ঘরে আরো তিনজন প্রহরী ছিল। তিনজনই তরোয়াল খুলে এগিয়ে এল। একজন বলল–সর্দারকে ছেড়ে দাও।
–না। আহত কয়েদীর জন্য ওষুধ চেয়েছিলাম। সর্দার ওষুধ থাকা সত্ত্বেও দেবে না বলছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী করবো। রাজা হুকুম না দিলে আমাদের কিছু করার নেই। এক প্রহরী বলল।
ফ্রান্সিস সর্দারকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সর্দারও উঠল।
ফ্রান্সিস বলল–নিয়ম আছে। আবার মানবতার খাতিরে নিয়ম ভঙ্গও তো হতে পারে।
-সেটা অবশ্য আলাদা কথা। সর্দার প্রহরী বলল।
–ঐ আলাদা কথাটাই আমি বলছিলাম। কয়েদী দুজনের কী অবস্থা হয়েছে তোমরা দেখেছো। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব আমরা অনেকদিন দেখে আসছি। একজন প্রহরী বলল।
–কখনও প্রতিবাদ করো নি। ফ্রান্সিস বলল।
–না। আমাদেরই মেরে ফেলবে। অন্য এক প্রহরী বলল।
-কিন্তু আমি প্রতিবাদ করবো। আমাকে রাজার কাছে যেতে দাও। আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাকে রাজার কাছে যেতে দেব না। তুমি রাজার কাছে গেলে প্রতিবাদ করলে মরে যেতে পারো। অন্য প্রহরী বলল।
–ঠিক আছে। আমি যাবো না। ওষুধ দাও। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি যাও। আমি যাচ্ছি। সর্দার প্রহরী উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
ফ্রান্সিস ওর ঘরে এল। আহতদের একজন ফ্রান্সিসদের ঘরের। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে কয়েদীটির কাছে এল। পোশাক কিছু সরিয়ে দেখল–কী সাংঘাতিকভাবে শরীর কেটে কেটে গেছে। কয়েদীটি গোঙাচ্ছিল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল– সর্দার প্রহরী ওষুধ নিয়ে আসছে। একটু সহ্য করো কয়েদীটির গোঁঙানি বন্ধ হল।
তখনই সর্দার প্রহরী ঘরে ঢুকল। হাতে একদলা তুলো আর একটা বোতল। সর্দার কয়েদীটির কাছে গিয়ে বলল–ওষুধ লাগালে জ্বালাযন্ত্রণা হবে। কিছুক্ষণ। সহ্য করো।
সর্দার বোতল থেকে ওষুধ নিয়ে কয়েদীটির শরীরের কাটা জায়গাগুলিতে লাগাতে লাগল। কয়েদীটি প্রথমে জোরে গুঙিয়ে উঠল। একটু পরে শান্ত হল। সর্দার ওর সারা গায়ে ওষুধ লাগিয়ে দিল।
সর্দার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকে বলল–ও যেন দিন দুয়েক চান না করে। কালকে আবার ওষুধ লাগিয়ে দেব। দু-তিনদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবে। সর্দার চলে গেল।
ফ্রান্সিস নিজের বিছানায় গেল। শাঙ্কো আস্তে ডাকল–ফ্রান্সিস। আহত লোকটা বাঁচবে তো?
–সর্দার তো বলল এই ওষুধেই সারবে। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি কি পাগলা রাজাকে সত্যি কথা বলেছিলে? শাঙ্কো বলল।
–মাথা খারাপ। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি গাছগুলো নিয়ে কী করেছিলে? শাঙ্কো বলল।
–সব গোড়াশুদ্ধু তুলে একপাশে রেখে দিয়েছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–প্রহরীরা দেখে নি? শাঙ্কো বলল।
–ওরা তখন নিজেদের মধ্যে তাস খেলায় মগ্ন। ফ্রান্সিস বলল।
রাত হল। খাবার সময় হল। রাঁধুনিরা খাবার নিয়ে এল। ফ্রান্সিস নিজের খাবারটা শাঙ্কোকে দেখতে বলল। নিজে আহত কয়েদীদের কাছে গেল। কয়েদীকে খাইয়ে দিল। তারপর নিজের বিছানায় এসে শাঙ্কোর হাত থেকে খাবার নিল। খেতে লাগল।
রাতে শুয়ে পড়ল। এখন শুধু এখান থেকে পালাবার চিন্তা। কিভাবে পালাবে?
কয়েকদিন কাটল। আহত কয়েদীটি সুস্থ হল। সর্দার প্রহরী ঢুকল। আহত কয়েদীটির বিছানার কাছে এল। আহত কয়েদীটিকে জিজ্ঞেস করল-কেমন আছো ভাই?
–অনেক ভালো আছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি ওষুধ না দিলে আমি মারা যেতাম।
ফ্রান্সিস বলল–ওষুধ না দিলে সর্দারকে মরতে হত।
হঠাই ফ্রান্সিসের মনে হল–সর্দার প্রহরী কেমন যেন দুঃখভারাক্রান্ত। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–আমার বিছানার কাছে একটু আসবে?
চলো। দু’জনে ফ্রান্সিসের বিছানার কাছে এল। ফ্রান্সিস ইশারায় শাঙ্কোকে ডাকল।
ফ্রান্সিস সর্দার প্রহরীকে ওর বিছানায় বসতে বলল। সর্দার প্রহরী মাথা নাড়ল। দুজনে সর্দারের কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল–কারণ জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার মনে খুব দুঃখ-বেদনা আছে। সর্দার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। বলল, হ্যাঁ আছে। রাজা আরকানিয়া যে কয়েদীদের কী নির্মম শাস্তি দেয় তা কল্পনাও করতে পারবে না। ও পশুদের চেয়েও হিংস্র। রাজা ওপরে ওপরে পাগলাটে ভাব দেখায় কিন্তু আসলে ও একটা সুস্থ মানুষ। সবাইকে দেখায় ও পাগলাটে। আসলে ও খুব বুদ্ধিমান মানুষ। ওর হুকুমে কয়েদীদের ওপর কী সাংঘাতিক অত্যাচার করতে হয়েছে সে কথা ভাবলে আমার চোখে জল আসে। কিন্তু পরক্ষণেই সাবধান হয়ে যাই অন্য প্রহরীরা যেন না দেখে ফেলে। এইভাবেই দিন কাটছে আমার। কাঁদতে পারি না।
–আহত কয়েদীটিকে যে ওষুধ দিয়েছো এটা জানতে পারলে–ফ্রান্সিস বলল।
–আমার অবধারিত মৃত্যু। একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল–আমরা দুজন পালাতে চাই।
–আমিও পালাতে চাই।
ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল। বুঝল না সর্দারের কথাটা সত্যি না মিথ্যে।
ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল–তোমার পালাতে অসুবিধে কোথায়। চলে গেলেই হল।
–রাজার চোখ সবদিকে। আমি পালালে রাজা আমার পেছনে ঘাতক লেলিয়ে দেবে। ঘাতক আমাকে যেখানে পাবে হত্যা করবে। ফ্রান্সিস শাঙ্কো চুপ করে রইল।
একটু পরে ফ্রান্সিস বলল–তোমার সমস্যার কথা জানলাম। আমরা পালালে রাজা আর আমাদের নিয়ে ভাববে না। ফ্রান্সিস বলল।
–লোকটা কী নৃশংস তা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না।
–দেখ সর্দার আমাদের পালাতেই হবে। আজ অথবা কাল। কী করে পালাবো সেটাই বুঝতে পারছি না।
