ওরা তানাকাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
রাস্তা ধরে চলল বাজারের দিকে। তানাকাদের দোকানে দেখল ঘরে কাঁচটকা আলো। তারই আলোতে কয়েকটা কাঠের পাটাতন দেখল। একটা বড় পাটাতনে বিছানা পাতা। বোধহয় যুবকটি এখানে শুয়েছিল। ওদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল–
দাঁড়ান–আপনাদের শুকনো পোশাক এনে দিই। যুবকটি ভেতরে চলে গেল।
ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেই গায়ের পোশাক খুলতে লাগল। সব ভিজে ঢোল।
কিছু পরে যুবকটি এল। হাতে শুকনো কাপড় জামা। ফ্রান্সিসরা ভেজা জামাকাপড় একটা কাঠের পাটাতনের ওপর রাখল। শুকনো পোশাক পরল। মাথার চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালিয়ে চুল পাট করল।
এতক্ষণে ফ্রান্সিসরা বুঝতে পারল ওরা কী পরিশ্রান্ত! যুবকটি বলল–এবার শুয়ে পড়ন। রাত আর বেশি নেই।
ফ্রান্সিস বলল–কিন্তু আপনি জানতে চাইলেন না আমরা কোথা থেকে আসছি কোথায় যাবো।
কী দরকার। যুবকটি হেসে বলল–আপনারা ঝড়-বৃষ্টিতে আটকা পড়েছেন। আপনাদের সাহায্য করতে হবে। ব্যস্-এর চেয়ে বেশী জেনে কী হবে?
ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। বলল–আমরা সবাই যদি এরকম হতাম? আমাদের কত প্রশ্ন কত অনুসন্ধিৎসা? পথিক হয়তো অনেকদূর হেঁটে এসেছে। কোথায় তাকে বিশ্রামের ব্যবস্থা করবে তা নয় হাজারো প্রশ্নকী নাম? জাত কী? কোত্থেকে আসছেন? দেশ কোথায়? বেচারি পথিকের প্রাণ ওষ্ঠাগত।
দুজনে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট পাখির গান শুনল। তার মানে রাত শেষ হয়ে এসেছে। দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙতে বেলাই হল। ফ্রান্সিসরা তাড়াতাড়ি উঠে বসল। দেখল কোনার দিকে একটা কাঠের পীপে। শাঙ্কো পীপেটার কাছে গেল। দেখল পীপে ভর্তি জল। পাশে একটা কাঠের পাত্র। শাঙ্কো জল তুলে মুখ হাত ধুল। ফ্রান্সিসও নেমে এসে হাতমুখ ধুচ্ছে তখনই যুবকটি ঘরে ঢুকল। পেছনে কাজের লোকের হাতে একটা কাঠের থালা। তাতে খাবার রাখা। কাজের লোকটি খাবারের থালা বিছানায় রাখল। ফ্রান্সিসরা তখন ক্ষুধার্ত। তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল।
যুবকটি ঘরে ঢুকল। হেসে বলল–মা বলছিলেন–আপনারা আজকে এখানে। থাকুন। ওরকম ঝড়বৃষ্টির মধ্যে এসেছেন। আপনাদের কোনো কষ্ট হবে না।
–আমাদের থাকবার উপায় নেই। তবে পোশাক তো এখনও শুকোয়নি। ঐ পোশাকের জন্যেই আমাদের আজকের দিনটা থাকতে হবে।
–তাহলে মাকে বলে আসি আপনারা থাকবেন। যুবকটি চলে গেল।
সারাটা দিন ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে কাটালো। একটু বেলায় যুবকটির মেয়ে এল। ফ্রান্সিস মেয়েটির সঙ্গে কথাটথা বলল। ফ্রান্সিস ওদের মুক্তোর সমুদ্রের গল্প ছোট্ট করে বলল। মেয়েটি খুব খুশি। আরো গল্প শুনতে চাইল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো ওকে গল্প শোনাও। অগত্যা শাঙ্কো ওকে হীরের পাহাড়ের গল্প বলল।
রাতে খাওয়ার ডাক পড়ল। এই ঘরেই পাটাতনের ওপর ফ্রান্সিসদের খেতে দেওয়া হল। দুজনেই পেট পুরে খেল। আবার কখন খাবার জুটবে কে জানে।
রাতের খাওয়া খাচ্ছে। তখনই ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো পোশাক শুকিয়ে গেছে। কাজেই আর দেরি নয়।
রাতেই চলতে শুরু করবো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
ওরা খাচ্ছে তখনই যুবকটি এল। বলল-রান্না কেমন হয়েছে?
-খুব ভালো। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস বলল–বলছিলাম আমরা একটু পরেই বিশ্রাম নিয়ে চলে যাবো।
–আজ রাতটা থেকে গেলে হত না। যুবকটি বলল।
–আমরা নিরুপায়। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। কত যত্ন করে খাওয়ালেন শুতে দিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
–না না। এতো মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য।
খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল দুজনে। তারপর উঠে দাঁড়াল। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। বড় রাস্তায় উঠল। দিক ঠিক করে নিয়ে হাঁটতে লাগল। রাত শেষ হল। ভোর হল। তখনও ওরা হেঁটে চলেছে।
ওরা একটা বাড়ির কাছে এল। দেখল দরজা বন্ধ। অন্য একটা বাড়ির দরজা দেখল হাট করে খোলা। ফ্রান্সিস বলল–এই বাড়ির লোকেরা অতিথিবৎসল। চলো এখানেই দেখি।
দুজনে খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একটা অল্পবয়সী ছেলে তখনই বেরিয়ে এল। শাঙ্কো বলল–তোমার বাবা-মা কোথায়?
ভেতরে।
–বাবাকে একটু ডেকে নিয়ে এসো।
–ছেলেটা বাবা বাবা বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
একটু পরেই একজন রোগামত লোক বেরিয়ে এল। খোলা দরজার কাছে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে একবার তাকিয়ে বুঝল ওরা বিদেশি। ভদ্রলোক বললেন আপনারা তো বিদেশি? আমার কাছে কিসের দরকার?
–আমরা খুব ক্ষুধার্ত আর পরিশ্রান্ত। আমাদের কিছু খেতে দিতে পারেন? শাঙ্কো বলল।
–নিশ্চয়ই। পিরবো। আপনারা অতিথি। ঘরে আসুন।
ভদ্রলোকের পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরা গেল। একটা ছোট ঘরে ঢুকল সবাই। দুটো জানলা বন্ধ থাকায় ঘরটা অন্ধকার অন্ধকার লাগছিল। ভদ্রলোক দুটো জানলা খুলে দিল। দেখা গেল একটা কাঠের পাটাতনে ঘাসপাতার বিছানা। ভদ্রলোক বলল–এটা আমাদের অতিথি ঘর। আত্মীয়-স্বজন বা অতিথি এলে তাদের এই ঘরেই রাখা হয়। বসুন। বিশ্রাম করুন। জলটল খান। আপনাদের জন্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। ভদ্রলোক চলে গেল।
দুইহাতে দুই গ্লাশ জল নিয়ে ছেলেটা এল। জল খেয়ে ফ্রান্সিস ওকে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। ছেলেটি কিভাবে পড়াশুনো চালায়। কখন পড়তে যায়, কখন আসে। যিনি পড়ান তিনি কোথায় থাকেন–এখানে বৃষ্টি কেমন হয় ফ্রান্সিস এমনি সব প্রশ্ন করতে লাগল। ছেলেটি বেশ বুদ্ধিমান। খুব দ্রুত সবকিছু প্রশ্নের জবাব দিল। ফ্রান্সিস খুব খুশি হল।
