একটু পরেই গারদ দরজার কাছে খট খট শব্দ উঠল। লা ব্রুশ আসছে বোঝা গেল। দরজা খুলে পাহারাদারেরা সরে দাঁড়াল। লা ব্রুশ কাঠের পাঠাতনে ঠক্ঠক্ শব্দ তুলে এগিয়ে এল। ওর হাতে একটা শঙ্কর মাছের চাবুক। আর কারো দিকে না তাকিয়ে লা রুশ ফ্রেদারিকোর সামনে এসে দাঁড়াল। গম্ভীরগলায় ডাকল ফ্রেদারিকো।
–আজ্ঞে–ফ্রেদারিকো আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াল। ও যেন কাঁপছে। কেমন ভীত-সন্ত্রস্ত ওর ভাবভঙ্গী।
–তাহলে কি ঠিক করলে। পনেরো দিন সময় চেয়েছিলে। সে সময় পেরিয়ে গেছে।
ফ্রেদারিকো ফ্যাসফেসে গলায় বলল–আমি সত্যিই কিছু জানি না।
–তুমি সব জানো। মুক্তোর সমুদ্র থেকে অক্ষত দেহে বেরোবার উপায় একমাত্র তুমিই জানো।
–আমি যা জানি সবই আপনাকে বলেছি।
ফরাসী ভাষায় গালাগাল দিয়ে লা ব্রুশ চাবুক চালাল। চাবুকের ঘায়ে ফ্রেদারিকো পড়ে যেতে-যেতে কোন রকমে দাঁড়িয়ে রইল। লা ব্রুশ ওর গলায় ঝোলানো লকেটের হাঁসের ডিমের মতো মুক্তোটা দেখিয়ে বলল, বল; এটা তুই কী করে আনলি?
ফ্রেদারিকো পিঠে হাত বুলোতে-বুলোতে বলল–ভাজিম্বাদের রাজার ভান্ডার থেকে চুরি করে এনেছি।
মিথ্যে বলছিস। লা ব্রুশ বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। আবার চাবুক পড়ল ফ্রেদারিকোর গায়ে। একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ উঠল ওর গলায়। একে বয়েসের ভারে জীর্ণ-শীর্ণ শরীর; তার ওপর এই চাবুকের মার। ফ্রেদারিকোর শরীর কাঁপছে তখন। ফ্রান্সিসের আর সহ্য হল না। ও দ্রুত উঠে দাঁড়াল হাতকড়া বাঁধা হাতটা তুলে বলল–ওকে আর চাবুক মারবেন না।
লা ব্রুশ তীব্র দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁত চাপাস্বরে বলল–তাহলে ওর মারটা তুমিই খাও।
প্রচন্ড জোর চাবুক চালিয়ে চলল ফ্রান্সিসের শরীরের উপর। চাবুকের আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের শরীর কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। কিন্তু ওর মুখ থেকে একটা কাতর ধ্বনিও বেরোল না। দাঁতে দাঁত কামড়ে মুখ বুজে চাবুকের মার সহ্য করতে লাগল। লা ব্রুশ এক সময় চাবুক মারা থামিয়ে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস শরীরের অসহ্য ব্যথায় ভেঙে পড়ল না। সোজাসুজি লা ব্রুশের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিসের ওপর এই অত্যাচার দেখে ভাইকিংদের রক্ত গরম হয়ে উঠল। শেকলে প্রচন্ড শব্দ তুলে সবাই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকে কয়েকজন ঘিরে দাঁড়াল। হ্যারি চেঁচিয়ে বলল–এবার আমাদের মারুন।
লা ব্রুশ একবার ওদের দিকে তাকাল। তীব্ৰদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর হাতের চাবুকটা কাঠের মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে ফ্রেদারিকোর দিকে তাকিয়ে বলল–এই শেষবার বলছি আর পনেরো দিন সময় দিলাম। এই শেষ। এর মধ্যেই আমরা চাঁদের দ্বীপে পৌঁছব। যদি অক্ষত দেহেমুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো আনার উপায় না বলিস, তাহলে হাঙরের মুখে ছুঁড়ে ফেলবো তোকে।
বলে লা ব্রুশ কাঠের পায়ে ঠক্ঠক্ শব্দ তুলে চলে গেল।
চাবুক কুড়িয়ে নিয়ে বেঞ্জামিন ক্যাপ্টেনের পেছনে-পেছনে চলে গেল।
ফ্রান্সিস বসে পড়ল। কিন্তু পেছনে হেলান দিয়ে বসতে পারল না। পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। হ্যারি ওর জামাটা তুলে ধরল। চাবুকটা পিঠের মাংস কেটে বসে গেছে। সারা পিঠে কালসিটে দাগ। কিন্তু ও চোখ বুজে চুপ করে বসে রইল। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল।
রাত্রে খাবার সময় ফ্রান্সিস বুঝলো, জ্বর এসেছে। কিছুই খেতে পারল না। কুন্ডলী পাকিয়ে কাঠের পাটাতনের উপর শুয়ে রইলো। অসম্ভব শীত করছে। মাথাটা ভীষণ দপ দ করছে। পিঠের জ্বালাটা আরো বেড়েছে। ওর শরীরটা কুঁকড়ে যেতে লাগল। কিন্তু ও মুখ দিয়ে একটা শব্দ করলো না। তাই কেউ ওর শরীরের অবস্থাটা বুঝতে পারলো না। যখন ও খেতেও উঠলোনা, তখন হ্যারির মনে সন্দেহ হ’ল। ও হাতকড়ি বাঁধা দুটো হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিসের কপালে রাখলো। জ্বলে কপাল পুড়ে যাচ্ছে। হ্যারি ওর গালে গলায় হাত দিল। ভীষণ জ্বর উঠেছে। হ্যারি তাড়াতাড়ি ডাকল, ফ্রান্সিস।
প্রথম ডাকে সাড়া পেলো না। আবার ডাকল–বন্ধু—
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে সাড়া দিতে হ্যারি বললো–শরীর খুব খারাপ লাগছে?
–জ্বর এসেছে। সেরে যাবে। স্পষ্ট বোঝা গেল যে ওর গলা কাঁপছে।
কিন্তু হ্যারি বুঝলো, জ্বর এত বেশি যে ফ্রান্সিসের বোধশক্তিও লোপ পেয়েছে। আর কিছুক্ষণ পরে ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। হ্যারি দ্রুত ভাবতে লাগল, ওষুধ কী করে পাওয়া যায়। জ্বরটা কমাতেই হবে। ও ফ্রান্সিসের শরীরের অবস্থা অন্য কয়েকজন ভাইকিংকে বললো, কিন্তু কেউ কোন উপায় বলতে পারলো না। ওরা অসহায়ভাবে ফ্রান্সিসের কুন্ডলী পাকানো শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ ওর নজর পড়লো ফ্রেদারিকোর ওপর। ফ্রেদারিকোও তখন থেকে একটানা গোঙাচ্ছে। শরীরের এই অবস্থায় ওর পক্ষে চাবুকের মার সহ্য করা সম্ভব হয়নি।
হ্যারি ভেবে দেখলো, একমাত্র ফ্রেদারিকোই পারে ফ্রান্সিসের জন্য ওষুধ আনতে। ও যদি বেঞ্জামিনকে বলে তাহলেই একটা উপায় হতে পারে। হ্যারি ঝুঁকে পড়ে ফ্রেদারিকোকে ডাকল, –ফ্রেদারিকো—ফ্রেদারিকো–।
ফ্রেদারিকোর মাথাটা বুকের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল। এই অবস্থাতেই ও গোঙাচ্ছিল। আরো কয়েকবার ডাকতে ফ্রেদারিকো জলে ভেজা চোখ মেলে হ্যারির দিকে তাকাল।
হ্যারি বললো, ফ্রেদারিকো শোন। খুব বিপদ–ফ্রান্সিসের ভীষণ জ্বর এসেছে। আর কিছুক্ষণ এই জ্বর থাকলে ও অজ্ঞান হয়ে যাবে। শীগগির একটা উপায় বের করো।
