেশে পৌঁছুতে পারবে। ডেভিড বলল।
অন্য জাহাজের ভাইকিংরা এতক্ষণে ফ্রান্সিসের কথা জেনে গেছে। ওরা দলবেঁধে এসে ফ্রান্সিসের সঙ্গে করমর্দন করে গেল। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–তোমরা কোথা থেকে ফিরছ?
–ঐ যে পাহাড়ি দ্বীপ হিচকক ওখান থেকে আসছি। ডেভিড বলল।
–এখন ওখানকার রাজা কে? ফ্রাসিস জানতে চাইল।
