বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কথা শুনে বেশ অবাকই হল। ফ্রান্সিস এভাবে বলছে কেন? ফ্রান্সিস বলল–এখানে থাকলেও আমাদের প্রাণ যাবে। সুতরাং আগে থেকে মৃত্যু বরণ করে কয়েকজন বন্ধুর জীবনের বিনিময়ে আমরা পালাতে পারবো।
–কিন্তু ফ্রান্সিস তুমি শুধু আমাদের মুক্তির কথা ভাবছে রাজকুমারী মারিয়ার কী হবে? হ্যারি বলল।
–আমরা মুক্তি পেলে মারিয়াকেও মুক্ত করতে পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেক্ষেত্রে সমস্ত জলদস্যুদের লড়াইয়ে হারাতে হবে। সেটা কি পারবে? শাঙ্কো বলল।
–একটা তরোয়াল হাতে পেলে পিরবোফ্রান্সিস বলল। বন্ধুরা চিন্তায় পড়ল। ফ্রান্সিস এরকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কেন বুঝে উঠতে পারল না। আসলে ফ্রান্সিস অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।
বন্ধুরা কয়েকজন বলে উঠল–ফ্রান্সিস তুমি যদি বল আমরা প্রাণ দিতে রাজি।
–তাহলে সেভাবেই তৈরি থাকব। লড়াই হবেই। ফ্রান্সিস বলল।
লোহার দরজাটার ঢং ঢং শব্দ হল। প্রহরীরা খাবার নিয়ে এসেছে। দরজা খুলে দুজন প্রহরী খোলা তরোয়াল হাতে দরজার দুপাশে দাঁড়াল। বাকি দুজন প্রহরী খাবার নিয়ে ঢুকল। ফ্রান্সিসদের সামনে একটা করে গোল পাতা পেতে দিল। তারপর দুজনে মিলে খাবার দিল। পোড়া রুটি। তরিতরকারির ঝোল আর মাছ। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে সেই একই কথা বলল–পেটপুরে খাও। ভালো না লাগলেও খাও। শরীর ঠিক রাখো।
খাওয়া শেষ। প্রহরীরা এঁটো পাতা নিয়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ হল।
ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল।
ফ্রান্সিস বৃদ্ধটির কাছে গেল। কথাইবা বলে সময় কাটানো। বৃদ্ধটি শুয়ে ছিল, ফ্রান্সিস কাছে আসতে উঠে বসল। ফ্রান্সিস বলল–আপনার দেশ কোথায়?
পর্তুগাল।
–কী করে বন্দী হলেন?
–সে অনেক কথা। আমাদের জাহাজ জলদস্যুরা লুঠ করল। সবাইকে বন্দী করল। তারপর ক্রীতদাসের বেচাকেনার হাটে অনেককে বিক্রি করল। আমার তখন প্রচণ্ড জ্বর। অসুস্থ মানুষকে কেকিনবে? আমি বেঁচে গেলাম। আমাকে যতবারই ঐসব হাটে নিয়ে গেছে আমি হাত পা ভাঙার ভান করেছি। খরিদদার একজন হাত পা ভাঙা মানুষকে কিনবে কেন? জলদস্যুরা যত বলে আমি সুস্থ আমি ততবারই হাত পা ভাঙার ভান করি। এভাবেই আমি বেঁচে গেলাম। অবশ্য যদি এইনরককুণ্ডে থাকাকে তুমি বেঁচে থাকা বলো।
–আপনি কখনও পালাবার চেষ্টা করেন নি। ফ্রান্সিস জিজ্ঞাসা করল।
না। সেটা অসম্ভব। বৃদ্ধ বলল। তারপর দরজার দিকে একবার দেখে নিয়ে বলল– আমি একটা কাজ অনেকদূর এগিয়ে রেখেছি। বাকিটা পারবে?
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল কী কাজ?
জাহাজের তলায় যে জোড়া থাকে আমি দীর্ঘদিন ধরে তা ঘষে ঘষে পাতলা করেছি। বৃদ্ধ বলল।
–সত্যি? ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বৃদ্ধ কী বলছে?
–হ্যাঁ এই লোহার হাতল দিয়ে। বৃদ্ধ একটা লোহার হাতল পাশ থেকে দেখাল। তারপর বলল–ঐ জোড় একবারে পাতলা হয়ে গেছে। এখন শক্ত কিছু দিয়ে চাড় দিতে পারলে জোড় খুলে যাবে। মানুষ বেরোবার মত ফাঁক অনায়াসে করা যাবে।
স্থান কাল ভুলে ফ্রান্সিস ধ্বনি তুলল–হো হো হো। বন্ধুরা অবাক। সঙ্গে ওরাও অবশ্য ধ্বনি তুলল। সবাই ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল–এখন কিছু বলা যাবে না। সব পরে বলছি।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিল। প্রহরীরা দরজা থেকে দূরে ওদের দৃষ্টির আড়ালে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
চলুন। দেখান ব্যাপারটা। ফ্রান্সিস বৃদ্ধকে বলল। বৃদ্ধ উঠে দাঁড়াল। দুজনে নিচে নেমে এল। বৃদ্ধ জোড়ের জায়গাটায় এল! আলো খুবই কম। তার মধ্যেই বৃদ্ধ জোড়াটা দেখাল ফ্রান্সিস হাত দিয়ে দেখল–সত্যি জোড়ের মুখটা পাতলা লাগছে। ও বুঝল শক্ত লোহার শাবল দিয়ে চাড় দিলে জোড় খুলে যাবে। এবার শেষ সমস্যা একটা লোহার শাবল। এটা জোগাড় করা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা করতে হবে।
ফ্রান্সিস এবার প্রহরীদের একবার দেখে নিল? ওরা ধারে কাছে নেই। ও এবার বন্ধুদের কাছে ডাকল। তারপর সমস্ত ঘটনাটা বলল। তারপর বলল–এখন সমস্যা একটা শাবলের মত লোহার।
হ্যারি বলল–প্রহরীরা যে লোহার ডাণ্ডাটা দিয়ে শব্দ করে ওটা ওখানে ঝোলানো থাকে। ওটা হলে হবে তো?
সাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল। দরজার কাছে গেল। ঝুলিয়ে রাখা লোহার ডাণ্ডাটা নিয়ে এল। দেখা গেল এটার মুখ ভোতা হবে না।
হ্যারিই এবার বুদ্ধি দিল। বলল–যদি একটা তরোয়াল পাওয়া যায় তাহলে ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তরোয়ালের চাড় দিলে ফঁক বাড়ানো যাবে।
–কিন্তু তরোয়াল পাবো কোথায়? বিস্কো বলল।
–চাইলে প্রহরীরা দেবে না? শাঙ্কো বলল।
–অসম্ভব–ফ্রান্সিস বলল–তাছাড়া তরোয়ালটা অনেকক্ষণ আমাদের কাছে রাখতে হবে। অত সময় পাবো না।
এবার হ্যারি বলল-শোন। আমি একটা উপায় বলছি। আমরা দস্যনেতাকে বলবো যে আমাদের তরোয়াল পূজোর একটা রীতি আছে। দুটো তরোয়াল আমাদের দিতে হবে। একদিন একরাত ধরে পূজো হবে। পূজো হয়ে গেলে তরোয়াল ফেরত দেব।
–সাবাস হ্যারি। এটাই একমাত্র পথ। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস প্রহরীদের ডাকলেন প্রহরী এগিয়ে এল।
ফ্রান্সিস বলল–তোমাদের দলনেতাকে বল আমি একটা অত্যন্ত দরকারি কথা বলবো।
–কী কথা? প্রহরী বেশ আয়েসি ভঙ্গীতে বলল।
–মুণ্ডু। ফ্রান্সিস বলল।
এ্যা? প্রহরী চমকে উঠল।
