সমুদ্রতীরে বিস্তৃত বনভূমি। ফ্রান্সিসের জাহাজ বনভূমির কাছে এল।
পেড্রো একটা গাছের মোটা ডালের সঙ্গে মাস্তুলের টানা দাঁড় বাঁধল ও আর নোঙর ফেলল না। জাহাজ আর বনভূমির ভেতরে ঢুকল না।
পেড্রোমাস্তল থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিসকেবলল-বনেরমধ্যে আরজাহাজ ঢোকালামনা।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
রাত বাড়ল, সে আসার জন্য হাঁকডাক শুরু হল।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হল। আজকে বেশ গরম পড়েছে। সমুদ্রের হাওয়ারও তেমন জোর নেই।
খালাশিরা অনেকেই ডেকের ওপরই শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়ল।
ফ্রান্সিসরা এখনও জানে না কী বিপদের মুখে ওরা জাহাজ বেঁধেছে।
ঐ বনভূমির ওপাশে ঘন গাছের আড়ালে নোঙর করা ছিল একদল জলদস্যুরজাহাজ। ফ্রান্সিসদের সাড়া পেতেই জলদস্যুরা সব চুপ করে গেল। নিঃশব্দে চলল ওদের চলাফেরা। কারো মুখে কথা নেই।
নিস্তব্ধ রাত। শুধু সমুদ্রের বাতাসের শন্ শন্ শব্দ। সময় বুঝে জলদস্যুনেতা ওদের জাহাজটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে চালিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছে নিয়ে এল। এত নিঃশব্দে যে ফ্রান্সিসরা বুঝতে পারল না। ফ্রান্সিসরা তখন নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে।
জলদস্যুরা নিঃশব্দে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠতে লাগল। ডেকের ওপর ঘুমিয়ে থাকা ভাইকিংদের কাছেবিস্ময় শালকাদেরপিঠে বুকেতরোয়ালের খোঁচা দিতে লাগল। শাঙ্কোদের ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়েই দেখে জলদস্যুর দল। ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি আবার জলদস্যুদের পাল্লায় পড়বে। ভাইকিংরা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াতে লাগল। জলদস্যুদের জনাকয়েক নিচে কেবিন ঘরে নেমে গেল। দুজন খোলা তরোয়াল হাতে অস্ত্রঘরের সামনে দাঁড়াল যাতে ফ্রান্সিসরা অস্ত্র না নিতে পারে।
জলদস্যুরা ভাইকিংদের সারি বেঁধে দাঁড় করাল কেবিনঘর থেকে সবাইকে বন্দী করে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস মারিয়াও এল।
জলদসুপতি বলল–তোমাদের দলনেতা কে?
ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল–আমি।
–তোমরা বিদেশী?
–হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং।
–তা তোমাদের কথা শুনেছি। জাহাজ চালাতে আর তরোয়াল চালাতে তোমরা ওস্তাদ। সমুদ্রের সঙ্গে তোমাদেরনাড়ির যোগ। একটু থেমে জাহাজের চারদিকেতাকিয়ে জলদস্যুনেতা বলল–তোমাদের তো ভিখিরির দশা। তোমাদের জাহাজ লুঠকরে কিছুই পাবনা।
দলনেতা এবার মারিয়ার দিকে তাকাল। বলল–এ কে?
আমাদের দেশের রাজকুমারী। হ্যারি বলল।
–তা এখানে কেন?
–আমাদের দলনেতা এঁর স্বামী। কাজেই স্বামীর সঙ্গেই তিনি যাবেন। হ্যারি বলল।
–আগে হলে এর কাছ থেকে গয়নাগাঁটি পাওয়া যেত। এখন তো ভিখারিনী। দলনেতা থামল। তারপর বললনা-না। গলায় সোনার হার আছে। দলপতি মারিয়ার দিকে হাত বাড়াল। মারিয়ারহাত সরিয়ে দিল। দলনেতা দ্রুত হাত বাড়িয়ে হারটা ছিঁড়ে নিল। মারিয়া কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল কান্নাকাটি করো না। দলনেতা গলা বাড়িয়ে বলল সবাইকে আমাদের ক্যারাভেল জাহাজে নিয়ে চল। সবচেয়ে নিচের কয়েদঘরে বন্দী করে রাখো! ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–আমরা কী অপরাধ করেছি যে আমাদের বন্দী করবে?
দলনেতা হো হো করে হেসে উঠল। বলল–শোন তাহলে তোমাদের নিয়ে ক্রীতদাস বেচাকেনার হাটে নিয়ে যাবো। য়ুরোপীয় ক্রীতদাস তো পাওয়া যায় না। তোমাদের জন্য ভালো দাম পাবো। তার ওপর রয়েছে তোমাদের রাজকুমারী। ক্রীতদাসী হিসেবে দারুণ দাম পাবো। শাঙ্কো ওদের দেশিয় ভাষায় বলল–ফ্রান্সিস-লড়াই। ফ্রানিস মাথা নাড়ল। বলল–আমরা কি এখনও নিরস্ত্র সহজেই হেরে যাবো।
–এদের সবকটাকে কয়েদ ঘরে ঢোকাও জলদস্যপতি বলল। ফ্রান্সিস বলল–না। আমাদের রাজকুমারীকে ঐনরককুণ্ডে রাখা চলবে না।
–তাহলে তো এখানে রাজপ্রাসদে নিয়ে আসতে হয়। জলদস্যপতি বলল।
–তার দরকার নেই। উনি আমাদের জাহাজে থাকবেন। ফ্রান্সিস বলল।
যদি পালিয়ে যায়, জলদস্যুপতি বলল।
–উনি একা সমুদ্র সাঁতরে পার হবেন অসম্ভব? ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে তাই থাকবে। জলদস্যুপতি বলল।
মারিয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটা হতে ফ্রান্সিস খুশি হল। এবার পালানোর ধান্দা। কিন্তু ঐ নরক থেকে কি পালানো সম্ভব? চেষ্টা চালিয়ে দেখতে হবে।
ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল জলদস্যুরা। একেবারে নিচেরতলায় কয়েদখানা।
প্রহরীরা কয়েদখানার লোহার দরজার বড় বড় তালা খুলল। সশব্দেদরজা খোলা হল। .ফ্রান্সিসরা দলবেঁধে ঢুকল।
লোহার দরজা বন্ধ করা হল। অন্ধকার ঘরে দুটো মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিসরা বসে পড়ল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। ও দেখল ওদের আগেও চারপাঁচজন কয়েদী আছে। তাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ। একে বন্দী করেছে কেন? ক্রীতদাস কেনা বেচার হাটে এই বৃদ্ধের কী মূল্য?
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সেই বৃদ্ধের কাছে গেল। পাশে গিয়ে বসল। বলল–আপনি এখানে কতদিন বন্দী আছেন?
–হিসাব করে বলতে পারবো না। তবে দীর্ঘদিন। বৃদ্ধ বলল।
আপনাকে নিয়ে ওরা কি করবে? ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে আপনার কোন মূল্যই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–কী জানি। কেন যে ওরা আমাকে এভাবে ফেলে রেখে দিয়েছে তা ওরাই জানে। বৃদ্ধ বলল।
–আপনাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ফ্রান্সিস বলল।
–এরা উচিত অনুচিতের ধার ধারে না। বৃদ্ধ বলল।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের কাছেফিরে এল। জলদস্যুদের এই ক্যারাভেল জাহাজের বন্দীশালা যে কী ভয়াবহ তার অভিজ্ঞতা ফ্রান্সিসদের আছে। ফ্রান্সিস ভাবল যে ভাবেই হোক এই বন্দীশালা থেকে পালাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? ও এটাও স্থির করল প্রহরীদের সঙ্গে লড়াই করে পালাতে হবে। নিরস্ত্র অবস্থায় লড়তে গেলে হয়তো পালানো যাবে কিন্তু তাতে কিছু বন্ধুর জীবন যাবে। ও ভাবল–এই ব্যাপারে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা যাক। ও বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব একটা কথা বলছিলাম। এই কয়েদঘরে আমাদের জীবন শেষ করতে আমি রাজি নই। তাই বলছিলাম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা প্রহরীদের সঙ্গে লড়াই করে পালাবো। কিন্তু সেটা করতে গেলে কিছু বন্ধুর প্রাণ যাবে। তোমরা কজন প্রাণ দিতে রাজি বল।
