ভদ্রলোক ঘরে ঢুকল। হেসে বলল–কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন। আপনাদের জন্যে রান্না চাপানো হয়েছে।
বাকি রাস্তা পার হয়ে দুজনে বাজারে এল।
দেখল তানাকাদের দোকান সামনে। দোকানের দরজা বন্ধ। শাঙ্কো কয়েকবার দরজায় শব্দ করল। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই।
-চল। বোঝাই যাচ্ছে বার্বারকে যেদিন ধরে নিয়ে গেল সেদিন থেকেই এই দোকান বন্ধ। পরে এখানে আসতে হবে। এখন চল।
দুজনে চলল বাজার ছাড়িয়ে।
.
দিন কয়েক আগের ঘটনা। সান্তিয়াগোতে তানাকা আর আরোনাস মারামারি করছিল বলে ধরা পড়েছিল। দুজনকেই তানাকার কাছে সান্তিয়াগোর প্রহরীরা দুজনকে ছেড়ে দিয়েছিল। তানাকা রাজ্যে ঢুকতে দুজনকেই বন্দী করা হল! তানাকার প্রহরীরা দুজনকেই কয়েদঘরে ঢোকাল।
সেদিন রাতে তানাকার ঘুম আসছিল না। উঠে পড়ল। মশালের আলোয় আরোনাসকে দেখল।
ওদিকে সান্তিয়াগোর কারাগার থেকে আরোনাস ছাড়া পেল। যাবার সময় তানাকা আরোনাসের সামনে এল। বলল–তুমি আমার কাছ থেকে ছাড়া পাবে না।
-যা-যা। তুই আমার কী করবি? আরোনাস খেঁকিয়ে বলে উঠল।
–সেটা দেখবি। তানাকা বলল। তানাকা আর কিছু বলল না। তানাকাদের কয়েকজনকে তানাকার কয়েদঘরে পাঠানো হচ্ছিল। ঝড়বৃষ্টিতে তানাকা পালাল। পথে সঙ্গী হিসেবে ফ্রান্সিসদের পেল। দেশে ফিরে এল।
তার পরদিনই। বেশ রাত তখন। তানাকার ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে দরজায় লাথি মারছে কে? তানাকা বিছানা ছেড়ে উঠে দরজার কাছে এল। ভেতর থেকেই বলল–আপনারা কে?
–আমি আরোনাস। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
–কী কথা?
দরজা খোল–এভাবে কথা হয়?
–কাল সকালে এসো।
–তখন বড্ড দেরি হয়ে যাবে। দরজা খোল।
— তুমি কি একা?
-হ্যাঁ।
তানাকা দরজা খুলল। সঙ্গে সঙ্গে চার-পাঁচজন তোক তানাকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তানাকাকে ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে এল। একজন তানাকার মুখ চেপে ধরেছিল। তানাকা মুখে একটা শব্দও করতে পারে নি।
আরোনাসের দল তানাকাকে রাস্তা দিয়ে প্রায় টেনে নিয়ে চলল।
তানাকার মুখ থেকে চেপে ধরা হাতটা গুণ্ডাটা সরিয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গে তানাকা চিৎকার করে উঠল। ঠিক মানুষের চিৎকারের মতো না। ভাঙা গলায় চিৎকার। আরোনাস ছুটে এল। চড়া গলায় বলল–আর একটা শব্দ করলে মেরে ফেলবো। আস্তে আস্তে চল্।
–আমাকে এভাবে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তানাকা বলল। গলা ঠোঁটে ব্যথা করছে।
–আমাদের ডেরায় তোকে নিয়ে যাচ্ছি। আরোনাস বলল।
–ওখানে কী হবে?
–তোর বাবার অনেক হীরের অলংকার আছে–আস্ত হীরের খণ্ডও আছে– সেসব আমাদের চাই। আরোনাস বলল।
–ঠিক। একজন গুণ্ডা বলে উঠল।
কিন্তু আমাকে মেরে ফেললে কি তা পাবে? তানাকা বলল।
–তোকে এখন মারবো না। যখন দরকার পড়বে তখন মারবো। আরোনাস বলল।
–এখন যখন মারছো না তখন আমায় বাড়ি যেতে দাও। তানাকা বলল।
–সেটি হবে না। এখন এখানেই থাকতে হবে। আরোনাস বলল।
–তাতে তোমাদের কী লাভ? তানাকা বলল।
লাভ আছে বৈকি। হীরের খণ্ড হীরের অলংকার–এসব তো মিলবে।
–সে তো দোকানের মধ্যে। একেবারে বন্ধ লোহার সিন্দুকে।
সিন্দুক ভাঙার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আমার ঠাকুর্দার আমলে ওস্তাদ কামার পেলিলি তৈরি করে দিয়েছিল। কারো ক্ষমতা নেই চাবি ছাড়া অন্য কোনোভাবে সিন্দুক খুলবে।
–দেখা যাক। আরোনাস বলল।
তানাকাকে ওরা একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। এই দিনের বেলাও ঘর প্রায় অন্ধকার। জানালা কাঠ দিয়ে বন্ধ করা। একটা মাত্র দরজা তালা লাগানো। ঐ ঘরেই তানাকাকে আটকে রাখা হল। দরজায় তালা লাগিয়ে আরোনাস চলে গেল।
তানাকা মেঝেয় রাখা কাঠের পাটাতনে শুয়ে পড়ল। ভাবতে লাগল কী করে পালানো যায়।
আরোনাসও ওদের ঘরে বসে ভাবছিল কী করে বাবারের কাছ থেকে চাবিটা আদায় করা যায়।
অনেক ভেবে তানাকা ঠিক করল বাবার কাছ থেকে চাবিটা নিয়ে আসবে এটা বললে আরোনাসরা ওকে মুক্তি দেবে। চাবি আদায়ের জন্যে তানাকার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। কিন্তু ও কিছুতেই চাবি হাতছাড়া করবে না। ও পালিয়ে যাবে। মধ্যরাত পর্যন্ত এইসব ভাবতে ভাবতে তানাকা ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালের খাবার খেয়ে ও আরোনাসের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছু পরে আরোনাস ফিরল। তানাকা আরোনাসকে ডাকল। আরোনাস ওর কাছে এল।
কী ব্যাপার? আরোনাস বলল।
–একটা কথা বলছিলাম।
–বলো। আরোনাস বলল।
–ভাবছি কয়েদঘরে গিয়ে বাবার খোঁজ করি। তানাকা বলল।
খুব ভালো কথা। আরোনাস বলল।
জিজ্ঞেস করে জেনে নেব বাবা কোথায় সিন্দুকের চাবিটা রেখেছেন। তানাকা বলল।
বাঃ। এই তো বুদ্ধি খুলেছে। আরোনাস হেসে বলল।
–এই সকালেই যেতে হবে। এ সময়েই বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়। তানাকা বলল।
— জানি। আরোনাস একটু জোর গলায় ওর একজন বন্ধুকে ডাকল। বন্ধু এল।
— চল–কয়েদখানায় যাবো। আরোনাস বলল।
হঠাৎ? সঙ্গীটি বলল।
দরকার আছে। আরোনাস বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজন তৈরি হল।
কয়েদঘরের সামনে এল। সর্দার প্রহরীর কাছে এল। তানাকা বলল–একটা কথা ছিল।
–বলো। সর্দার প্রহরী গোঁফ মুচড়ে বলল।
–আমার বাবা। হীরের গয়না গড়াতে বাবার সমকক্ষ কেউ নেই। তানাকা বলল।
–আচ্ছা। সর্দার প্রহরী বলল।
–বাবাকে মাননীয় রাজা সাজা দিয়েছেন। বাবা এই কয়েদখানায় বন্দী হয়ে আছেন। আমি বাবার সঙ্গে একটা জরুরী বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। এখন আপনি যদি অনুমতি দেন। সর্দার প্রহরী বলল–খুব দরকার?
