সত্যিই পালাতে চাও?
নিশ্চয়ই।
ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করে দেব। শুধু ধরা পড়লে আমার কথা বলবে না।
–তাহলে তুমি আগে কোন কোন কয়েদীকে পালাতে সাহায্য করেছে।
–যদি পালাতে সাহায্য না করতাম তাহলে নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হতো। সর্দার বলল।
–ঠিক আছে। কবে পালাতে সাহায্য করবে? ফ্রান্সিস বলল।
–শোন–এই কাকোয়াম্বো সমুদ্রের কাছে। তাই এ সময়টায় এখানে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি হয়। তেমনি এক রাতে তোমরা তৈরি থেকো! ঠিক সময় আমি ডাকবোজাহাজী? তোমরা চলে আসবে ঘরের বাইরে। তারপর কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে পালানো।
–কাঁটাতারের বেড়া পার হবো কিভাবে? শাঙ্কো বলল।
–সে সবের ব্যবস্থা তখন দেখবে–সর্দার বলল।
–তুমি এ ভাবেই অনেককে পালাতে সাহায্য করেছো নিশ্চয়ই। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব কথা থাক। তোমরা তৈরি? সর্দার বলল।
–হা হা। ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন গভীর রাতে বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি চলছে। হঠাৎ শুধু শুনল–জাহাজী।
বাইরে এসো। সর্দার প্রহরী বলল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো বাইরে এল। ক ঝড়ের ঝাঁপটা যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তেমনি মুষলধারে বৃষ্টি। গভীর অন্ধকার বাইরে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তাইে যা দেখা যাচ্ছে।
সর্দার প্রহরীর পেছনে পেছনে ফুল বাগানের এক কোনার দিকে এলো ওরা। সর্দার প্রহরী দুজনকে কাছে আসতে বলল। কোনার কাঁটাতারের কাছে এসে সর্দার দুহাত দিয়ে কাঁটাতারে টান দিল। কাঁটাতার আস্তে আস্তে সরে গেল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো যত তাড়াতাড়ি পারো বেড়িয়ে এসো।
দুজনে বঁটাতারের ফাঁক দিয়ে গলে গেল। দুজনেরই হাতে পিঠে বঁটাতারের খোঁচা লাগল। বেশ জোরে। কিন্তু তখন আর ওসব ভাববার সময় নেই। দেখবারও সময় নেই।
কাটাতার পার হয়ে ফ্রান্সিস সর্দার প্রহরীর দিকে হাত বাড়াল। সর্দার ওর বাড়ানো হাত ধরল। চাপ দিয়ে ছেড়ে দিল।
দুজনে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ছুটল। বিদ্যুতের আলোয় ওরা একটা প্রান্তরের মতো দেখল। ছুটল তার ওপর দিয়ে। কিছুদূর এসে দেখল একটা টানা বড় রাস্তা। দুজনে রাস্তায় উঠে ছুটতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ ছোটার পর পথের দুপাশে বাড়িঘর দেখল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-শাঙ্কো–আশ্রয় চাই। আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।
তখন বৃষ্টি একটু কমের দিকে। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার বিরাম নেই।
একটা বাড়ির সামনে এল। বিদ্যুতের আলোয় দেখল বেশ বড় বাড়ি। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সদর দরজার সামনে এল। জোরে দরজায় ধাক্কা দিল। ভেতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। আবার ধাক্কা দিল। খটাস্ শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। একজন যুবক দাঁড়িয়ে। শাঙ্কো বলল–দেখুনঝড়বৃষ্টিতে আটকে পড়ে গেছি। একটু থাকবার জায়গা দেবেন?
–নিশ্চয়ই। আসুন। যুবকটি বলল।
ভেজা পোশাকে ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো ঘরে ঢুকল। খেয়েদেয়ে ফ্রান্সিস যুবকটিকে বলল–তোমরা আমাদের যত্ন করে খেতে দিয়ে থাকতে দিয়েছো। তোমাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ রইলাম।
না–না। এ কী বলছেন? এটা মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য। যুবকটি চলে গেল।
রাত একটু গম্ভীর হতে দুজনে উঠে পড়ল। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল–এখন ঠিক কর প্রথমে কোথায় যাবে?
–প্রথমে তানাকার খোঁজ করতে হবে। ওর বাবা কোথায় সেটাও জানতে হবে। শাঙ্কো বলল। দুজনে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল।
যখন তানাকা পৌঁছল তখন ভোর হয়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। খুঁজে খুঁজে একটা সরাইখানা দেখল। ওরা সরাইখানায় ঢুকল। মালিক হাসিমুখে এগিয়ে এল। মালিক দুটো লাভের কথা ভাবল–এরা তো বিদেশি। খুব সহজেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেখাবে। এরা অন্য কোথাও যাবে না। এই সরাইখানাতেই থাকবে। থাকা খাওয়ার জন্যে বেশি অর্থ চাইবে। এরা যা দাম চাইবে তাই দেবে। এ বিষয়ে সরাইওয়ালা নিশ্চিন্ত।
সরাইওয়ালা পেছনের ঘরে এল। ফ্রান্সিসরাও চলল। ঘরটা দেখিয়ে সরাইওয়ালা বলল–এখানেই থাকবেন। আরামে থাকবেন। এখন সকালের খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।
সকালের খাবার খেয়ে দুজনে চলল তানাকাদের বাড়ি। সব খবরাখবর জানা যাবে।
তানাকাদের বাড়ির সামনে এল। দরজা বন্ধ। ফ্রান্সিস দরজায় ধাক্কা দিল। একজন বয়স্ক মানুষের গলা শুনল–কে?
–আমরা। তানাকার বন্ধু। দরজাটা খুলুন। শাঙ্কো বলল।
তানাকার মা বেরিয়ে এল। তানাকার মা বলল–তোমরা কে বাবা?
–তানাকাকে ডাকুন। ও সব বলবে। শাঙ্কো বলল।
-কিন্তু তানাকাকে তো দিন সাতআট আগে পাঁচ-ছ’জন গুণ্ডা এসে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে।
–কোথায় নিয়ে গেছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
তাতো জানি না।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল–যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হয়েছে। তানাকার বন্ধু আরোনাস এবার সক্রিয় হয়েছে। তানাকাকে নিয়ে সেই বন্ধুর দল কাজে নেমেছে। ও আরো বলল–তানাকাকে কয়েদঘর থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ও এই কদিন বোধহয় বাড়িতেই ছিল। বাবা বাবার কয়েদখানায়। ওকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। শাঙ্কো তানাকার মাকে জিজ্ঞেস করল–তাহলে তানাকাকে গুণ্ডারা কোথায় রেখেছে আপনি জানেন না।
না।
–তানাকা এক বন্ধুর কথা আমাকে বলেছিল। কী যেন নাম–ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ করে ভাবতে ভাবতে চোখ খুলল–হ্যাঁ আরোনাস। আরোনাসের বাড়ি ওদের দোকানের কাছে। ওখানে গিয়ে খোঁজখবর করতে হবে। চল।
