–আমার কথা হবে দলনেতার সঙ্গে। তুমি কে হে? ফ্রান্সিস বলল।
না। না মানে–প্রহরী আমতা আমতা করতে লাগল।
যাও। দলনেতাকে আসতে বল। ফ্রান্সিস হুকুমের সুরে বলল। প্রহরী চলে গেল। কিছু পরে দলনেতা এল। দাঁত ছড়িয়ে হেসে বলল–
–কেমন আছো সব?
—খুব ভালো। শাঙ্কো বলল।
-হা শরীরটা ঠিক রাখো৷ এবার থেকে মাংসও খেতে দেওয়া হবে। দলনেতা বলল।
–তাহলে তো খুবই ভালো। হ্যারি বলল।
এবার ফ্রান্সিস বলল–একটা দরকারি কথা ছিল।
-বলো। দলনেতা উৎসুখ মুখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
–আমাদের দেশের একটা রীতি আছে–তরোয়াল পুজো। ফ্রান্সিস বলল।
–সে আবার কী? দলনেতা বেশ আশ্চর্য হলো।
-বীরত্বের পূজো। সেটা আমরা এখানে করবো। তার জন্য দুটো তরোয়াল লাগবে। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ তো দুটো তরোয়াল নিও। তবে আগেই বলছি, পালাবার মতলব থাকলে কেউ রেহাই পাবে না। দলনেতা চড়া গলায় বলল।
–পালাবার মতলব থাকলেই কি পালাতে পারবো। আপনার কয়েদখানা থেকে পালানো প্রায় অসম্ভব। শাঙ্কো বলল।
প্রায় অসম্ভব মানে? একেবারে অসম্ভব। দলনেতা বলল।
ফ্রান্সিস সাবধান হল। বলল–ঐ একই কথা। এবার দুটো তরোয়াল দিন।
পূজো হবে কখন? দলনেতা জিজ্ঞেস করল।
সন্ধ্যে থেকে শুরু হবে। সারারাত চলবে। হ্যারি বলল।
–ও। জলদস্যুপতি আস্তেআস্তে চলে গেল। যাবার সময় একজন প্রহরীকে বলল– ওদের দুটো তরোয়াল দে। প্রহরী দুটো তরোয়াল দিল।
সন্ধ্যের একটু পরেই ফ্রান্সিসরা দুটো জ্বলন্ত মশালই খুলে নিল। তরোয়াল মশাল নিয়ে চলল নিচে খোলের দিকে। প্রহরীরা বলল কী ব্যাপার? তোমাদের পূজো কোথায় হবে? নিচে। সেলে। মশাল লাগাব। বিস্কো বলল।
নিচে খোলে নেমে এল ওরা। দুজন দুদিকে মশাল ধরে রইল। ফ্রান্সিস একমুহূর্ত দেরি করল না। একটা তরোয়ালের মাথা পাতলা জোড়টায় ঢুকিয়ে দিল। শাঙ্কো একটু দূরে আর একটা তরোয়ালের মাথা ঢোকাল। এবার আস্তে আস্তে চাড় দিতে লাগল। জোড় খুলে যেতে লাগল। খুলতে খুলতে একজন মানুষের শরীরের সমান হল।
সকালের আলো দেখা গেল–নিচে বালি। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–শেষ সমস্যাটা মিটল। ভেবেছিলাম জলের মধ্যে পড়ব। এখন সহজেই নেমে যাওয়া যাবে। কিন্তু ফাঁক তো বেশি নয়। বেশ টেনে হিঁচড়ে শরীরটা জাহাজের নিচে থেকে বের করে আনতে হল। হাতপা কেটে গেলেও তবুমুক্তি। এখন সহজেই নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু ফাঁক যে বেশি নয়। তবু আস্তে আস্তে সবাই বেরিয়ে এল।
ভাইকিংরা মশাল নিভিয়ে দিল। বৃদ্ধকে ধরাধরি করে বাইরে আনল।
সবাই একত্র হল।
আকাশের চাঁদ উজ্জ্বল। চারদিক মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জলদস্যুদের জাহাজটার সঙ্গে ওদের জাহাজ দড়ি দিয়ে বাঁধা। এবার নিজেদের জাহাজ চালিয়ে পালানো।
সবাই জলে নামল নিঃশব্দে সাঁতরে চলল ওদের জাহাজের দিকে।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে নিয়ে হাল বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠল। তখনই দেখল কয়েকজন জলদস্যু মাস্তুলের নিচে বসে আছে। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল–শাঙ্কো তরোয়াল দুটো আনো। শাঙ্কো নিচের দিকে তাকিয়ে তরোয়াল দিতে বলল।
একটু পরেই দুজনে তরোয়াল হাতে পেল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–এরা নরঘাতক। নিরীহ মানুষ নির্বিকারে হত্যা করে। এদের ওপর দয়া দেখানোর কোন মানে হয় না। দুটোকে খতম কর। বাকি দুটোকে দড়ি দিয়ে বাঁধো। তারপর কিছুদুরে গিয়ে জলে ফেলে দাও। এখানে ফেললে শব্দ হবে। জলদস্যুরা টের পাবে।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো খোলা তরোয়াল হাতে জলদস্যুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওরা। ভুত দেখার মত চমকে উঠল। ওরা তরোয়াল খোলার আগেই ফ্রান্সিস একজনের বুকে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল। সে ডেকের ওপর গড়িয়ে পড়ল। অন্যজন ততক্ষণে তরোয়াল তুলেছে। শাঙ্কো দ্রুত দুপা সরে গিয়ে তরোয়ালের কোপ বসালো ওর মাথায়। জলদস্যুটি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
অন্য দুজনের সঙ্গে তরোয়ালের লড়াই চলল। ফ্রান্সিস জলদস্যুটির সঙ্গে হালকা চালে তরোয়াল চালাতে লাগল। ও চাইছিল জলদস্যুদের ক্লান্ত করতে। তাহলে সহজেই বন্দি করা যাবে।
লড়াই চলল। যে জলদস্যু ফ্রান্সিসের সঙ্গে লড়াই করছিল সে হঠাৎই লড়াই থামিয়ে হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। ফ্রান্সিস দ্রুত ওর তরোয়াল দিয়ে জলদস্যুটির তরোয়ালে ঘা মারল। জলদস্যুর তরোয়াল ছিটকে পড়ল। মাস্তুলের গা থেকে ছেঁড়া দড়ি এনে ফ্রান্সিস ওর হাত বেঁধে ফেলল। অন্য জলদস্যুটিকেসঙ্গে তখন শাঙ্কোর তরোয়ালের লড়াই চলছে। শাঙ্কো তক্কে তক্কে রইল ওর পায়ে তরোয়ালের ঘা মারতে। সুযোগ পেয়ে গেল, শাঙ্কো। হঠাৎ এক লাফে ওর সামনে গিয়ে হাজির হল। জলদস্যুটি হকচকিয়ে গেল। শাঙ্কো এক মুহূর্ত দেরি না করে ওর পায়ে তরোয়াল চালাল। পা কেটে গেল। জলদস্যু পা টিপে বসে পড়ল। শাঙ্কোও ফ্রান্সিসের দেখা দেখি মাস্তুল থেকে ছেঁড়া দড়ি নিয়ে জলদস্যুটির হাত বেঁধে ফেলল। হাত বাঁধা দুজনে ডেকের ওপর বসে রইল।
ততক্ষণে বন্ধুরা জাহাজে উঠে পড়েছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ ছাড়। দাঁড়ঘরে যাও। দাঁড় টানা শুরু কর। পাল খাটাও। কিন্তু কোনরকম শব্দ যেন না হয়। সব কাজ নিঃশব্দে করতে হবে। জলদস্যদের জাহাজে হৈচৈ শুরু হয়েছে। ওরা এতক্ষণ বুঝতে পেরেছে যে আমরা পালিয়েছি। সব জলদি।
